প্রভার পর চৈতী: কোন পথে হাটছি আমরা


ইন্টারনেটে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় হলো- সেক্স৷ পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরীহ বলে ধারণা করা হয় যে ধর্মগুরুদের তারাও সেক্স প্রশ্নে তত্পর৷ গুগল সার্চ দিলে তাদের যৌন কেলেঙ্কারির বিস্তর ঘটনা জানা যায়৷ সেখানে খৃষ্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান, হিন্দু কিংবা ইহুদি কেউই বাদ যায় না৷ তবে সেক্স প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে শো বিজ জগতের মানুষজন৷ সেক্সকে ঘিরে শোবিজের লোকজন রীতিমতো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছে, যা পর্ণোগ্রাফি নামে পরিচিত৷ যাকে বাংলায় বলা হয় নীল ছবি৷ আর সেই শিল্পের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ এককভাবে বিশ্বের সর্বোচ্চ৷ যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে৷

ভারত পারলেও বাংলাদেশীরা পারেনি

বাংলাদেশে নীলছবির বাজার ততোটা বড় নয়৷ আবার যে বাজারটা আছে সেটা আমেরিকা কিংবা ইউরোপের মতো প্রকাশ্যও নয়৷ এদেশে নীল ছবি সংক্রান্ত জিনিসপত্র হাতের নাগালে নয়৷ একটা লুকোচুরি ব্যাপার আছে৷ সিনেমার অস্কারের মতোই নীলছবির নায়ক-নায়িকাদের জন্য আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার আছে৷ সেখানে বাংলাদেশী কোন নায়িকার অংশ নেয়ার  কথা আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি৷ বাংলাদেশে নীলছবির নায়িকা বলে কেউ নিজেকে পরিচয় দেয় না৷ গর্ব বোধও করে না৷ কিন্তু আমেরিকা-ইউরোপে অনেক আগে থেকেই এই এই শিল্পের নায়িকারা গর্ব ভরে নিজেদের গল্প করে৷ ইন্টারনেটে তাদের পৃথক ওয়েবসাইট পাওয়া যায়৷ ফেসবুক ও টুইটারেও তারা সক্রিয়৷ এমনকি যখন ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল ফোন  ছিলো না তখনও এডাল্ট পত্রিকার কাভার গার্ল হওয়ার প্রতিযোগিতা পশ্চিমা সমাজে চালু ছিল, যার চাহিদা ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোনের আগমনে কমেনি৷ প্লেবয় পত্রিকার প্রচ্ছদ কিংবা সেন্টারফোল্ডে নিজের ছবি ছাপানোটা এক ধরনের মর্যাদা হিসেবে দেখা হয়৷ প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেউ কেউ এই ধরনের বিশ্বখ্যাত এডাল্ট পত্রিকার প্রচ্ছদ হতে পারলেও কোনো বাংলাদেশী সেটা পেরেছে বলে শোনা যায় না৷ বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত এডাল্ট পত্রিকার ভারতীয় সংস্করণও রয়েছে৷

পিছিয়ে থাকা বাঙালীরা পড়েছে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের খপ্পরে

