ওপেন সোর্স ও ফৃ সফটওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে – গোলাম নবী জুয়েল


ওপেন সোর্স নিয়ে আমার এই লেখাটা যায়যায়দিন এ প্রকাশিত হয়েছে ২০০২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। সেসময়ে আমি গোলাম নবী জুয়েল নামে লিখতাম। যায়যায়দিন পত্রিকার ‍পাঠকদের ওপেন সোর্স সম্পর্কে জানাতে ও আগ্রহী করতেই আমার এই লেখা। যায়যায়দিন এ প্রকাশিত আমার লেখাগুলো থেকে বাছাই করা কিছু লেখা প্রকাশের ধারাবাহিকতায় এটি প্রকাশ করা হলো।

ওপেন সোর্স ও ফৃ সফটওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে – গোলাম নবী জুয়েল

পারসোনাল কমপিউটার (পিসি) ব্যবহারকারী অথচ মাইক্রোসফট ও বিল গেটসের নাম শোনেনি এমনটা খুঁ জে পাওয়া যাবে না৷ এই যে ব্যাপক পরিচিতি এটি সম্ভব হয়েছে পিসি অপারেটিং সিস্টেমের বাজারে বিল গেটসের কোম্পানি মাইক্রোসফটের প্রায় একক আধিপত্যের কারণে৷ তবে একচেটিয়া ব্যবসার নেতিবাচক দিক থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেনি মাইক্রোসফট৷ ফলে বেশ কয়েক বছর যাবত মাইক্রোসফট ও বিল গেটসকে তাদের ব্যবসায়িক অবস্থান থেকে একটু নড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে৷

এক্ষেত্রে বছর দুয়েক আগে সফলতার এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে ভিএ লিনাক্স৷ ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরের ৯ তারিখে শেয়ার বাজারে আগমনের প্রথম দিনেই ভিএ লিনাক্স শেয়ারের সূচনা মূল্য ৩০ ডলার দিনের শেষে ৭০০ শতাংশ বেড়ে হয় ২৩৯.২৫ ডলার৷ মিডিয়া এ বিষয়টিকে নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালায়৷ ভবিষ্যত বক্তারা লিনাক্স নিয়ে আশাবাদী হয়ে একে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ভিত্তিক দ্বিতীয় প্রজন্মের নেট বানিজ্যের অগ্রপ িথক বা প্রবক্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে৷ কিন্তু আশার সেই বড় ফানুসটি হঠাত্ই চুপসে গেলো যখন ডট কম বানিজ্যের পতন লিনাক্সকে অনেকটা ধসিয়ে দেয়৷ পরিস্থিতকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি লিনাক্সের বিনিয়োগকারীরা এমনকি কয়েকটি বড় ধরনের ক্রেতা সংস্থাও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়৷ ফলে লিনাক্সের আয় দ্রুত কমতে থাকে৷ ২০০০ সালের তৃতীয় কোয়ার্টারের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৪.৬ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার সেটি ২০০১ সালে একই সময়ে হয়ে গেলো ২০.৩ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার৷

