গদবাধা একটি বছর


১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি ‘গোলাম নবী জুয়েল’ নামে লিখতাম। সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকার অনলাইন কলামে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক আমার প্রায় ৪০০ লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী ৮ বছরে প্রকাশিত এই লেখাগুলোতে তৎকালীন বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনের একটা চিত্র পাওয়া যাবে। যা এই খাতের অগ্রগতির বর্তমান অবস্থাটি অনুধাবনেও কিছুটা সহায়তা করবে বলে বিশ্বাস। আমি বাছাই করে কিছু লেখা আমার ব্লগে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিচের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ২৮ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে।

গদবাধা একটি বছর – গোলাম নবী জুয়েল

আগের বছরের মতোই এবছরও মোবাইল ফোন ছিলো বাংলাদেশের আইসিটি অঙ্গনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়৷ হবে হবে করেও বছরের শেষ প্রান্তেও বিটিটিবি-র সরকারি মোবাইল ফোন চালু হয়নি৷ সরকারি মোবাইল ফোন চালুর কথা শোনা যাচ্ছে গত ৫বছর ধরে৷ এদিকে বেসরকারি মোবাইল ফোনের চারটি কম্পানিতেই এ বছর অনেক ক’টি বড় ধররে ঘটনা ঘটেছে৷ গ্রামীণ ফোন তাদের ২০ লাখ গ্রাহক কোটা ছাড়িয়েছে৷ একেটেল পূর্তি করেছে ১০ লাখ গ্রাহকের কোটা৷ সিটিসেলও হাফ মিলিয়ন গ্রাহকের কোটা পূরণের পথে৷ আর সর্বশেষ কম্পানি সেবা টেলিকম কিনে নিয়েছে ওয়ার্ল্ড জায়ান্ট অরাসকম৷ ধারণা করা হচ্ছে ২০০৫ সালে অরাসকমের আগ্রাসী মার্কেটিংয়ে মোবাইলের অন্য তিনটি কম্পানি নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হবে৷ তখন মোবাইলের কলরেট কমবে৷ তবে এবছর দফায় দফায় সিম কার্ডের দাম কমেছে৷ এখন সর্বনিম্ন ১৯০ টাকায় সিম কার্ড পাওয়া যাচ্ছে৷ এবছর মোবাইল নিয়ে বির্তকিত মোবাইল মেলারও আয়োজন ছিলো গ্রামীণের পক্ষ থেকে৷ যথারীতি নেটওয়ার্ক সমস্যা, কথা বলতে বলতে লাইন কেটে যাওয়া ইত্যাদি ধরনের ভোগান্তি গ্রাহকদের সারা বছর জুড়েই ছিলো৷

বিটিটিবি-র ল্যান্ড ফোন দশ লাখের কোটা পূরণ করলেও অন্য বছরগুলোর মতোই তাদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের পাহাড় ঠিকই রেখেছে৷ হাজার হাজার গ্রাহকের ডিমান্ড নোট জমা দিয়েও ফোন না পাওয়ার পুরনো অভিযোগ এবছরও বহাল ছিলো৷ ভূটান, নেপাল, মালদ্বীপ কিংবা ভারত কোন দেশের কাছ থেকেই শিক্ষা নিতে চায় না বাংলাদেশের টিএন্ডটি৷

এবছরে প্রথমবারের মতো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন তৈরি করেছে ডিজিটাল একসেস ইনডেক্স৷ এই ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ১৭৮টি দেশের মধ্যে ১৩৮তম৷ সার্কের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ৷ এই ইনডেক্স তৈরির ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ফিক্সড টেলিফোন গ্রাহক সংখ্যা, মোবাইল ফোন গ্রাহক সংখ্যা, জিডিপি অনুপাতে মিনিট প্রতি ইন্টারনেট ব্যবহার খরচ, মাথাপিছু আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ, প্রতি ১০০ জনে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে৷

এদিকে সাবমেরিন ক্যাবলে বাংলাদেশের সংযুক্ত হওয়া এ বছরও সম্ভব হয়নি৷ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আরো শস্তা হয়েছে৷ পাড়ায় ও মহল্লায় এর প্রসার ঘটেছে৷ ঢাকার বাইরেও বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোতে এবং বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ কিছু কিছু জেলাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে৷ মোটামুটি ৮০০/৯০০ টাকায় ৩০ িদন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটের বাসাবাড়িতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে৷ সাইবার ক্যাফেগুলোতেও ঘণ্টাপ্রতি ব্যবহার খরচ আরো কমেছে৷ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট জনপ্রিয় হওয়ার আরো একটি কারণ বিটিটিবি-র ল্যান্ড ফোনের স্বল্পতা৷ তবে আঞ্চলিক ভিত্তিতে এবছর বেশ কয়েকটি কম্পানিকে ল্যান্ড ফোন পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু বেতার তরঙ্গের অব্যবস্থাপনার কারণে তারা কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না৷

