প্রকৌশলী ইয়াদুলের বেঁচে থাকার লড়াই বনাম সরকারি অপচয়


দরকারের সময় হাতের কাছে কোন তথ্য পাইনা। এই যেমন ধরুন, ৩০০ জন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ট্যাক্স ফ্রি গাড়ির জন্য সরকারি ব্যয় কতো? কিংবা একদিনের সংসদ অধিবেশনে কতো খরচ হয়?

এই তথ্য দরকার কেন জানেন? একজন প্রকৌশলী মি. ইয়াদুল ইসলামের কেমোথেরাপি ও অপারেশনের জন্য দরকার মাত্র ১৮ লাখ টাকা। প্রকৌশলী ইয়াদুল ইসলাম সম্পর্কে ব্লগ ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে যতোটুকু জেনেছি তাতে মি. ইয়াদুলের বেঁচে থাকা দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই দেশের সংসদ সদস্যরা যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, মারামারি, অন্যের সম্পদ লুটপাট, সরকারি সম্পদের অপচয়, অন্য দেশে গিয়ে নিজ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করাসহ দেশ ও সমাজের জন্য নানাবিধ ক্ষতিকর কাজ করার পরও সরকারি কোষাগার থেকে ভর্তুকি পাচ্ছেন, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আনতে পারছেন সেখানে প্রকৌশলী মি. ইয়াদুল দেশের বিপুল সমুদ্রসম্পদ রক্ষার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

তিনিই প্রথম ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর চট্টগ্রামে আয়োজিত দি প্রবলেম অফ ডিলিমিটেশন অফ বাংলাদেশ মেরিটাইম বাউন্ডারিস উইথ ইন্ডিয়া অ্যান্ড মায়ানমার শীর্ষক এক সেমিনারে তার গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানান যে, ‘১৯৮২ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দলিলের ৭৪ ও ৮৩ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ইকুইটেবল পদ্ধতি অবলম্বনের কথা উল্লেখ থাকলেও ভারত ও মায়ানমার বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকা দখলের চেষ্টা ইকুইডিসটেন্স পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করছে। ফলে, ইকুইটেবল পদ্ধতিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকার আয়তন ২ লক্ষ ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভারত ও মায়ানমারের বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকা দখলের চেষ্টার বাস্তবায়নস্বরূপ ইকুইডিসটেন্স পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রায় এক লক্ষ ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা ওই দুটি রাষ্ট্রের দখলে চলে যাবে, যা বাংলাদেশের মোট সমুদ্র এলাকার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ।’

সমুদ্র চলে যাওয়া মানে কিছু পানি চলে যাওয়া নয়। সমুদ্র চলে যাওয়া মানে সমুদ্রের অতলে থাকা উত্তোলনের অপেক্ষায় থাকা গ্যাস, তেলসহ আরো অনেক প্রাকৃতক সম্পদ। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের সাথে উদ্ভূত সমস্যায় বাংলাদেশসহ এই তিনটি দেশকে সমুদ্র এলাকায় অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি উপস্থাপনের জন্য ২০১১ সালের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে জাতিসংঘ। এই লড়াইয়ে আমাদের জেতা খুব দরকার। আর এজন্য আমাদের দরকার সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইয়াদুল ইসলামকে। তিনি যেখানে দেশের জন্য লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে নিজের মেধা ও পরিশ্রম ঢেলে দিয়েছেন সেখানে মাত্র ১৮ লাখ টাকা তার জন্য সরকার দ্রুত বরাদ্দ করতে পারছে না। অবাক লাগে।

