পাহাড় আবার অশান্ত হয়ে উঠছে


এক.

“আমার সঙ্গী হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো৷ আমাকে বলল, আপনি যান, আমি আর যাবো না৷ আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি কিভাবে যাবো? আমি কি এসব এলাকা চিনি? এটা তো তোমার কর্ম এলাকা৷ ও তখন বলল, তাইলে আর যাওয়া যাবে না৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? তখন সে বলল, আপনি কি ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না? আমি দেখলাম ওর চোখে মুখে ভয়৷ কিছুক্ষণ থেকেই আমি ঢাকের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম৷ কিন্তু এটার যে কোনো বিশেষত্ব আছে সেটা মনে হয়নি৷ তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ঢাকের শব্দ হচ্ছে তো কি হয়েছে? সে তখন যা বলল, তাতে শিউরে উঠলাম৷ কিছুটা অবাকও হলাম৷ সে বলল, এটা হচ্ছে নরখাদকদের উত্সবের আওয়াজ৷ এখন ওখানে উত্সব হচ্ছে৷ এই উত্সবে গোত্রের বৃদ্ধ নেতাকে উচুঁ জায়গা থেকে ঠেলে ফেলে দেয়া হবে৷ তাতে যদি সে মারা না যায় তাহলে তার মাথায় লাঠি মেরে তাকে মারা হবে৷ এরপর সবাই মিলে তার মাংস খাবে৷ আর এসময়ে বাইরের কেউ এই ঘটনা দেখে ফেললে তাকেও মেরে ফেলা হয়৷ হেলথ ওয়ার্কারের এই কথার সত্যতা যাচাই করার সাহস সেদিন আমার হয়নি৷ শুধু ভাবলাম এসময়েও এই পাবর্ত্য এলাকায় ক্যানিবলিজম গোত্র আছে কি?”- এভাবেই চেঙ্গি নদী পার হয়ে গভীর জঙ্গলে অবস্থিত এক পাড়ায় যাওয়ার পথের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মি. মুস্তাফা ইয়াসীন খান৷ সেসময়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হয়ে রাঙ্গামাটিতে গুটি বসন্ত নির্মূল কর্মসূচিতে কাজ করছিলেন৷ ঘটনাটি ১৯৭৬ সালের৷ আমাকে তিনি এই ঘটনা বলছিলেন ঠিক ২০ বছর পরে ১৯৯৬ সালে৷

দুই.

আমি বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে প্রথম যাই ১৯৯৬ সালে, রাঙ্গামাটিতে৷ আমি তখন ভলান্টারি হেলথ সার্ভিসেস সোসাইটি-ভিএইচএসএস এ কাজ করি৷ আমরা অফিস থেকে একটি দল রাঙ্গামাটি গিয়েছিলাম বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এইচপিএসপি কর্মসূচির স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে জেলা পর্যায়ের কর্মশালা আয়োজনের জন্য৷ ভিএইচএসএস এর প্রশিক্ষণ বিভাগের তত্কালীন প্রধান মি. মুস্তাফা ইয়াসীন খান ছিলেন দলনেতা৷ রাঙ্গামাটিতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম হোটেল সুফিয়াতে৷ পাশের টিনের ঘরটিই ছিল তার পুরনো অফিস ঘর৷ ১৯৭৫ এর নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি রাঙ্গামাটিতে কাজ করেছেন৷ আমরা সেবার রাঙ্গামাটিতে তিন দিন ছিলাম৷ প্রতিদিন সকালে পায়ে হেটে মোটামুটিভাবে রাঙ্গামাটি শহরে চক্কর দিতাম৷ আর ইয়াসীন সাহেব তাঁর দেখা রাঙ্গামাটির পুরনো দিনের গল্প বলতেন৷ কথায় কথায় তিনি বললেন, আমি চাইলে এই রাঙ্গামাটিতে ১০০ একর জায়গা ১০০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে চাষাবাদ করতে পারতাম৷ কিভাবে লিজ নিতে পারতেন? তিনি তখন বললেন, স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও বৃটিশ আমলে প্রবর্তিত ১৯০০ সালের পাবর্ত্য শাসনবিধিতে পাবর্ত্য অঞ্চল পরিচালিত হয়েছে৷ সেই আইনেই এটা সম্ভব ছিল৷ হাটতে হাটতে একদিন আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সেসময়ে পাহাড়ী আর বাঙালীদের সম্পর্ক কেমন ছিল? তিনি হয়তো বুঝেছিলেন যে, আমি পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি৷