বেতার তরঙ্গের ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা ও উপলব্ধিগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশে অনেক কা িঙ্ক্ষত কমিউনিটি রেডিও এ বছরও চালু হয়নি৷ অথচ সার্ক দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও শ্রীলংকা ১৯৯৫ সালে কমিউনিটি রেডিও চালু করার মাধ্যমে জনসাধারণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে৷ পরবর্তীতে সার্ক দেশের আইসিটি জায়ান্ট ইনডিয়ার সুশীল সমাজের চাপে ও ইনডিয়ান সুপৃম কোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে ইনডিয়ান সরকার কমিউনিটি রেডিও পরিচালনার অনুমতি দেয়৷ নেপাল, শ্রীলংকা ও ইনডিয়াতে কমিউনিটি রেডিও সেসব দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রেখে চলেছে৷ দেশে কমিউনিটি রেডিও চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের সঙ্গে জোরালো লবি করে যাচ্ছে দুটি বেসরকারি সংস্থা বিএনএনআরসি এবং সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান৷ তারা আসন্ন সার্ক শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে দারিদ্র বিমোচনে সার্ক দেশগুলোতে মধ্যে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি আইসিটি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার বৃদ্ধির দিকটি তুলে ধরেছে।

সার্ক দেশগুলোতে হার্ডওয়্যারসহ বিভিন্ন ধরনের আইসিটি বিষয়ক পণ্য কারখানা গড়ে উঠতে পারে৷ স্মরণে রাখা যেতে পারে, শুধুমাত্র বাংলাদেশের বাজারেই বছরে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার কমপিউটার হার্ডওয়্যার বিক্রি হয়৷ এর মধ্যে ইউপিএস ছাড়া বাকি সব পণ্যই বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়৷ এবছর ইনডিয়ার নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে৷ এই মেশিনগুলো ইনডিয়াতেই তৈরি করা হয়েছে৷ ৫৫০০ রুপি মূল্যের এই মেশিনগুলো কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে৷ আমাদের প্রয়োজন ও চাহিদা বিবেচনায় রেখে আমরা কেন কিছু করতে পারছি না সেনিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে৷

প্রতি বছরের মতো এবছরও আইসিটি বিষয়ক কয়েকটি মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ তবে এবছরের লক্ষণীয় দিক ছিলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে এবছর খুলনাতেও সফল মেলার আয়োজন হয়েছে৷ বিসিএস এর নিয়মিত আয়োজন কমপিউটার মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে নভো থিয়েটারে৷ এই ধরনের মেলাগুলো ছাড়াও সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে আইসিটি বিষয়ক সভা সেমিনার হয়েছে৷ সেখান থেকে আইসিটি খাত কিছুটা হলেও দিক নির্দেশনা পেয়েছে৷

কিন্তু দেশে আইসিটি খাতের প্রসার ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি৷ এই সেক্টরে আগামী বছরগুলোতে কি পরিমাণে কর্মসংস্থান হতে পারে সেনিয়ে ইনডিয়াতে গত কয়েক বছর ধরে সরকার পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানোর কারণে অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারছেন৷ আমাদের দেশে এ নিয়ে কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না৷ এবছর ডাটা এ িন্ট্র, মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন, কল সেন্টার ইত্যা িদ খাতে কোটি কোটি বিদেশী টাকা আয়ের কথাবার্তার ফুলঝুরি ছিলো কম৷ এটি ভালো লক্ষণ৷

২০০২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত আইসিটি নীতিমালার ৩.৬.৫ প্যারাতে বলা হয়েছে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, ডিপার্টমেন্ট এবং স্বায়ত্ত্বশাসিত সংস্থা ওয়েবসাইট তৈরি করবে যেখানে তাদের সকল ধরনের পলিসি ডকুমেন্ট, ফরম সার্কুলার, অর্ডার, নোটিফিকেশন ইত্যা িদ থাকবে৷ এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন সকল ধরনের তথ্যা িদ যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ওয়েবে দিতে হবে ও নিয়মিতভাবে আপডেট করতে হবে৷ এই নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এবছরও কাজ করে চলেছে৷ নতুন নতুন বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট এবছর চালু করা সম্ভব হয়েছে৷ ওয়েবসাইট তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য থাকছে৷ কিন্তু ই-সরকার প্রবর্তনে ওয়েবসাইট তৈরিই শেষ কথা নয়৷

পৃ িথবীর অনেক দেশে যখন কমপিউটার ও ইন্টারনেট পড়ালেখা করার সনাতনী ধরনটি বদলে দিতে শুরু করেছে এবং খাতা পেনসিল নিয়ে পরীক্ষা দেয়ার দিন ফুরানোর গল্প বলছে সেখানে আমরা বিভাগীয় শহরগুলোর সব স্কুলেই কমপিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পারিনি৷ আবার যে স্কুলগুলোতে কমপিউটার দিতে পেরেছি সেখানে উপযুক্ত শিক্ষক দিতে পারিনি৷ এ নিয়ে আমাদের কোনো দীর্ঘমেয়া িদ পরিকল্পনাও নেই৷ আমরা পিছিয়েই যাচ্ছি৷

আইসিটির মতো গতিশীল একটি বিষয়ে যে অগ্রগতি ও অর্জন আমাদের দেশে গত একবছরে যা হয়েছে তাকে বিবেচনায় নিলে বলা যায় আমরা একটি প্রায় নিস্ফল ও গদবাধা বছর পার করলাম৷

2 thoughts on “গদবাধা একটি বছর

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s