মিডিয়ার এডাল্ট জগতে পিছিয়ে থাকা বাঙালিদের মু িক্ত দিতেই যেন কেউ কেউ এগিয়ে এলো৷ কিন্তু এরা আমেরিকা-ইউরোপের মতো এডাল্ট শিল্পে অংশগ্রহণ করার জন্য নয়, বরং ব্লাকমেইল করার কৌশল হিসেবে নীলছবিকে বেছে নিল৷ গোপনে ক্যামেরা ব্যবহার করে প্রেমের ফাঁদে আটকিয়ে নগ্ন নারীর ছবি তুলে কিংবা যৌনকর্মের দৃশ্য মোবাইল কিংবা ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে সেটি ছড়িয়ে দিয়ে বা ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে এরা ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করলো৷ কেউ কেউ আবার নিছক ফান করার জন্যও এমনটা করছে৷ আবার কেউ কেউ প্রতিশোধ নেয়ার জন্যও এই ধরনের কাজ করছে৷ গত একদশকে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ডে বাংলাদেশে চেনা ও অচেনা, নামী ও বেনামী অনেকেই বিপদগ্রস্ত হয়েছে৷ তাদের সবার খবর যে মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে তা নয়৷ তবে, মিডিয়াতে সর্বশেষ প্রচারিত খবরটি হলো চৈতি৷ এই সপ্তাহে ইন্টারনেটে চৈতির ভিডিও খোঁজার হিড়িক পড়েছে৷ আলোচনাতেও আছে চৈতি৷ তবে একা নয়, চৈতির সঙ্গে এনামুল করিম নির্ঝর নামটিও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে৷ প্রভার ক্ষেত্রে রাজীবের নামটা ততোটা আলোচনায় ছিল না৷ কারণ রাজীব  নির্ঝরের মতো সমাজে পরিচিত কেউ নয়৷ চৈতি ও নির্ঝরের ভিডিওটি বেশি আলোচিত হচ্ছে একটি প্রশ্নকে ঘিরে৷ এই দুই বিবাহিত কে কাকে বিপদে ফেলতে কিংবা ব্ল্যাকমেইল করতে এই কাজটি করেছে? যেমনটা জানা গিয়েছিল প্রভার বেলায়৷ এনগেজমেন্টের পর বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে অপূর্বকে বিয়ে করায় প্রভার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিল তার প্রেমিকা ও হবু স্বামী রাজীব৷ তাদের সেই যৌনলীলার বিষয়টি প্রচার করে রাজীব প্রভার সংসার ভেঙ্গে দিতে পেরেছে৷ তবে এই লেখার বিষয় সেটি নয়৷ বরং প্রযু িক্তর প্রসারের সঙ্গে নীলছবির বিকাশ এবং আমরা কোনমুখী হচ্ছি বরং সেটিই এই লেখার আলোচ্য বিষয়৷

দুশ্চিন্তা হয় শিশুদের নিয়ে

ইন্টারনেট প্রসারের শুরু থেকেই ইন্টারনেট সার্চের জনপ্রিয় বিষয় পর্ণোগ্রাফি৷ ২০১০ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, আমেরিকাতে প্রতি সেকেন্ডে ২৮২৫৮ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পর্ণোগ্রাফিক বিষয়বস্তু দেখে, ঠিক ওই সময়ে নতুন আরো ৩৭২ জন ব্যবহারকারী সার্চ ইঞ্জিনে এডাল্ট সার্চ দেয়৷ আর আমেরিকাতে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি করে নতুন নীলছবির ভিডিও তৈরি হয় ও সেটি ইন্টারনেটে আপলোড করা হয়৷ ২০০৩ সালে এই ব্যবসার আকার ছিল মাত্র ৫৭ বিলিয়ন ডলার যা বেড়ে ২০০৬ সালে হয়েছে ৯৭ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার৷ বৃদ্ধির মূল কারণ ইন্টারনেটের প্রসার৷ এমনিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও নীলছবির বাজারে মন্দা তৈরি হয়নি৷ ইন্টারনেট ওয়েবসাইটের প্রায় ২০ শতাংশ পর্ণোগ্রাফির ওয়েবসাইট৷ মোট পর্ণোগ্রাফির পাতার সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি৷ পর্ণোগ্রাফিক সাইটগুলো শুধুমাত্র পুরুষ ও ছেলেরাই ঘুরে বেড়ায়, তা কিন্তু নয়৷ আমেরিকাতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মধ্যে একজন নিয়মিতভাবে পর্ণোগ্রাফিক সাইটগুলো ভিজিট করে থাকে৷ এই তথ্যগুলো হয়তো আমাদের কাছে তেমন কোন আবেদন তৈরি করে না৷ কিন্তু আতঙ্কিত হতে হয় যখন পরিসংখ্যানে বলা হয় যে, ইন্টারনেটে প্রথমবারের মতো পর্ণোগ্রাফিক বিষয়বস্তু খুঁ জে বের করে এমন শিশুদের গড় বয়স ১১৷ জানা যায় যে, শিশুরা কমপিউটারে স্কুলের বাড়ির কাজ করতে করতে পর্ণোগ্রাফির সাইটগুলো ভিজিট করে৷ যারা পর্ণো নিয়ে ব্যবসা করে তারা শিশুদেরকে পর্ণোগ্রাফিক সাইটে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের প্রিয় কার্র্টুন চরিত্রগুলোর সঙ্গে সাইট লিঙ্ক জুড়ে দিয়ে থাকে৷

