ভিওআইপি সকলের জন্য – গোলাম নবী জুয়েল


১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি ‘গোলাম নবী জুয়েল’ নামে লিখতাম।

ভিওআইপি এদেশের রাজনীতিবিদদের অনেক কিছু দিয়েছে। নদীতে বানের জলের মতোই ভিওআইপি-র অর্থকড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেককে। আর তাই, একে সত্যিকার অর্থে বন্ধ কিংবা উম্মুক্ত কিছুই করতে চাওয়া হয়নি।

২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর যায়যায়দিন অনলাইনে প্রকাশিত এই লেখাতে তার কিছুটা ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

ভিওআইপি সকলের জন্য – গোলাম নবী জুয়েল

ঘটনা এক: একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ২ লক্ষ শব্দের বড় ধরনের অনুবাদ কাজ চলছে৷ অনুবাদ করছেন তিনজন৷ তারা থাকেন উত্তরা, কাঠালবাগান এবং পল্লবীতে৷ যিনি কাজটি সম্পাদনা করছেন তিনি থাকেন বনানীতে৷ ফাইল দেয়া-নেয়া সবই তারা করছেন ই-মেইলে৷ ফাইল পাঠিয়ে মোবাইলে মেসেজ পাঠাচ্ছেন মেইল চেক করার জন্য৷  মোবাইলের অত্যধিক বিলের কারণে যে ধরনের কথা বলার জন্য ২/১ মিনিট লাগছে সেটিই শুধু মোবাইলে বলছেন৷ বেশি কিছু বলার থাকলে ল্যান্ড ফোন ব্যবহার করছেন৷

ঘটনা দুই: ঢাকার পল্টনে গ্রাফিক ডিজাইনার এম. আতিকুর রহমানের অফিস৷ তিনি বিশ্ব ব্যাংকের ওয়াশিংটন অফিসের কনসালটেন্ট ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন৷ ওয়াশিংটন অফিসের কারো সঙ্গেই তার কখনোই দেখা হয়নি৷ ইন্টারভিউ হয়েছে ই-মেইল ও টেলিফোনে৷ এখন ওয়াশিংটন থেকে ই-মেইলে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ পাঠানো হয়৷ তিনি কাজটি শেষ করে ই-মেইলে এটাচমেন্ট ফাইল আকারেই ডিজাইন পাঠিয়ে থাকেন৷ পেমেন্ট পান ডলারে, বাংলাদেশে তার নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়৷

ঘটনা তিন: ঢাকার একটি সফটওয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বনানীতে৷ এই মুহূর্তে তারা একটি সফটওয়ারের উপর কাজ করছে যেটির অন্য দুই অংশে কাজ করছে ভারত ও ডেনমার্কের দু’ িট পৃথক টিম৷ তারে মধ্যে প্রতিদিনই যোগাযোগ হচ্ছে ইন্টারনেট ও ফোনে৷

এই তিনটি ঘটনার প্রতিটিতে একটি কমন বা সাধারণ উপাদান রয়েছে সেটি হলো ইন্টারনেট৷ ইন্টারনেট ব্যবহারের এই ধরনটি আমাদের দেশে বৈধ ও দিনে দিনে সাধারণ এক ঘটনায় পরিণত হতে চলেছে৷ আমরা প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহারে দক্ষ ও তত্পর হয়ে উঠতে পারছি৷ এটি নিঃসন্দেহে খুশির কথা৷

কিন্তু ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় সুবিধাটি আমরা নিতে ব্যর্থ হচ্ছি কারণ সেটি অবৈধ৷ সেটি হলো ভিওআইপি বা ভয়েস ওভার ইন্টারনেট৷ আইপি টেলিফোনি নামে যেটি সবার কাছে পরিচিত৷ ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ভিওআইপি উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে৷ ফলে সেদেশগুলোতে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে৷ আমাদের দেশেও ভিওআইপি উম্মুক্ত করার বিষয়ে সরকার পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে৷ বেসরকারি পর্যায়ে আন্দোলন হচ্ছে৷ ফলাফল এখন পর্যন্ত শূণ্য৷

ভিওআইপি উম্মুক্ত যাতে না হয়৷ এটি যাতে বৈধতা না পায় সেজন্য ভিতরে ভিতরে তত্পর রয়েছে তিন শ্রেণীর পেশাজীবী৷ এদের মধ্যে রয়েছেন টিএণ্ডটি-র অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারি, দ্বিতীয়ত রয়েছেন অবৈধভাবে ভিওআইপি সেবা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া অসাধু ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী কতিপয় প্রতিষ্ঠান এবং সর্বশেষে কিন্তু সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদগণ৷ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সেসময়কার কতিপয় পরাক্রমশালী সরকারের কাছের রাজনীতিবিদগণ চাননি ভিওআইপি বৈধতা পাক, এখন বিএনপি সরকারের আমলেও একই অবস্থা৷ কারণ একটাই অবৈধতার সুযোগে চড়া লাভে নিয়মিত আয় বহাল রাখা৷ অভিযোগে প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর নিকটজনেরা, যারা আতীয়ের পর্যায়ে পড়েন তারাও অবৈধ ভিওআইপি থেকে লাভবান হচ্ছেন৷

