জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র- গোলাম নবী জুয়েল


১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি ‘গোলাম নবী জুয়েল’ নামে লিখতাম।

জনগণ রাজনীতিক দ্বারা চালিত একটি আধুনিক দেশ চায়, আমলা নির্ভর চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়ন্ত্রিত পঙ্গু কোন দেশ জনগণ আর চায় না৷ জনগণ আরো দেখতে চায় যারা জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তারা শাস্তি পাচ্ছে৷ হয়তো এভাবেই শুদ্ধ সেবা ব্যবস্থা জনগণ পেতে পারবে৷’

সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকার অনলাইন কলামে প্রকাশিত আমার লেখাগুলো থেকে বাছাই করে কিছু লেখা আমার ব্লগে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিচের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ১ মার্চ ২০০৫ সালে। জোট সরকার তখন ক্ষমতায়।

জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র– গোলাম নবী জুয়েল

সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ টেলিফোন এন্ড টেলিগ্রাফ বোর্ড (বিটিটিবি)-র মোবাইলফোন আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে৷ অনেকটা পানিতে উদের ডুব দেয়ার মতো থেমে থেমে গত কয়েক বছর ধরেই বিটিটিবির মোবাইল ফোন চালুর বিষয়টি খবরে স্থান পাচ্ছে৷ ওই পর্যন্তই, সাধারণ জনগণের হাতে মোবাইল ফোন আর পৌঁছে না৷  খালেদা জিয়া সংসদে জানিয়েছেন মার্চের শেষ নাগাদ বিটিটিবি’র মোবাইল ফোন জনগণের হাতে পৌঁছবে৷ খালেদা জিয়া বিটিটিবি’র মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলার আগে সর্বশেষ বিটিটিবি’র মোবাইল ফোন আলোচনায় এসেছিল গত ডিসেম্বরে যখন টেলিফোন মন্ত্রী আমিনুল হক নিজের চ্যালেঞ্জ রক্ষায় মোবাইল ফোন উদ্বোধনের নাটকীয় ঘটনাটি ঘটান৷ তার আগে ১২ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মোবাইল ফোনের কলরেট হ্রাস করার সুপারিশ করলে বিষয়টি তখন পত্র পত্রিকায় বেশ আলোচিত হয়৷ কমিটির সদস্যরা মোবাইল ফোনের কলচার্জ অত্যধিক উল্লেখ করে এটি মেনে নেয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছিলেন৷ তখন একবার বিটিটিবি’র মোবাইল ফোন চালুর বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল৷

দীর্ঘ পাচ বছর ধরে হচ্ছে হবে করে বিটিটিবি’র মোবাইল ফোন চালু না হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি সত্য এশের মানুষ আরেকবার উপলব্ধি করতে পেরেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগ পেলে এদেশে আমলারাই সবচেয়ে শক্তিধর অংশ হয়ে উঠে৷ সেসঙ্গে অর্থকড়ি যুক্ত হয়ে পুরো পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠে যেখানে জনগণের অবস্থা ত্রিশঙ্কু হতে বাধ্য৷ টিএন্ডটির (বিটিটিবি)মোবাইলের বেলায় তেমনটিই ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে৷

একটি জাতীয় সরকার প্রজাতন্ত্রের কতিপয় কর্মচারীর কাছে যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে৷ বিটিটিবির কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে বিটিটিবি রক্ষা কমিটি তৈরি করেছে৷ তারা দাবী করছে বিটিটিবি একটি লাভজনক সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান যাকে কম্পানিতে রূপান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে৷ তারা আরো দাবী করছে, এর পিছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে৷ অতএব তাদের দাবী হলো বিটিটিবির মোবাইল ফোন তাদের মাধ্যমেই বিতরণ করতে হবে এবং বিটিটিবি-র মোবাইল ফোন দেয়ার জন্য কোনো পৃথক কম্পানি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না৷