এই পরিস্থিততে লিনাক্স প্রস্তুতকারী কোম্পানি কর্মী ছাটাইয়ে বাধ্য হলো৷ শুধু তাই নয়, গত ডিসেম্বরের ৫ তারিখে একটি কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভিএ লিনাক্সের নতুন নামকরণ করা হলো ভিএ সফটওয়্যার৷ ডট কম বাণিজ্যের পতনে আরো বেশ কয়েকটি নামী দামী ফৃ সফটওয়্যার কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ রেড হ্যাট এদের অন্যতম৷ রেড হ্যাটের আয়ের অন্যতম প্রধান উত্স হলো জিএনইউ/লিনাক্স বিক্রি ও সহায়তা প্রদান৷ লিনাক্সের রাজস্ব কমে যাওয়ায় রেড হ্যাট বিপাকে পড়ে৷ ২০০০ সালের শুরুর তুলনায় রেড হ্যাটের শেয়ার প্রতি মূল্য ২০ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে৷ তবে রেড হ্যাটের বড় শ িক্ত হলো এর প্রোগ্রামাররা৷ কিন্তু শুধুই প্রোগ্রামার ট্যালেন্ট দিয়ে একটি কোম্পানি টিকতে পারে না সেই উদাহরণ রেড হ্যাটের মতো আরো অনেক ক’টা ফৃ সফটওয়্যার কোম্পানির বেলায় লক্ষ্য করা গিয়েছে৷ ইলে এদের মধ্যে অন্যতম৷ তিন সফটওয়্যার জিনিয়াস মিলে ১৯৯৯ সালের অগাস্টে শুরু করেছিল ইজেল৷ এদের মধ্যে কিংবদন্তীতুল্য প্রোগ্রামার এন্ডি হার্জফেল্ডও রয়েছেন৷ তাদের লক্ষ্য ছিল জিএনইউ/লিনাক্সকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যে পর্যায়ে দ্বিতীয় কোন সিস্টেম এই মুহূর্তে নেই৷ তারা চেয়েছেন এটি এতোটাই ইউজার ফ্রেন্ডলি হবে যে মানুষ আগ্রহ ভরে শুধু এটিই ব্যবহার করবে৷ আইডিয়াটি টেকনিক্যালি চমত্কার কিন্তু পুরো পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটি হলো তিন জিনিয়াস ইজেলকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভালো কোন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করে রাখেনননি৷ ফলে কমপিউটার কোম্পানি ডেল ও সানের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার পরও ইজেল ২০০১ সালের মে মাসে বন্ধ হয়ে যায়৷

ডট কম বানিজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে একটি শ িক্তশালী ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারের এমন ভগ্ন দশা দেখে মনে হতে পারে ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারের দিন শেষ৷ কিন্তু বাস্তব বলছে ভিন্ন কথা৷ ডট কমের পতনে ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যার বানিজ্য বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়েছে ঠিকই কিন্তু সেটি এর মূল কনসেপ্ট ও কনটেন্টকে আচড় কাটতে পারেনি৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যার বানিজ্যে যে পতনমুখী পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেটি মুদ্রার এক পিঠ মাত্র৷ মুদ্রার অন্য পিঠে তাকালে দেখা যাবে ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে৷

কারণ ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারের যে সুবিধা সেটি মাইক্রোসফটের বহুল প্রচলিত উইন্ডোজ, সানের সোলারিস অপারেটিং সিস্টেম বা এ ধরনের প্রোপ্রাইটরি বা স্বত্বযুক্ত সফটওয়্যারগুলোতে পাওয়া যাবে না৷ ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারের লাইসেন্সের কতগুলো অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ যেমন: এ ধরনের সফটওয়্যার বিনামূল্যে বিতরণ করা যায়; সোর্স কোড প্রোগ্রামের সাথে থাকে, আর য িদ না থাকে তবে সেটি কোথায় পাওয়া যাবে সেই তথ্যটি থাকে এবং এই সোর্স কোড ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিনামূল্যে ডাউনলোড করার সুযোগ থাকে; ব্যবহারকারীর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংযোজনের সুযোগ এবং সেটি অন্যকে দেয়ার সুবিধা থাকে; সোর্স কোডে যে কোন ধরনের পরিবর্তনের পর নতুন নাম বা সংস্করণ নম্বর বসাতে হয় যাতে করে ব্যবহারকারী জানতে পারেন মূল সফটওয়্যারে কি ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে কোন ধরনের সহায়তার দরকার হলে এর প্রস্তুতকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন; ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যার কোন ব্য িক্ত, দেশ বা দলের জন্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যায় না (প্রোপাইটরি সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় কোন কোন দেশে কিছু কিছু ধরনের সফটওয়্যার রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে); ব্য িক্তগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে কিন্তু বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতে পারবে না – এমন কোন বিধিনষেধ নেই ইত্যা িদ৷ ফলে ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে চলেছে৷ আর একটি বিষয় লক্ষণীয় ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে ইন্টারনেটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে৷ ইন্টারনেটের সুবিধা পাওয়া না গেলে আজকে ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যারেরর যে অবস্থান আমরা দেখছি সেটি কখনোই হতে পারত না৷ নেট থেকে সোর্স কোড ডাউনলোড করে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজটি করেন প্রোগ্রামাররা এবং তারা এটি করেন তাদের সুবিধাজনাক সময়ে৷ কাজটি প্রোগ্রামাররা করেন মনের আনন্দে কোড লেখার আগ্রহ থেকে৷ এখানে অর্থের বিষয়টি মুখ্য নয়৷ প্রোপ্রাইটরি সফটওয়্যারের চিত্রটি একদমই উল্টো৷ ও ধরনের সফটওয়্যারের প্রোগ্রামাররা পুরো কাজটিই করেন অর্থের জন্য৷ আরো বেশি কামাইয়ের জন্য৷