আইএসপিগুলো তাদের সংগঠনের নেতৃত্বে গত মাসে ভিওআইপি বৈধ করার জন্য যে আধঘণ্টার কর্মবিরতি করল সেটি একটি প্রতীকি প্রতিবাদ৷ তবে একথাও সত্যি এদের বড় অংশটাই অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত৷ তাদের যুক্তি হলো আমি না করলেও তো অন্যরা করবে৷ তাহলে আমি কেন করবো না৷ এই যু িক্ত রাজনীতিবিদদেরও৷ তাদের যুক্তি হলো সরকার বৈধ করে দিলেই তো হয়৷ বৈধ না করা পর্যন্ত অবৈধতার সুযোগ তো কেউ না কেউ নিবে৷ তাহলে আমি কেন নেব না৷ খাটি কথা৷ এটি একটি বড় ধরনের গ্যাড়াকল৷ এতে পড়ে খাবি খাচ্ছে জনগণ৷ মুক্তির উপায় কি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ? হয়তোবা৷

প্রধানমন্ত্রী কেন ভিওআইপি উম্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেবেন৷ সহজ যুক্তিটি হলো তিনি জনগণের প্রতিনিধি৷ জনগণের সুখ দুঃখ দেখার দায়িত্ব তার৷ পাল্টা যুক্তি হতে পারে, ভিওআইপি নিয়ে যারা অবৈধ ব্যবসা করছেন তারা কি জনগণ না? প্রধানমন্ত্রী কি তাদের সুখ-দুঃখ দেখবেন না৷ এর উত্তর বোধহয় দু’টি৷ প্রথমত ভিওআইপি এখনো দেশে বৈধ ব্যবসা নয়৷ প্রধানমন্ত্রী অবৈধ কোন কিছুর পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন না৷ দ্বিতীয়ত অবৈধ সুযোগ গ্রহণকারীগণ সংখ্যায় কম, যদিও তারা শক্তিশালী৷ তাদের কারণে বঞ্চিত হচ্ছে যারা তারা সংখ্যায় লক্ষ লক্ষ, এমনকি কোটিতে তাদের গোণা যায়৷

এদেশের যে কোন উপজেলায় গেলে দেখা যাবে টিএণ্ডটি-র মোট টেলিফোন সংযোগের এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহৃত হয় বাণিজ্যিকভাবে৷ অর্থাত্ পর্যাপ্ত টেলিফোন সংযোগ না থাকায় বাণিজ্যিকভাবে টেলিফোন ব্যবহার হচ্ছে৷ মোবাইল ব্যবসাও এদেশে জমজমাট৷ সাম্প্রতিককালে রংপুরে চালু হওয়া মোবাইল নেটওয়ার্ক সেখানকার মানুষকে ভীষণভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছে৷ আমার পরিচিত ৩০ বছর বয়সী এক তরুণ দু’ িট পল্লী ফোরে লাইন কিনে নিয়ে, গ্রামীণের আরো দু’ িট মোবাইল ফোন এবং একটি সিটিসেল মোবাইল সংােগ নিয়ে শহরে মোবাইল ফোনের দোকান দিয়ে বসেছে৷ এখন সে শুধু মোবাইল কোম্পানিগুলোকে বিল বাবদ মাসে পরিশোধ করে প্রায় ১ লক্ষ টাকা৷ তবে বুঝুন তার ব্যবসা কত? এসব উদাহরণের গোড়ার কথা একটাই৷ মানুষ কথা বলছে৷ যারা আগে চিঠি লিখত তারা এখন কথা বলে৷ এতো িদন সুযোগ ছিল না কিংবা বেশি খরচ হওয়ার কারণে কথা বলতে পারতো না৷ এখন কথা বলে৷ মজার ব্যাপার হলো একজন মানুষ ১ মিনিট কথা বলে ৩০ টাকা দিতে রাজী নয় কিন্তু সেই একই ব্য িক্ত ৫ মিনিট কথা বলে ৩০ টাকা ঠিকই দিচ্ছে৷ এক লজিকের কারণেই এনালগ ফোন দিয়ে টিএণ্ডটি-র অবৈধ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা এদেশে চলছে৷ আবার এই একই লজিকের কারণে ফোনের কল চার্জ কমে গেলেও মোট রাজস্ব আয় বাড়ে৷ ভিওআইপি বৈধ করে দেয়া হলে বিদেশে ফোন কল চার্জ মিনিট প্রতি ৩/৪ টাকায় নেমে আসবে৷ এতে করে সরকারের আয় কমবে না৷ কারণ এতে দেখা যাবে মানুষের কথা বলা বাড়ছে৷ কোন দেশের স্মার্ট সরকার কখনোই কোন সেক্টরে রাজস্ব হারায় না৷ কারণ রাজস্ব আযের হাজারটা পন্থা রয়েছে৷ একটি না একটি চালু করে দিলেই হলো৷ ভিওআইপি বৈধ করার পর আইএসপিগুলোর উপর চার্জ বাড়িয়ে দিলেই হলো৷