বিটিটিবি রক্ষা কমিটির প্রথম দাবী, বিটিটিবি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, এ নিয়ে এ দেশের একজন মানুষেরও দ্বিমত নেই৷ কিন্তু এই লাভ করার বিষয়টি কতটা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতার কারণে এবং কতোটা ডিফল্ট বা ডিফেক্টো তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে৷ ফিক্সড ফোন ব্যবসায় বিটিটিবি মনোপলি ব্যবসা করে আসছে৷  স্বাধীনতার ৩৪ বছরে বিটিটিবি মাত্র ৮ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহক তৈরিতে সক্ষম হয়েছে৷ অন্যদিকে বেসরকারি ১টি মোবাইল ফোন কম্পানি মাত্র ৭ বছরেই ২৫ লাখ গ্রাহক তৈরি করেছে৷ এক্ষেত্রে তাকে অন্য তিনটি কম্পানির ব্যবসায়িক কৌশল মোকাবেলা করতে হয়েছে৷ কিন্তু বিটিটিবিকে তাও করতে হয়নি৷ ফিক্সড ফোনের ক্ষেত্রে বিটিটিবি অনেকটাই একচেটিয়া মনোপলি করেছে৷

অন্য দিকে সবমিলিয়ে বেসরকারি মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোর মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ৷ এই সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে৷ মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মিনিট প্রতি সর্বোচ্চ বিল নেয়ার অভিযোগ থাকার পরেও জনগণ মোবাইল ফোন কিনছে৷ ব্যবহার করছে৷ কিংবা করতে বাধ্য হচ্ছে৷ কারণ জনগণের অর্থে পরিচালিত বিটিটিবি বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করে মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোর উপর চাপ তৈরি করতে পারেনি৷ বরং আমরা লক্ষ্য করেছি বিটিটিবি মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোর চাপে পড়ে গত বছর বেশ কয়েকবারই তাদের ফোন রেট পুর্ননির্ধারণ করেছে৷ সর্বশেষ এবছর তারা আন্তজেলা কলচার্জ মিনিট প্রতি দেড় টাকায় পুর্ননির্ধারণ করেছে৷

জনগণ কম রেটে কথা বলতে চায়৷ এজন্য বিটিটিবির ফিক্সড ফোনের জন্য তারা আবেদনও করে থাকে৷ কিন্তু বিটিটিবি-র ফোনের জন্য ২০০৪ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে ডিমান্ড নোটের ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে এক বছর পরে এখনো ফোন সংযোগ পায়নি এমন অনেকেই আমি চিনি৷ কিন্তু মোবাইল ফোনের সংযোগ নেয়ার জন্য ফরম পূরণ করে টাকা জমা দিয়েছেন কিন্তু ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মোবাইল ফোন চালু হয়নি এমন কাউকে আমি চিনি না৷ বাজি ধরে বলা যায়, কেউ চেনে না৷ মোবাইল কম্পানিগুলো পারছে, কিন্তু বিটিটিবি পারছে না কেন?

বিটিটিবি রক্ষা কমিটির লোকদের আগে বুঝতে হবে, বিটিটিবি-কে রক্ষা করতে হলে আগে বিটিটিবি-র জঞ্জাল সরাতে হবে৷ অদক্ষ, অসত্, দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিদায় করতে হবে৷ একটি প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে চালানোটাই বড় কথা নয়৷ এর অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ৷ বিগত বছরগুলোতে বিটিটিবি কতোটা অগ্রসর হতে পেরেছে সেটি আগে বিবেচনা করতে হবে৷

ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তৈরি করা ডিজিটাল একসেস ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮তম৷ সার্কের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ৷ ১৯৯১ সালের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশ টেলিফোন ব্যবহারের শতকরা হারের দিক থেকে ভূটান, নেপাল ও মালদ্বীপের চেয়ে এগিয়ে ছিল৷ কিন্তু এখন অবস্থা বদলে গিয়েছে৷ টেলিফোন ব্যবহারের শতকরা হারের বিচারে বাংলাদেশ এখন ভূটান, মালদ্বীপ ও নেপালের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে৷ এই যে আমাদের পিছিয়ে পড়া এর জন্য আমরা কি কখনো বিটিটিবি-র কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জবাব িদহি করেছি? কিংবা বিটিটিবি-র কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যে হাজারো অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে থাকে তারজন্য কতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে কিংবা শা িস্ত দেয়া হয়েছে?