জনপ্রিয় ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ কনটেন্টই হতে পারে সমাধান

আমাদের মতো কম শিক্ষার দেশে ইন্টারনেট প্রযু িক্তর দ্রুত প্রসার কিছুটা হুমকি তো বটেই৷ যেখানেই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পৌঁছাতে পেরেছে সেখানেই ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে৷ এখন নীলছবির জন্য ইন্টারনেটের মতো দরকারি একটা প্রযুক্তি বন্ধ করে দেয়ার কথা আমরা নিশ্চয়ই বলব না৷ কিন্তু এর ক্ষতিকর দিকটি কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে সেনিয়ে আমাদেরকে অবশ্যই কাজ করতে হবে৷

এ প্রসঙ্গে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইন্টারনেটে মজাদার ও দরকারি সেবাগুলোর অনুপ িস্থতি পর্ণোগ্রাফিক সাইটগুলোতে ব্যাপকভাবে ভীড় বাড়িয়েছে৷ ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছিল যে, ইন্টারনেটে কয়েকটি বিষয় সহজলভ্য- পর্ণোগ্রাফি, কমপিউটার ভাইরাস, ড্রাগ নেওয়ার কৌশল আর বোমা বানানোর জ্ঞান৷

প্রায় দেড় দশক আগে উন্নত বিশ্বের প্রেক্ষাপটে যে কথাটি বলা হয়েছিল আমাদের দেশের জন্য আজকে সেই কথাটিই বেশি প্রযোজ্য৷ আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন মাত্র ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শুরু করেছে৷ আমরা যদি তাদের জন্য মাতৃভাষায় ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট কনটেন্ট তৈরি না করতে পারি৷ মজার মজার ওয়েবসাইট বিশেষ করে ইন্টারঅ্যাক্টিভ ওয়েবসাইট তৈরি না করতে পারি তাহলে পশ্চিমাদের মতোই আমাদের শিশুরাও নীল ছবির সাইটগুলোতে ঢুকে পড়বে৷ ওদের সমাজে তো অনেক ধরনের রক্ষা কবচ আছে৷ আমাদের সেগুলো না থাকায় পশ্চিমাদের অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা বেশি বিপদে পড়ব৷ আর এক্ষেত্রে মিডিয়ার ব্যাপক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার৷

Advertisements

4 thoughts on “প্রভার পর চৈতী: কোন পথে হাটছি আমরা

  1. আমার মনে হয় আপনি সুন্দর একটি পয়েন্ট ধরেছেন। বর্তমানে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। ভবিষ্যতে কি হবে তা বলতে পারছি না। পচ্শিমা সংস্কৃতির অনুসরন করতে গিয়ে আমরা আমাদের সম্মান নিজের কাছেই পাব না। এর থেকে আমাদের উটিত বের হয়ে আসা।

  2. ধন্যবাদ এইলেখাটির জন্য । কেবল খোদার ভয় মনে ঢুকলেই মানুষ এ থেকে বিরত থাকে । সরকার আইন করে এসব বন্ধ করতে পারবেনা। কারন এটি মানুষের এক জাতীয় ক্ষুদা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s