অভিযুক্ত RAB এবং একটি আকাঙ্খা


এক.

২০৩০ সাল৷ ১১ অক্টোবর৷ নিউইয়র্কের লির্বাটি আইল্যান্ডের স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে পেছনে রেখে তৈরি করা মঞ্চে উপবিষ্ট সাত দেশের প্রতিনিধি৷ ভারত, চীন, জাপান, ইসরাইল, ইরান, রাশিয়া এবং ব্রাজিল৷ তাদের মধ্যের চেয়ারটি শূণ্য৷ তারা যে মূর্তিটি পেছনে রেখে বসেছেন সেই মূর্তিটি ১৮৬৮ সালে ফ্রান্সের জনগণ আমেরিকাকে উপহার দিয়েছিল৷ রোমান মুক্তির দেবী লিবার্টাসের প্রতীক নারী মূর্তি৷ হাতে একটি টর্চ এবং আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার তারিখ লেখা একটি কাগজসদৃশ বস্তু৷ পাঁয়ের শেকল ছেড়া৷ এই স্ট্যাচু বা মূর্তিটিই হলো স্বাধীন আমেরিকার প্রতীক৷

সেটারই পাদদেশে কড়া নিরাপত্তায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত৷  ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ একই সঙ্গে টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে, মোবাইলে লাইভ অনুষ্ঠান সম্প্রচার দেখছে৷ এ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত৷ বাংলাদেশী সময় ঠিক রাত বারোটায় মঞ্চে ধীর পায়ে উঠে এলেন ৩৪ বছর বয়সী এক বাংলাদেশী তরুণী৷ ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থার নর্থ আমেরিকা ব্যুরো চিফ৷ তিনি ঘোষণা করলেন, “আমেরিকার মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি কারোই অজানা নয়৷ এখন আমেরিকার সরকার তাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যদি আগামী ছয়মাসের মধ্যে উন্নতি না করে তাহলে তিনি ভারত, চীন, জাপান, ইসরাইল, ইরান, রাশিয়া এবং ব্রাজিলকে অনুরোধ করবেন আমেরিকার সঙ্গে যেন সকল ধরনের বাণিজ্য বাতিল করে৷ অনুদান বন্ধ করে দেয়৷ তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যেন বন্ধ করে দেয়া হয়৷ এবং জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যপদ বাতিলের জন্য যেন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়৷”

মঞ্চে উপবিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিরা মৃদু করতালি দিয়ে তার সেই প্রস্তাবকে সমর্থন জানালেন৷ সেসময়ে, ঢাকায় বসে টেলিভিশনের পর্দায় এই অনুষ্ঠান দেখতে থাকা বাংলাদেশী মেয়েটির বাবার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা আনন্দাশ্রু৷ ১৯৭১ সারে স্বাধীনতার বিরোধীতাসহ দীর্ঘ ৫৯ বছরের খবরদারির জবাব দিয়েছে আজকে বাংলাদেশ৷ যা তা জবাব নয়৷ সুদে আসলে সবটাই তুলে নেওয়া৷

দুই.

জুল ভার্ণের অনেক কল্প গল্প বাস্তবে পরিণত হয়েছে৷ উপরের এই কল্পকাহিনীটি যে সত্যি হবে না সেকথা এখনই ভাবতে বসে যাবেন না৷ কারণ বিশ্বের অর্থনীতির শক্তির পাল্লাটা ক্রমেই এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে৷ একটি শক্তির নতুন বলয় তৈরি হওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র৷ মার্কিন অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী যদি তাদের স্বার্থ এশিয়াতে খুঁজে পায় তাহলে আমেরিকা কঠিন বিপদে পড়তে বাধ্য৷ এমনিতেই আমেরিকা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি৷ বহু সাম্রাজ্যের পতন পৃথিবী দেখেছে৷ সেসঙ্গে ইতিহাস নতুন শক্তি আবির্ভূত হওয়ারও সাক্ষী৷ তাই কারো বড়াই না করাই ভালো৷ এখন দেখা যাক এই বছরে গত সপ্তাহে ঢাকায় কি হলো৷

তিন.