বিটিটিবি রক্ষা কমিটি এই ধরনের বিষয়গুলো কি কখনো ভেবে দেখেছে৷ তাদেরকে ভেবে দেখতে হবে তারা কোন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করছে৷ আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে তাদেরকে খুঁ জে দেখতে হবে তারা কার স্বার্থে কাজ করছে৷ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের স্বার্থ দেখাই তাদের কাজ৷ এজন্যই তাদেরকে বেতন ভাতা দিয়ে জনগণ পেলে পুষে রাখে৷

তাদের চাকরি বিপন্ন হোক এটি সাধারণ জনগণ কখনোই চায় না৷ কিন্তু  সাধারণ জনগণ বছরের পর বছর ব্যর্থ নেতৃত্বের কারণে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অসেবামূলক আচরণের শিকার হতে চায় না৷  জনগণ সবর্দা অগ্রগতির পক্ষে৷ এজন্যই জনগণ প্রতি পাচ  বছর অন্তর রায় দেয়, রাজনৈতিক সরকার গঠন করে৷ তাদের কাছ থেকে অন্যায়ের প্রতিকার চায়৷ এখন দেশে ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোট সরকারের কাছ থেকেও জনগণ আশা করে এমন পদক্ষেপ যা জনগণের পক্ষে যাবে৷ কিছু লোকের খেয়ালখুশির আচরণে বেশিরভাগ মানুষের কল্যাণ বিঘ্নিত হবে তা তো হতে পারে না৷ বিটিটিবির যা কিছু জনকল্যাণমূলক সংস্কার তা করতেই হবে৷ দেশে টেলিকমিউনিকেশন নীতি রয়েছে, আছে আইসিটি নীতিমালা, এধরনের নীতিমালাগুলোর বাস্তবায়নে সরকারকে প্রয়োজনে আরো কঠোর হতে হবে৷ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই৷ কোন মতলববাজ গোষ্ঠী য িদ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়, সেক্ষেত্রে কঠোর হস্তে সেটি দমন করতেই হবে৷

দেশের অগ্রগতিতে স্বল্প কলচার্জে জনগণের হাতে ফোন পৌঁছে দেয়া আবশ্যক৷ ১৯৯৮ সালে আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জনে টেলিফোন সংযোগ সংখ্যা ছিল ৪টি৷ সেসময়ে প্রণীত টেলিকমিউনিকেশন নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে স্বল্পমেয়াদী এক পরিকল্পনার আওতায় সরকারের লক্ষ্য হলো দেশে ১৩ লক্ষ টেলিফোন সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে ২০০০ সালের মধ্যে প্রতি ১০০০ জনে টেলিফোন সংখ্যা ১০টিতে উন্নীত করা৷ আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি৷ এখন আমাদের সামনে রয়েছে টেলিকমিউনিকেশন নীতির মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১০ সালের মধ্যে প্রতি হাজার জনে ৪০টি এবং ২০২৫ সালে ১০০টি টেলিফোন সংযোগ প্রদান করা৷ এ লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি কম্পানিকে  ফিক্সড ফোন অপারেট করার লাইসেন্স দিয়েছে৷ লাইসেন্সপ্রাপ্ত কম্পানিগুলো লাইসেন্সের শর্ত মেনে কাজ করছে কিনা সেটি এখন কঠোরভাবে দেখতে হবে৷ মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোও আইনের আওতায় সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা তাও সরকারকে দেখতে হবে৷ বিটিআরসি এ লক্ষ্যে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে নাকি ঢিলেঢালাভাবে কাজ করছে তা দেখা ও জানারও অধিকার জনগণের রয়েছে৷ মোদ্দা কথা হলো জনগণের অধিকার রক্ষায় যারাই অন্তরায় হবে তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সরকার ও বিরোধী দলকে সোচ্চার হতে হবে৷ দেশের মানুষ রাজনীতিবিদদের জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ আশা করে৷ জনগণ রাজনীতিক দ্বারা চালিত একটি আধুনিক দেশ চায়, আমলা নির্ভর ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়ন্ত্রিত পঙ্গু কোন দেশ জনগণ আর চায় না৷ জনগণ আরো দেখতে চায় যারা জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তারা শাস্তি পাচ্ছে৷ হয়তো এভাবেই শুদ্ধ সেবা ব্যবস্থা জনগণ পেতে পারবে৷

১ মার্চ ২০০৫

Advertisements

One thought on “জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র- গোলাম নবী জুয়েল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s