সংসদ অধিবেশন চলছে। সংসদে মৃত মানুষদের নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু দেশের সম্পদ রক্ষায় যে মানুষটা লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে তার জন্য সংসদে কেউ কথা বলে না। আমি মনে করি এই ধরনের মানুষদের সকল দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে এলক্ষ্যে পৃথক আইন করা উচিত। যারা দেশের বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন তাদেরকে ভিআইপির মর্যাদা শুধু নয় তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে করে তারা নির্বিঘ্নে দেশের জন্য কাজ করতে পারেন। অসুস্থতার সময় তাকে যেনো একটি কানাকড়ির জন্যও চিন্তা না করতে হয়। যতো টাকা লাগুক সব যেনো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হয়। প্রয়োজনে আইন করে প্রতিবছর বাজেটে মেধাবী ও দেশের জন্য প্রয়োজনীয় মানুষদের কথা ভেবে পৃথক বরাদ্দ রাখতে হবে।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি জীবন মূল্যবান। কিন্তু যারা নিজ দায়িত্বে দেশের সেবা করার জন্য সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন তাদের জীবন একটু বেশিই মূল্যবান। কেন? কারণ, এরকম আরেকটি মানুষ দ্রুত তৈরি হয় না। এরকম মানুষ তৈরি হওয়ার জন্য সময় দরকার।

সমুদ্র সম্পদ রক্ষা করা আমাদের জন্য এখন একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরেকজন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ ইয়াদুল কবে তৈরি হবেন সেজন্য আমাদের বসে থাকার সুযোগ নেই। যিনি আছেন তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

মি. ইয়াদুলের এক বন্ধু সচলায়তন নামের ব্লগে লিখেছেন, ‘ভারত ও মায়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে গোলমাল চলছে তা সমাধান করার জন্য বাংলাদেশের হয়ে যারা কাজ করবে তাদের মধ্যে ইয়াদুল অন্যতম। গর্বে বুকটা ফুলে উঠল।’  তিনি আরো লিখেছেন যে, ‘আমার বন্ধু ইয়াদুল এখন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হসপিটালে শুয়ে আছে। আমাদের মহামুল্যবান সমুদ্রসম্পদ মেধা আর দক্ষতা দিয়ে রক্ষা করার জন্য সে যখন প্রস্তুত তখন সে লড়াই করছে জীবনের সাথে। ক্যান্সারের সাথে।’

মি. ইয়াদুল লেখাপড়া করেছেন বুয়েটে। পড়েছেন পাবনা ক্যাডেট কলেজে। লেখাপড়া শেষে যোগদান করেছেন বাংলাদেশ নেভীতে। তিনি বাংলাদেশ নেভীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। কমান্ডার। দেশে বিদেশে তাঁর অনেক বন্ধু বান্ধব আছে। তাঁদের মিলিত চেষ্টায় মাত্র ১৮ লাখ টাকা উঠে যাবে নিশ্চয়ই। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যাবে, প্রকৌশলী ইয়াদুলদের মতো মানুষদের পাশে রাষ্ট্র কখন দাঁড়াবে? জনপ্রতিনিধিরা কবে বুঝতে শিখবে, তাঁরা নন দেশের জন্য বেশি দরকার প্রকৌশলী ইয়াদুলের মতো মানুষেরা।

Advertisements

2 thoughts on “প্রকৌশলী ইয়াদুলের বেঁচে থাকার লড়াই বনাম সরকারি অপচয়

  1. অনেক ধন্যবাদ। ইয়াদুল আমার সহপাঠী বন্ধু। আমাদের ব্যাচের বন্ধুরা মার্কিন দেশ থেকে ওর সাহায্যের জন্য চেষ্টা করছে যথাসাধ্য। অথচ এই ছেলেটার জন্য রাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ানো উচিত। ছোট কারেকশন- ইয়াদুল বুয়েটে নেভি থেকেই পড়তে এসেছিল, বুয়েট শেষ করে নেভিতে যায় নি। বোর্ডে স্ট্যান্ড করে সে নেভিকেই প্রথম বেছে নিয়েছিল…সেই অল্প বয়েসেই সে দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিল।

  2. apni khub sundor likhcen. kintu seikh hasina kokhono tar pase darabe na. karon tini bece thakle india er sartho nosto hobe. hasina kokhono ta can na. deske sukousole ki vabe india er hate tule dibe etai tar procesta. ei dhoroner despremik bece thaka tar jonno somossa.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s