যারা সরকারের রাজস্ব আয় হারানোর জুজুর ভয় দেখান তারা সেটি দেখান নিজেদের অবৈধ আয় বন্ধ হওয়ার ভয়ে৷ আমাদের দেশে ভিওআইপি বৈধ করার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পূর্বে উল্লেখিত তিন শ্রেণীর মানুষ৷ বাকিরা শুধুই লাভবান হবেন৷ তথ্য প্রযু িক্ত প্রসার সংক্রান্ত সরকারের যেসব সিদ্ধান্ত সেগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামী ২৪ মাসের মধ্যে আশা করা যায় দেশের সব ক’ িট উপলো ইন্টারনেটের আওতায় চলে আসবে৷ ভিওআইপি-র বৈধতা সরকারের ইন্টারনেট সম্প্রসারণের খরচ তুলে আনা সহজ করে দিবে৷ দেশে নতুন পেশার উদ্ভব ঘটাবে৷ কর্মসংস্থান তৈরি হবে৷ প্রযু িক্তর সহজলভ্যতা কৃষি প্রধান এদেশটির কৃষিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে৷ মানুষ যত কম পয়সায় কথা বলতে পারবে ততবেশি প্রযু িক্তর ছোয়া লাগবে৷ বাদ যাবে না কৃষি ক্ষেত্রও৷ আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এদেশের মানুষ ফোনে শুধু খুচরো আলাপই করে না৷ তারা জীবনমান বদলে দিতে পারে এমন তথ্যও বিনিময় করে৷ যা চিঠি লিখে কিংবা অন্য কোন উপায়ে জানাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না৷ আর একথা বলাই বাহুল্য নিয়মিত যোগাযোগ মানে জীবনমানে বদলে যাওয়ার নিয়মিত সুযোগ৷

আজকে এদেশে ভোগ বিলাসী পণ্যের যে বিপুল ব্যবহার তা কি শুধু ওই বিশেষ পণ্যটির সুবিধা থাকার জন্যই৷ অবশ্যই না৷ স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন দিয়ে, নাটকের মাধ্যমে এবং আরো অনেক উপায়ে এদেশে মানুষের কাছে ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যা িদ এতোটাই জনপ্রিয় করে তুলেছে যে, মধ্যবিত্ত মানুষ এখন ড্রয়িং রুমের ভাঙ্গা সোফা না বদলে বরং এসি কিনছে৷ এই যে বদলে যাওয়া৷ সেই ছোয়া অনেক বেশি ইতিবাচক হতে পারবে যখন আমরা ইন্টারনেট ও টেলিফোন সেবা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁ ছে দিতে পারব৷ আমাদের উন্নতির শেষ বিন্দুটি কৃষিতে৷ জল ও জমিতেই আমাদের অর্থনীতির শেষ সমৃ িদ্ধ৷ এখন আমাদের কৃষক বাবা তার জাপান প্রবাসী কৃষিবিদ ছেলের কাছ থেকে ইচ্ছে করলেই কোন সমস্যায় জেনে নিতে পারেন না জমিতে কোন ধরনের ব্যবস্থাপনা নেয়া দরকার৷ কিন্তু ভিওআইপি যখন মিনিটে ৩ টাকা খরচে জাপানে থাকা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে দিবে তখন ঠিকই দেশে থাকা কৃষক বাবা ছেলের কাছ থেকে ৫ মিনিটে জেনে নিবেন তার কি করতে হবে৷ আবার পরের দিন ফলাফল জানাতে পারবেন৷ সেই অবস্থার কথা ভাবাই যায় না৷ আমাদের দেশের উন্নতি আমাদেরকেই করতে হবে৷ বিশ্বের নানান প্রান্তে আমাদের দেশের সফল মানুষেরা যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের যেমন সেখানে থাকার প্রয়োজন রয়েছে তেমনি সেখানে থাকা অবস্থাতেই তাদের কাছ থেকে আমরা কি সেবা নিতে পারি সেদিকে নজর দিতে হবে৷ এই সময়ে একমাত্র ইন্টারনেট ও টেলিফোনই পারে সকল দেশে সকল বাংলাদেশীদের একত্রিত করে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশী কাঠামো গড়ে তুলতে৷

৭ অক্টোবর, ২০০৩

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s