১৫ ডিসেম্বর ২০১০: পলাশীর মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আসরে


12669590_984323148309553_7008292588432993018_n

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

ঢাকার রাস্তার অসহনীয় জ্যাম ঠেলে অনুষ্ঠানস্থলে যখন পৌঁছলাম মঞ্চে তখন মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র অধিকারী পুকুরে গ্রেনেড ছুড়ে রুই কাতল মাছ ধরার কথা বলছেন। আমি তার গল্পের শেষটুকু পেলাম। এরপর অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মুনির হাসান পরবর্তী বক্তা মোস্তফা জব্বারের নাম ঘোষণা করলেন।

জব্বার ভাইকে আমি প্রায় ২০ বছর ধরে চিনি। কিন্তু আজকের মোস্তফা জব্বার যেন ভিন্ন মানুষ। মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা জব্বার। কতোদিন তার সঙ্গে কতো বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ হয়েছে। কিন্তু কখনো মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনা হয়নি। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি। আমরা আসলে কাছের মানুষদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে হবে সেই বিষয়টিই মাথায় রাখি না। তাঁর কাছে আগে মুক্তিযুদ্ধের গল্প না শুনতে চাওয়ার আর কি কারণ থাকতে পারে? এই মানুষগুলোর কাছ থেকে সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে রাখা দরকার। মনে পড়লো ফারহানা ‍আপার কথা। তাঁর বাবা সব সন্তানকে একত্রিত করে বছরে একদিন, ১৬ ডিসেম্বর ‍মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন। তিনি আমাকে সেই গল্প বলেছেন, সেসব আরেকদিন বলা যাবে। তিনি বলেছেন, এতো বছর ধরে বাবার কাছ থেকে একই গল্প শুনেছি যে একসময় আমাদের মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপরও সবসময়ই শুনতে ভালো লাগতো। এখনো মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনলে, শুনতে ইচ্ছে করে।

সেযাক। দ্বিতীয় বক্তায় ফিরে যাই।

মোস্তফা জব্বার

জব্বার ভাই তার গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে চেনা ভঙ্গিতে অল্প কথায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করিয়ে দিলেন। যেমন:

  • ২৫ মার্চ রাতের হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে নয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল ৬৮ সালের পর থেকেই।
  • বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই ছাত্রলীগের সদস্যদের গ্রামে গিয়ে গ্রামগুলোকে সংগঠিত করার জন্য বলা হয়। সেই আদেশকে শিরোধার্য করে মোস্তফা জব্বার চলে যান তার নিজের উপজেলা খালিয়াজুড়িতে। সেখানে গিয়ে তিনি সংগঠিত করেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

তিনি জানান যে, শাল্লা ও দিরাই ছাড়া প্রায় পুরো হাওড় এলাকাই মুক্তাঞ্চল ছিল। আর তার নিজের এলাকা খালিয়াজুড়িতে কোন রাজাকার কিংবা শান্তি কমিটি ছিল ‍না। তিনি তেমন কিছু তৈরি হওয়ার সুযোগ দেননি। তবে শাল্লাতে ১৬১ জন রাজাকার ছিল। যাদেরকে দেশ স্বাধীনতার পর লাইন করিয়ে নদীর পাড়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। সেখান থেকে অবশ্য নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুইজন বেঁচে গিয়েছিল।

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, সেদিন যদি এভাবে সব রাজাকারদের মেরে ফেলা হতো তাহলে আজকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার দরকার হতো না।

হাবীবুল আলম, বীর প্রতীক

জব্বার ভাইয়ের পরের বক্তা ছিলেন হাবীবুল আলম বীর প্রতীক। তিনি ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত এই বর্ণনায় আমি চলে গিয়েছিলাম ১৯৭১ এর সালের সেই দিনগুলোতে। (যদিও আমার বয়স তখন মাত্র দেড় বছর)। মনে হচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধা মায়া, জিয়া, স্বপন ও হাবীবুল আলমের সঙ্গে এখনকার গুলশানের পাকিস্তান হাইকমিশনের কাছাকাছি এলাকা থেকে আদমজীদের নীল রংয়ের ডাটসান গাড়িটি ছিনতাইয়ে আমিও ছিলাম! তারপর ওই গাড়িতে করে পরের দিন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (শেরাটন হোটেল) গ্রেনেড হামলার আমিও প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনাটি ছিল ৯ জুন ১৯৭১ সালের। তিনি বলেন যে, “যুদ্ধের সময় দেশ এক ছিল। দেশের বিভাজন হয়েছে দেশ স্বাধীনের পর।”

