মৃত্যুদণ্ডকে হত্যা করার আন্দোলন চলছে


আজকের লেখার হেডিংটা একটু বিদঘুটে মনে হচ্ছে, কিন্তু আসলে বিশ্বজুড়ে এমন ঘটনাই ঘটছে৷  সভ্যতার অগ্রগতির সাথে বিবেকবান মানুষ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার বন্ধের দাবীটি  খুবই প্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখছে৷ পাশের দেশ ভারত থেকে শুরু করে আটলান্টিকের ওপারের আমেরিকাতে পর্যন্ত শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আন্দোলন চলছে৷ এই আন্দোলনে যারা বিশেষ ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তার মধ্যে অন্যতম৷ সংস্থাটি প্রতিবছর বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চিত্রটি কেমন তা রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করে৷ সম্প্রতি তাদের সর্বশেষ রিপোর্টটি প্রকাশিত হলো৷ এই রিপোর্টে দেখা যায় যে, ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হলো ৯ম৷ তালিকার ক্রমানুসারে শীর্ষ ১০টি দেশ হলো: চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, ইয়েমেন,  যুক্তরাষ্ট্র, সৌ িদ আরব, লিবিয়া, সিরিয়া, বাংলাদেশ ও সোমালিয়া৷ ২০১০ সালে মোট ২২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে৷

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে৷ যেমন: শিরোচ্ছেদ, বৈদ্যুতিক শক্তিপ্রয়োগে মারা, ফাঁসিতে ঝুলানো,  প্রাণনাশক ইনজেকশন দেয়া কিংবা মাথার পেছনে বা বুকে গুলি করে হত্যা করা৷ কিছু কিছু ঘটনায় প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো ঘটনাও ঘটেছে৷

মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বাড়ছে

৫০ বছর আগে ১৯৬১ সালে বিশ্বের ৯টি দেশ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছিল৷ ১৯৭৭ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ১৬টি দেশ৷ আর এখন বিশ্বের ১৩৯টি দেশ আইন করে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করেছে কিংবা আইনে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান থাকলেও মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে না৷ অর্থাৎ এর চর্চা বন্ধ রেখেছে৷ রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, গতবছর মৃত্যুদণ্ড বিলোপের তালিকায় যুক্ত হয়েছে একটি দেশ, গ্যাবন৷ এদিকে রাষ্ট্রপতির আদেশে মঙ্গোলিয়াতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ রাখা হয়েছে৷ রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমনকি যে দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আছে সেই দেশগুলোতেও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের মানদণ্ড বজায় রাখতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে৷ এই তালিকায় চীন, কেনিয়া, গুয়ানার সঙ্গে বাংলাদেশও আছে৷

মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ বিতর্ক

একটি সাধারণ ধারণা হলো মৃত্যুদণ্ড অপরাধীদের দেওয়া হয়৷ আরো ধারণা করা হয় যে, সেই সকল অপরাধীকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় যাদের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডের আইন অনুযায়ী সিদ্ধ৷ কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, অনেক দেশের সরকার ‘ঝামেলাপূর্ণ’ ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে মৃত্যুদণ্ডের আশ্রয় নেয় এবং জনগণের কাছে প্রচার করে যে তারা অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে৷ এই ধরনের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়াটি যেমন অন্যায্য হয়ে থাকে তেমনি স্বীকারোক্তি আদায়ের ক্ষেত্রে নির্যাতনের আশ্রয় নেওয়া হয়৷ সাধারণত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, দরিদ্র মানুষ, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় ব্যক্তিরা এই ধরনের প্রতিহিংসার শিকার হন৷ অনেকসময় এমনসব কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় যা আইনসিদ্ধ নয়৷ কিন্তু এনিয়ে নানান কারণে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয় না৷ এ ব্যাপারে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠি বলেন, “কয়েকটিদেশে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ, অর্থ-সংক্রান্ত অপরাধ, পরস্পরের সম্মতিতে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যৌনসম্পর্ক এবং ব্ল্যাসফেমি বা ঈশ্বর নিন্দার মতো ঘটনাগুলোতে এখনো শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে, যা শুধুমাত্র গুরুতর অপরাধ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লংঘন৷”