সে যা হোক ব্যবহারকারীদের আগ্রহ দেখে ক্রমশ বড় বড় কমপিউটার নির্মাতা কোম্পানিগুলো এখন লিনাক্সের মতো ওপেন সিস্টেম/ফৃ সফটওয়্যারের বিকাশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছে৷ আইবিএম এদের মধ্যে অন্যতম৷ আইবিএম তাদের পণ্য ও সেবাকে লিনাক্স উপযোগী করার জন্য ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে৷ আইবিএম-এর পাশাপাশি আরো অনেক কর্পোরেট ব্যবহারকারী লিনাক্স ব্যবহারে এগিয়ে এসেছে৷ আমাজান ডট কম এমন একটি প্রতিষ্ঠান৷ যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় তাদের প্রযু িক্ত ও কনটেন্ট ব্যয় গত বছরের তৃতীয় কোয়ার্টারে ছিল ৭৪ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার যা এই কোয়ার্টারে কমে হয়েছে ৫৪ মিলিয়ন ডলার৷ এই যে বিপুল ব্যয় সাশ্রয় সেটি সম্ভব হয়েছে অনেক কারণে তবে প্রাথমিক কারণটি হলো জিএনইউ/লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহার৷ ওপেন সোর্স সলিউশন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আইটি বাজেট হ্রাস করতে চাচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সফলতার সঙ্গে কাজটি করতে পারছে৷ সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উভয় ক্ষেত্রেই তারা অর্থ সাশ্রয় করতে পারছে৷ এ ধরনের কার্যকারিতায় এখন বৃটিশ সরকার পর্যন্ত ওপেন সিস্টেম/ফৃ সফটওয়্যার ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করছে৷ সম্প্রতি প্রকাশিত ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার সংক্রান্ত এক সুপারিশে বৃটিশ সরকারকে প্রোপ্রাইটরি সফটওয়্যারের পাশাপাশি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার সংগ্রহ বা কেনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে৷

এ ধরনের একটি পরিস্থিততে সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা মাইক্রোসফটের৷ কিন্তু সেটি না হওয়াই তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে সেই ই িঙ্গতই এখন পাওয়া যাচ্ছে৷ বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় বিল গেটসকে সর্তক করে লেখা হয়েছে- ওপেন সোর্স/ফৃ সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর প্রসার তেমনভাবে না ঘটলেও এ ধরনের সফটওয়্যারের ব্যবহারকারী দিনে দিনে বেড়েই চলেছে৷ গার্ডিয়ান মোটেই বাড়িয়ে বলেনি৷ পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে মাইক্রোসফট৷

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০২

Advertisements

One thought on “ওপেন সোর্স ও ফৃ সফটওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে – গোলাম নবী জুয়েল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s