‘দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে লোকে ভাবে যে মৃত্যু হয়েছে’


আমার দুই দশকের লেখালেখির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও সম্ভাবনার কথা ছিল। অনেকদিন ধরে আর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক লেখালেখি করা হয় না। আসলে, এদেশে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের জন্য দায়িত্বশীলদের স্বেচ্ছাচারিতা, ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, আভ্যন্তরীণ কোন্দল ইত্যাদি জনস্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড দেখে দেখে অনেকটা ক্লান্ত হয়েই এসংক্রান্ত লেখা থেকে দূরে সরে গিয়েছি। যদিও প্রায়ই মনটা আনচান করে। লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু লেখা হয়ে উঠে না। গত দুই বছরে একটা দুইটা লেখা লিখেছি। তাও অনেকটা ত্বরিত সিদ্ধান্তে!

অনেকদিন ধরেই ভাবছি, জনজীবন ও বাংলাদেশের উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সম্ভাবনা এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে আবারো লিখব। সরকারি ওয়েবসাইট রিভিউর মতো আরেকটি দীর্ঘকালীন লেখা তৈরি করা যায় কিনা সেই সম্ভাবনা খুঁজতে পল্লব মোহাইমেনের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। ‘নেটিজেন’ নামে পল্লবের সম্পাদিত পাতাটিতে একটি বিভাগ আগে থেকে চালু থাকায় আমার সরকারি ওয়েবসাইট রিভিউ-র বিষয়টি সহজেই মতি ভাই ও সুমি আপার অনুমোদন পেয়েছিল। অবশ্য আজকে একথা বলতে দ্বিধা নেই, সেদিন যদি পল্লব ও প্রথম আলো সরকারি ওয়েব সাইট রিভিউ ছাপাতে রাজি না হতো, আমি অন্য কোথাও এই লেখাটি লিখতাম না। কারণ, আমি যা করতে চেয়েছি তার জন্য নীতি নির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোটা জরুরি ছিল। তত্ত্বাবধায়কের ওই সময়টায় আমার কাছে প্রথম আলোকেই সবচেয়ে উপযুক্ত বাহন মনে হয়েছে।

সরকারি ওয়েবসাইট রিভিউ যে কারণে করতে চেয়েছিলাম, তা সফল হয়েছিল (যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় হয়নি)। আমার লক্ষ্য ছিল, সরকারি ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হোক, জনগণ সরকারি ওয়েবসাইটে কি আছে জানুক ও ব্যবহার করুক এবং সর্বোপরি বাংলাদেশী জনগণের জন্যই যেহেতু সরকারি ওয়েবসাইট সেহেতু এগুলোর বাংলা সংস্করণ বাধ্যতামূলক হোক। আমাকে একদিন মুনির হাসান ভাই ফোন দিয়ে জানালেন, খানিকক্ষণ আগে শেষ হওয়া এক সভায় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন যে সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর বাংলা সংস্করণ থাকতে হবে। তিনি আরো জানালেন, এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত জব্বার ভাই ও মুনির ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মুনির ভাই সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। এই ফোন পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। যাক, আমার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। পল্লবকে জানালাম আমি আর ওয়েবসাইট রিভিউ করবো না।

যা বলছিলাম,  জনজীবন ও বাংলাদেশের উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সম্ভাবনা এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা পল্লবের পাতায় ছাপানো যায় কিনা সেনিয়ে পল্লবের সঙ্গে কথা বললাম। ততোদিনে ওর সম্পাদিত প্রযুক্তি বিষয়ক পাতাটার একটা অংশ বিজ্ঞাপনে ঢাকতে শুরু করেছে। পল্লব জানতে চাইলো, বিষয়টা নিয়ে কিভাবে আগাতে চাই। আমি জানালাম, আমার ইচ্ছে হলো সরকার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে যে কমপিউটার দিয়েছে সেগুলো কি কাজে লাগচ্ছে, সেগুলো স্যাম্পলভিত্তিতে দেখা। আর সেসঙ্গে টেলিসেন্টার আন্দোলনের প্রকৃত চিত্রটিও তুলে আনা। পল্লব আমাকে কখনো কোন কিছুতে না করে না। বললো, পরে জানাবে। সেসঙ্গে ওর পাতার বর্তমান অবস্থার কথাও বলবো। আরো বলল, গ্রামে গঞ্জে যাওয়ার জন্য কোন অর্থকড়ি দিতে পারবে না। কারণ, সেক্ষেত্রে মতি ভাইকে আর রাজী করানো যাবে না।

আমি পল্লবকে মনে করিয়ে দিলাম সরকারি ওয়েবসাইট রিভিউ-র কথা। সরকারি ওয়েবসাইট রিভিউ-র জন্য আমাকে প্রথম আলো প্রতি সংখ্যায় ৫০০ টাকা করে দিতো। পল্লব জানতো ওই টাকাটা আমি একটি জনহিতকর সংস্থায় চাঁদা হিসেবে দিয়ে দিতাম। পত্রিকার সম্মানী বিয়ের আগে প্রেমের সময় আমাকে রিকশা ভাড়া, চাইনিজ খাওয়া, ফুল কেনায় দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। ১৯৯৩ সালের পর পত্রিকার সম্মানীর জন্য নয়, পত্রিকায় লিখেছি আমার দায়িত্ববোধ ‍আর মনের আনন্দে। পল্লবের সেকথা অজানা থাকার নয়। তবুও আমি পল্লবকে মনে করিয়ে দিলাম, আমার দরকার এই ধরনের একটি লেখা বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত একটি দৈনিকে প্রকাশ হওয়া। আমাদের একটা শক্ত প্লাটফর্ম দরকার। আর দরকার এমন একজন বিভাগীয় সম্পাদক যিনি আমাকে ও আমার লেখা চেনেন। আমার লেখা সম্পাদনার আগে আমার সঙ্গে কথা বলবেন। (কারণ, শুনেছি আজকাল নাকি জনকণ্ঠ ও যুগান্তরের কদর ও প্রবেশাধিকার দেশ পরিচালকদের কাছে বেশি, কিন্তু সেখানে পল্লবের মতো আস্থা রাখা যায় এমন কেউ নেই।)। সেসঙ্গে ওকে একথাও বললাম, জনস্বার্থে ও মনের আনন্দের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমে আমার কাজ করতে কখনোই আপত্তি নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত পল্লব আমাকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে বললো।

আজকে ফেসবুকে মুনির হাসান ভাইয়ের একটি মন্তব্যের একটি লাইন (বিটিএন-কে নিয়ে) আমাকে মনে করিয়ে দিল, লিখতে হবে। তিনি বাংলাদেশ টেলিসেন্টার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে লোকে ভাবে যে মৃত্যু হয়েছে।’ আমার মনে হলো, তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক আমার লেখালেখির অনুপস্থিতিটাও এভাবেই মূল্যায়িত হতে পারে!!!

মুনির হাসান ভাইকে ধন্যবাদ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s