বকুল আপা

বকুল আপার বাড়ি ছিল বাক্ষ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর। তিনি বলেন, আমার বাড়ি এলাকা ছিল পাকিস্তানীদের ঘাঁটি। তিনি জানান যে, যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি খুব সুন্দর করে অল্প কথায় তার ট্রেনিং নিতে ভারতে যাওয়া এবং ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে আসার গল্প বলেন।

তিনি বলেন, “আমরা দুইজন মহিলাসহ মোট ৪০ জনের একটি দল যে বাড়িতে উঠলাম সেটা ছিল রাজাকারদের বাড়ি। ওই বাড়ির একজন বয়স্ক মহিলা আমাদেরকে আশ্বাস দিলেন তিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। বাড়ির কর্তা তখনো বাড়ি ফিরেনি। যখন তার ফেরার সময় হলো ওই বৃদ্ধা ও তার ছেলের বউ আমাদেরকে গোয়াল ঘরে লুকিযে রাখলো। আমাদেরকে খাবার দিল।”

তিনি বলেন, “আমি মনে করি তারাও মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্র নিয়ে যারা যুদ্ধ করেছেন শুধু তারাই মুক্তিযোদ্ধা হবেন তা নয়, এর বাইরেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।”

তিনি জানান যে, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একটি অংশ ছিল বিএলএফ, যারা ছিল রাজনৈতিকভাবে মটিভেটেড। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কি করতে হবে সেবিষয়ে আমাদের কাছে নির্দেশনা ছিল। আমরা এব্যাপারে মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি ভারতে দুই ‍মাসের গেরিলা ট্রেনিংও নিয়েছিলেন।

আগা তসলিম

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেকশন অফিসারের সন্তান আগা তসলিমকে তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। যদিও তার রাজনীতিতে হাতে খড়ি হয়েছে আরো ‍আগেই চিটাগাংয়ে। তিনি চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছেন। পাকিস্তানী হানাদাররা যখন ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশীদের উপর আক্রমণ শুরু করে তখন তিনি ঢাকায় বাবার অসুস্থতার সুবাদে। ২৬ তারিখে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এম্বুলেন্স নিয়ে টিএসসির কাছাকাছি এলাকা থেকে এক গুলিবিদ্ধকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনে ভর্তি করিয়েছিলেন।

৯ ভাই ২ বোনের একজন আগা তসলিম মা হারিয়েছেন ১৯৬৬ সালে। দেশটাকে তিনি ভালোবেসেন মায়ের মতো। ২৯ মার্চ তিনি ভারতের পথে রওয়ানা হয়ে নরসিংদি, চান্দিনা, লাকসাম হয়ে নিজ গ্রাম চৌদ্দগ্রামে পৌঁছেন এপ্রিলের ১ তারিখে। তারপর কিছুদিন এখানেই ছিলেন। এসময়ে তিনি নিজ গ্রামের ছেলেমেয়েদের লেফট-রাইট শিখিয়েছেন। এসময়ে সেখানে তিনি ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল তৈরি করেন।

একসময় তিনিও ভারতে যান। তিনি ছিলেন বিএলএফ। ভারতে গিয়ে তিনি ট্রেনিং নেন। তিনি জানান, ‘৭ দিনে ১০ জনের এক একটি ব্যাচ ট্রেনিং দিয়ে পাস আউট করানো হতো।’