২০১১ সাল৷ ১০ মে৷ ঢাকার ব্র্যাক ইন সেন্টার৷ নিউইয়র্কভিত্তিক আমেরিকার একটি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ RAB “খুনে বাহিনী” উল্লেখ করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে সরকার RAB এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও সংস্কার করতে না পারলে আমেরিকা, বৃটেন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দাতা দেশগুলোকে অবিলম্বে এই সংস্থাটির জন্য প্রতিশ্রুত সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত্ বলে মন্তব্য করেছে৷ সেসঙ্গে RAB-এ দায়িত্ব পালনকারীদের জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন দেশে শান্তি রক্ষা মিশনে না পাঠানোর ব্যাপারে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আলোচনা করার বিষয়টিও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে৷

চার.

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা৷ নিউইয়র্কে এর প্রধান কার্যালয়৷ শাখা অফিস আছে বার্লিন, বৈরুত, ব্রাসলেস, শিকাগো, জেনেভা, জোহার্নসবার্গ, লন্ডন, লস এঞ্জেলস, মস্কো, প্যারিস, সান ফ্রান্সিসকো, টোকিও, টরেন্টো এবং ওয়াশিংটন৷ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৮ সালে৷ প্রথমে নাম ছিল হেলসিংকি ওয়াচ৷ সেসময়ে আমেরিকার সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল৷ মূলত, হেলসিংকি চুক্তি বাস্তবায়নে সোভিয়েত ইউনিয়ন যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে কিনা সেটি তদারকি করার জন্যই হেলসিংকি ওয়াচের প্রতিষ্ঠা৷ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনে সংস্থাটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল৷

১৯৮৮ সালে হেলসিংকি ওয়াচের নতুন নামকরণ করা হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ৷ বর্তমানে সংস্থাটিতে ২৭৫ জনেরও বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করছে এবং বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে৷ জার্মান বংশোদ্ভুত কেনেথ রথ ১৯৯৩ সাল থেকে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন৷ তিনি মূলত ১৯৩৮ সালে তার বাবা কিভাবে হিটলারের নাত্সি বাহিনীর হাত থেকে পালিয়েছিলেন সেই কাহিনী শোনার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার বিষয়ে হাতে খড়ি নেন৷ পরবর্তীতে ইয়েল ল স্কুল থেকে গ্রাজুয়েট কেনেথ রথ ১৯৯৩ সালে আরেক জার্মান বংশোদ্ভূত আরেহ নেইয়ার (Aryeh Neier) এর স্থলাভিষিক্ত হন।

আরেহ নেইয়ার ১৯৯৩ সালে জর্জ সোরেসের ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্টের পদে চলে গেলে কেনেথ রথ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রধানের দায়িত্ব নেন৷ এই সংস্থার বতর্মানে সবচেয়ে বড় দাতা হলো জর্জ সোরেস প্রতিষ্ঠিত ওপেন সোসাইটি ইন্সটিউট৷ ২০১০ সালে জর্জ সোরেস সংস্থাটিকে আগামী দশ বছরে মোট ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন৷ এই ঘোষণায় তিনি বলেন যে, “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হলো তার দেখা সবচেয়ে কার্যকর সংস্থাগুলোর একটি৷ এবং ওপেন সোসাইটি তৈরির ক্ষেত্রে এই সংস্থার কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷” হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যদিও দাবী করে যে, তারা ব্যক্তিগত ও ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে চলে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তারা ইতোপূর্বে ডাচ সরকার ও সৌদী আরব সরকারের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে৷ তবে জর্জ সোরেসের অর্থায়ন এখন সংস্থাটিকে অনেকটাই শক্ত ভিতের উপর দাড় করিয়ে দিয়েছে৷

পাঁচ.

এই জর্জ সোরস সম্পর্কে একটু জেনে রাখা দরকার৷ জর্জ সোরেস ওপেন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান৷ তার জন্ম হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ১৯৩০ সালে৷ লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সের ছাত্র জর্জ সোরসের প্রিয় বিষয় কারেন্সি কেনাবেচা ও বিনিয়োগ৷ তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে নেপথ্যে কাজ করে থাকেন৷ বাংলাদেশের শেয়ার বাজারেও তার অদৃশ্য উপস্থিতির কথা অনেকে বলে থাকেন৷ স্যার কার্ল পপার হলেন তার দার্শনিক গুরু, যিনি ওপেন সোসাইটি ধারণার প্রবর্তক৷ তার লেখা একটি বিখ্যাত বই হলো ‘দি ওপেন সোসাইটি এন্ড ইট’স এনিমিজ’, যা থেকেই ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউটের নামকরণ৷ ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে তিনি প্লেটো, হেগেল ও মাকর্স তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন৷