সেদিন, সন্ধ্যায় তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন মঞ্জুশ্রী (বেনটেক্সটাইলের মালিক) আপার বাড়িতে৷ সেখানে তাদের কতো কথা৷ পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ৷ সেই আলোচনা থেকে সেদিন জানতে পেরেছিলাম- পাহাড়ী এলাকায় প্রথমে গিয়েছিল কিছু সাহসী পেশাজীবী মানুষ৷ যেমন, নাপিত, কামার, কুমার প্রমুখ৷ সমতল থেকে আসা এই পেশাজীবী মানুষেরা তাদের কর্মদক্ষতা ও ব্যবহার দিয়ে সহজ সরল পাহাড়ীদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিল৷ এরপর একসময় তারা পাহাড়েই বিয়ে শাদি করে এখানে তাদের বংশ বৃদ্ধি ঘটায়৷ পাহাড়ীদের সম্পত্তিতেও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে থাকে৷ একসময় তাদের লোভ বাড়ে৷ এসময়ে তারা পাহাড়ীদের এক্সপ্লয়েট করতে শুরু করে৷ পাহাড়ীদের মধ্যে সমতল থেকে যাওয়া বাঙালীদের বিরুদ্ধে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হলেও ততোদিনে সামাজিক ক্ষমতার বিচারে বাঙালীরা পাহাড়ীদের ছাড়িয়ে গিয়েছে৷ এদিকে একসময় যারা নাপিত, কামার ও কুমার হিসেবে পাহাড়ে গিয়েছিল তারা ততোদিনে নিজ পেশা ছেড়ে বিত্তবান ও বনেদী বাঙালি পরিবারে পরিণত হয়েছে৷ ধর্মীয়ভাবে এরা বেশিরভাগই হিন্দু ছিল৷

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান পাহাড়ীদের বাঙালি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা বাস্তবসম্মত না হওয়ায় পাহাড়ীরা গ্রহণ করেনি৷ বরং পাহাড়ীদের অধিকার আদায়ে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তত্পরতা বেড়ে চলে৷ এই অবস্থায় জিয়াউর রহমান পাহাড়ে বাঙালীর সংখ্যা বাড়াতে কয়েক হাজার বাংলাদেশীকে আর্মির প্রটেকশনে পাহাড়ে নিয়ে যান৷ এরা ছিল শেকড় উপড়ানো সম্পদহীন মানুষ, যাদের নতুন করে হারানোর কিছু নেই৷ এরকম লোকদের বাছাই করার কারণ ছিলা শান্তিবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে সেখানে থাকার মতো সাহস রাখবে৷ ধর্মীয়ভাবে এরা ছিল মূলত মুসলমান৷ এরা আসার পর পাহাড় আরো বেশি অশান্ত হয়ে উঠে৷ রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন আর আলোচনা খুব বেশি আগায়নি৷

পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে শান্তিবাহিনীর নেতা সন্তু লারমা আনুষ্ঠানিকভাবে পাবর্ত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন৷ কিন্তু পাহাড়ে শান্তি কি এসেছে? সাম্প্রতিককালে আবারো পাহাড়ে মানুষ মরছে৷ প্রশ্ন হলো কেন?

তিন.

১৯৯৬ সালের পর আমি শুধু রাঙ্গামাটি নয়, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বহুবার গিয়েছি৷ একা গিয়েছি, সপরিবারে গিয়েছি, অফিসের কাজে গিয়েছি৷ গত ১৫ বছরে দেশের পাবর্ত্য অঞ্চল অনেক বদলে গেছে৷ আমি নিজে অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী৷ একটা পরিবর্তনের কথা বলি৷ ১৯৯৬ সালে পাহাড়ে গিয়ে মি. দীপংকর তালুকদারের স্ত্রীর গ্রীণহিল ছাড়া আর কোনো এনজিও পাইনি৷ আর এখন পাহাড়ে শতাধিক এনজিও কাজ করে৷ বিশ্বের বড় বড় সব দাতা সংস্থাই এখন বাংলাদেশের পাবর্ত্য অঞ্চলে অনুদান দিয়ে থাকে৷ ফেইথ-বেসড সংস্থাগুলোও সেখানে তত্পর৷ এনজিওগুলো পাহাড়ীদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে৷ ভালোর সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ীরা কূট-কৌশলও শিখেছে৷ পাহাড়ীদের এই যে বদলে যাওয়া, এর দায়ভার কি দাতা সংস্থাগুলো এড়াতে পারবে? আমি মনে করি, না৷ আরেকটি কথা, যারা বলেন পাহাড়ে পাহাড়ী আর বাঙালীদের মধ্যে ঘৃণার সম্পর্ক বিরাজমান৷ তারা হয় পাহাড়ে যান না৷ কিংবা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এধরনের কথা বলেন৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s