তাদেরকে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ মাইন দেয়া হয়েছিল। এগুলো তারা মাটির নিচে পুতে রাখতো। এতে পা পড়লে সৈন্যরা মারা যেত না। তারা আহত হতো। উদ্দেশ্য ছিল একটি সৈন্য আহত হলে তাকে নিয়ে আরো তিনজন ব্যস্ত থাকবে। আর আহত হবে যে তার মনোবল ভেঙ্গে যাবে। এতে অন্যরাও মনোবল হারাবে।

শুনতে শুনতে মনে হলো মাত্র অল্পদিনে মেধাবী বাঙালিরা কতো যুদ্ধ কৌশলই না শিখেছিল।

শাহজামান মজুমদার, বীর প্রতীক

শাহজামান মজুমদার বীর প্রতীক জানালেন যে, তিনি একটি বই লিখছেন যেটা আগামীবছর ১৬ ডিসেম্বরে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে।

১৯৭০ সালে মেট্রিক পাস করা শাহজাহান মজুমদারের বাবা বিখ্যাত শিকারী হওয়ায় অস্ত্র দেখেছেন ছোট বেলাতেই। থাকতেন মিন্টুরোডে। তাই ২৫ মার্চ রাতের প্রথম গুলিটি যখন ইস্কাটনে হয় তিনি স্পস্ট শুনেছিলেন। সময়টি ছিল রাত ১১টা ১৫ মিনিট।

তিনি বই লিখছেন বলেই হয়তো এখানে অতোটা আর বলেননি। একজন বীর প্রতীকের কাছ থেকে থেকে যতোটা শোনার আগ্রহ ছিল, শুনতে না পেরে কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম। তবে সেই হতাশা কাটিয়ে উঠা গেছে পরের বক্তা মুক্তিযোদ্ধা ইয়াফেস ওসমানের বক্তব্য শুনে।

ইয়াফেস ওসমান

সাহিত্যিক শওকত ওসমানের সন্তান ইয়াফেস ওসমান যুদ্ধ শুরুর সময়টায় বুয়েটের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। তখন ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তিনি গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। যেমন:

  • ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তিতে আর্ট কলেজে ৭ দিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প বলার আসর করেছিলেন। ইচ্ছে ছিল সেই ধারা বজায় রাখার।
  • ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে দেশে ভোগের পর্ব চলেছে।
  • কোন প্রস্তুতি ছাড়াই বঙ্গবন্ধু জাতিকে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিলেন বলে যে কথাটি বলা হয় সেটি ডাহা মিথ্যা।
  • ডেমরাতে আমরা নিয়মিত প্রাকটিস করতে যেতাম।
  • খসরু-মন্টুর নাম আপনারা শুনে থাকবেন, তারা ৭০ সালে টু টু বোর রাইফেল নিয়ে বুয়েটের হলে আসত। গুলি করে রাস্তার লাইট ভাঙ্গতো।

তিনি বলেন, আমার বাসা ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টোদিকে। ২৫ মার্চ আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে যার যার বাড়ির কাছের রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে হবে। আমরা গাছপালা কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেই। আমরা বুঝতে পারছিলাম আজকে একটা কিছু ঘটবে। কিন্তু ঘটনা যখন ঘটলো আমরা হতবাক হয়ে যাই কারণ এতো বড় কিছু ঘটবে সেটা আশা করিনি। কারবালা হয়ে গেল।

তিনি গল্প বলা শেষে প্রশ্ন রাখেন, “আমরা দেশটাকে নিয়ে কি করলাম।” তারপর নিজেই জবাব দেন, “আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে ফিরে যেতে পারি।”

নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে পাওয়ার কথা বলে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।

শেষ কথা!

একটা ভালো লাগার ‍অনুভূতি নিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম, মনে ভাবনা- রাস্তার অসম্ভব ধরনের ভীড় ঠেলে কখন বাড়ি ফিরব আর আমার মেয়েকে গল্পগুলো বলব!!!

(এই লেখাতে ব্যবহৃত নামগুলোর বানান ভুল হলেও হতে পারে। যদি ভুল লিখে থাকি, ক্ষমা চাই। এবং নামের সঠিক বানানগুলো জানানোর অনুরোধ করছি।)

2 thoughts on “১৫ ডিসেম্বর ২০১০: পলাশীর মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আসরে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s