স্যার কার্ল পপারের ভক্ত জর্জ সোরেস ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোতে ওপেন সোসাইটি বা একটি মুক্ত সমাজ তৈরি করার উদ্দেশ্যে কাজ করার জন্য সোরস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন৷ বাংলাদেশেও ওপেন সোসাইটি ইন্সটিটিউটের কর্মকান্ড রয়েছে৷ সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকারের নানান বিষয় নিয়ে সংস্থাটি বাংলাদেশীদের ফেলোশিপ দেওয়াসহ এই দেশে বিভিন্ন ধরনের কর্মকান্ড পরিচালনা করছে৷ সম্প্রতি তাদের অর্থায়নে পরিচালিত একটি সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে RAB-এর কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছে৷ RAB-এর বিরুদ্ধে অভিযোগটি হলো বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের৷

ছয়.

বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড হলো কোন ধরনের আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়াই সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হত্যাকান্ড৷ ন্যায্যবিচারবিহীন হত্যা অবশ্যই পরিত্যজ্য হওয়া উচিত্৷ কোন স্বাভাবিক চিন্তার মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডকে সমর্থন করতে পারে না৷ কিন্তু শাসক শ্রেণী তাদের বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করতে কিংবা ভয় দেখাতে এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড শত শত বছর ধরে চালু রেখেছে৷ গত একশ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভিয়েতনাম কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোতে এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা দেখতে পাব৷ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গতবছর পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় ১৬০০ এরও বেশি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের কথা বিভিন্ন গবেষণাগুলোতে উঠে এসেছে৷ আমেরিকা, ইসরাইল, ফিলিপাইন, ইরান, ইরাক, চীন কোথায় হয়নি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড৷ আমেরিকা নিজ দেশে তো বটেই অন্যদেশে গিয়েও বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড পরিচালনা করেছে৷ পৃথিবীতে যে ৫৮টি দেশ এখনো মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে আমেরিকা সেই দেশগুলোর একটি৷ সেই আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান যখন আমাদেরকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কথা বলে৷ হুমকি দেয় তখন শুনতে ভালো লাগে না৷ তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে এই ধরনের সুযোগ যারা করে দিচ্ছে তাদের মন মানসিকতা দেখে৷ তারা যে আমাদের মতো আমজনতার আবেগ আর মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না সেকথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আমরা কি আশা করতে পারি না এই দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো আরো বেশি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হবেন৷ তারা যেকোনো ধরনের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় নিজেদের উদ্যোগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন৷ RAB যেমন ভালো কাজ করছে৷ তেমনি RAB-এর কাজের মধ্যে ত্রুটিও রয়েছে৷ সেগুলো স্বীকার করে নিয়ে সংশোধনে যথাযথ পদক্ষেপ সরকারের দিক থেকেই নেওয়া উচিত্৷ দায়িত্বশীলদের আচরণে এই অবহেলা থেকে যাতে এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি না হয় যা আমেরিকার মতো মানবতার গুরুতর লংঘনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে আমাদের মানবাধিকার শেখার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে৷ স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে একটি আত্মমর্যাদসম্পন্ন জাতি হিসেবে আমাদের নিজেদের পরিচয় দিতে পারা উচিত্৷ আর সেই পরিচয় পেতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন দরকার তেমনি দরকার একটি মানবতাবোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে দেশটিকে গড়ে তোলা৷ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবিক হওয়া৷ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং যেকোনো পরিস্থিততে ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠা করা৷ বিচারবহির্ভূত যেকোন কর্মকান্ড থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরত রাখা৷ সত্যকে মেনে নিয়ে মিথ্যাকে সংশোধন করা৷

(রাইট টার্ন, মোহাম্মদ গোলাম নবী, পৃষ্ঠা ৩১-৩২, সাপ্তাহিক বিপরীত স্রোত, বর্ষ ১, সংখ্যা ৯, মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০০১, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮)

Advertisements

3 thoughts on “অভিযুক্ত RAB এবং একটি আকাঙ্খা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s