মৃত্যুদণ্ডের আইনের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ

একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার আন্দোলনের অগ্রগতিও হচ্ছে, আরেকদিকে ২০১০ সালে লক্ষ্য করা গিয়েছে “স্বঘোষিত মানবাধিকার রক্ষাকারী” দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইনের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে৷ এই দেশগুলোর মধ্যে উপমহাদেশের তিনটি দেশ-ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশও রয়েছে৷  যদিও, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যেকোনো অপরাধ নির্বিশেষে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে আন্দোলন করছে৷ এব্যাপারে সংস্থার মহাসচিব সলিল শেঠি বলেন, “মৃত্যুদণ্ড হলো নিষ্ঠুর, অমানবিক, অকার্যকর ও অন্যায্য ব্যবস্থা৷” তিনি আরো বলেন, “বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের প্রবণতা সুস্পষ্ট, তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন থেকে এখনো আমরা দূরে রয়েছি৷” তিনি একথা বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, কোন কোন দেশ মৃত্যুদণ্ড বিলোপের বিষয়টি নিয়ে কথা শুনতেও চাচ্ছে না৷

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৯ সালে ৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়৷ ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ১১০৷ য িদও একথাও সত্যি যে, মধ্য নব্বই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ৩০০/৪০০ লোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা তো অনেক কমেছে৷ আর এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র সকল মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলোর অব্যাহতভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে৷ প্রসঙ্গত, একটি তথ্য দেওয়া দরকার যে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু রাজ্যের আইনে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হয়েছে৷ এই তালিকায় ২০১১ সালের মার্চ মাসে যুক্ত হওয়া নতুন রাজ্যটি হলো ইলিয়নস৷

মৃত্যুদণ্ডে  এশিয়া শীর্ষে

এশিয়া মহাদেশে মৃত্যুদণ্ড বেশ ভালোভাবেই কার্যকর রয়েছে৷ তবে, এশিয়ার ১১টি দেশ মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিলেও ২০১০ সালে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি৷ দেশগুলো হলো: আফগানিস্তান, ব্রুনাই দারুসসালাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালদ্বীপ, মায়ানমার, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলংকা এবং থাইল্যান্ড৷ ২০০৯ সালে মৃত্যুদণ্ড না দেয়া এশীয় দেশগুলোর তালিকায় ছিলো আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং পাকিস্তান৷

এ িদকে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনে মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ এখনো রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়৷ তাছাড়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১০ সালে চীন, মালয়েশিয়া, উত্তর কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের পূর্ণ সংখ্যাটি নিশ্চিত করতে পারেনি, তবে একথা জানতে পেরেছে যে, এই দেশগুলোর সব কয়টিতে ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে৷

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার ব্যাপকভাবে রয়েছে৷ এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে৷ কেনিয়াতে ২০০৯ সালে গণমৃত্যুদণ্ডের শা িস্ত হ্রাসের মতো ঘটনা ঘটেছিল৷ দোষী সাব্যস্ত প্রায় ৪,০০০ এরও বেশি বন্দীর মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি সরকার হ্রাস করে তাদেরকে কারাদণ্ড দিয়েছিল৷

চূড়ান্ত বিজয় কবে হবে?

মৃত্যুদণ্ড নামক শাস্তিটি ইতিহাসের পাতায় স্থান নিলেই, এই দণ্ডকে বিলোপের পক্ষে লড়াইকারীদের বিজয় চূড়ান্ত হবে৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো সেটি কবে হবে? ২০১০ সালেও বিশ্বে কমপক্ষে ৫২৭টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা ২০০৯ সালে কার্যকর হওয়া কমপক্ষে ৭১৪টি মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যার চেয়ে কম৷ এটি হয়তো আশাপ্রদ সংবাদ৷ আরেকটি আশার কথা হলো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গতবছর তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড রহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে৷ এই আহ্বানের সপক্ষে আগের তুলনায় অনেক বেশি দেশের জোরালো সমর্থন পাওয়া গিয়েছে৷ আমরা বাংলাদেশের আইন থেকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ঘোষণা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে আশা করতেই পারি৷ এই ধরনের ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আগেই সভ্য দেশের তালিকায় নিজেদের নামটি তুলে নিতে পারে৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s