মৃত্যুর ভাগ্য নাকি অন্য কিছু


২৮ মে৷ নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস৷ এই দিনটিতে আমি সবসময় কিছুটা স্মৃতিকাতর হই৷ প্রায় সাড়ে ৪ বছর মাতৃমৃত্যু হ্রাসের জন্য বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে জনসচেতনতার কাজ করতে গিয়ে আমার সবসময় মনে হয়েছে মৃত্যুটা কি আসলেই ভাগ্য? নাকি অন্য কিছু? ভাগ্যই যদি হবে সেটা কি শুধু মেয়েদের জন্যই নির্ধারিত?

বানরীপাড়ার করপাড়া গ্রামের পরিবানুর ৪র্থ সন্তানের জন্ম হয় নৌকাতে৷ হাসপাতালে নেওয়ার পথে৷ কিন্তু সন্তান জন্মের পর শুরু হওয়া রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না৷ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর ডাক্তাররা বরিশাল মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলেন৷ টেম্পুতে করে গুঠিয়া পর্যন্ত আসার পর পরিবানু মারা যায়৷ তার সদ্যজাত সন্তানটি মারা যায় পরেরদিন৷

কাহিনীর সমাপ্তি৷ খুবই সাধারণ একটি ঘটনা৷ গ্রামদেশে এমন কাহিনী অহরহ শোনা যায়৷ কিন্তু কাহিনীর আগের অংশটি জানলে, কাহিনীটি এখানে শেষ করা যাবে না৷

৩০ বছর বয়সে পরিবানু ৪র্থ বারের মতো গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত চেকআপ করিয়েছে৷ টিটি টিকা নিয়েছে৷ গর্ভের সাত মাসের সময় তার হাতে পায়ে পানি আসে৷ এসময়ে সে সাবধানে চলাফেরা করতো৷ গর্ভের শেষ দিকে তার শরীর খুব খারাপ হলে তাকে বানারীপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়৷ ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে স্যালাইন দেন৷ তখন তার বমিও হয়েছিল৷ কিন্তু তখনও ডেলিভারি হওয়ার ইডিডি বা প্রত্যাশিত তারিখ আসেনি৷ কিছুটা সুস্থ হলে ডাক্তার তাকে রিলিজ করে দেয়৷ সে বাড়িতে চলে আসে৷ পরেরদিন সকালেই তার প্রসব ব্যথা উঠে৷ কিন্তু নৌকা ঠিক করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়৷ তারপরের ঘটনা তো আগেই বলেছি৷

ঘটনার বর্ণনাকারী পরিবানুর শাশুড়ি খাদিজা বেগম বউয়ের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেন না৷ অনেক প্রশ্নই তার মনে৷ তিনি আফসোস করেন, আহা হাসপাতাল থেকে যদি পরিবানুকে আগের দিন রিলিজ না করা হতো তাহলে হয়তো তাকে বাচানো যেতো৷ প্রশ্নটা হলো দোষটা ডাক্তারদের নাকি পরিবানুর সঙ্গে আসা গরিব মানুষগুলোর যারা আরো কয়েকটা দিন হাসপাতালে থাকার ঝামেলা ও খরচ বাচাতে চেয়েছিলেন৷ নাকি পরিবানুর ভাগ্যের?

একইভাবে কি ভাগ্যের দোষ দেওয়া যাবে উদয়কাঠি ইউনিয়নের লবণসারা গ্রামের পুতুল রানীর বেলায়? বিয়ের সময় পুতুল রানীর বয়স মাত্র ১৪ বছর৷ বিয়ের পরপর শুরু হয় তার গর্ভবতী হওয়ার পালা৷ পাঁচ পাঁচবার গর্ভবতী হয় কিশোরী মেয়েটি৷ কিন্তু প্রতিবারই গর্ভপাত হয়ে যায়৷ ছয় বারের বার আর গর্ভপাত হয় না৷ পরিবারের সকলে খুশি৷ এদিকে গর্ভের প্রথম অবস্থা থেকে তার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা ও শ্বাস কষ্ট থাকে৷ কিন্তু মেয়েটিকে  ডাক্তার দেখাতে হবে সেকথা কারো মাথাতেই আসে না৷ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী একদিন অনেকটা জোর করেই পুতুলকে কাছের এক এনজিওতে কর্মরত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়৷ ডাক্তার তার গর্ভের ইতিহাস শুনে পুতুলকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়৷ সেকথায় কান দেয়নি পুতুলের শ্বশুর বাড়ির লোকজন৷ একসময় পুতুল এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে ১৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে৷ তার শাশুড়ি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কেঁদে কেটে অস্থির৷ কিন্তু এখন আর কান্না করে কি লাভ?

পুতুলের মতো মেয়েদের বাল্য বিবাহ, অকালে সন্তান ধারণ ও কিশোরী মায়ের মৃত্যু তো এদেশে সাধারণ চিত্র৷ পাবনার ভাঙ্গুরার খানমরিচ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের মমতাজের কথাই ধরুন৷ বিয়ের সময় তার বয়স ১২ আর স্বামীর বয়স ১৫ বছর৷ মমতাজের শ্বশুর আবদুস সাত্তার বলছিলেন, বিয়ের কিছুদিন পরেই মমতাজ গর্ভধারণ করে৷ গর্ভের ৮ মাসের সময় মমতাজের হাত-পায়ে পানি আসলে একজন গ্রাম ডাক্তারকে দিয়ে চিকিত্সা করানো হয়৷ এরপর প্রসব ব্যথা উঠলে সেই গ্রাম ডাক্তার এসে ইনজেকশন দেয়৷ এক পর্যায়ে যন্ত্রণায় কাতর মমতাজ মরা বাচ্চা প্রসব করে৷ মৃত সন্তান প্রসবের পর মমতাজ কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ে৷ তার হাত-পা আরো ফুলে ওঠে৷ গ্রাম ডাক্তার স্যালাইন দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়৷ প্রসবের ১ দিন পর মমতাজ ভীষণ কষ্ট পেয়ে মারা যায়৷ মমতাজের মৃত্যুও কি তার ভাগ্যের ফল?

কেউ যদি বলেন, তাকে কি প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দেওয়া হয়েছিল? পরিবার বলবে, ডাক্তার তো ডেকেছিলাম৷ যদি বলেন এটা বাল্যবিবাহের কুফল? গ্রামের মুরুব্বিরা বলবেন, তাদের সময় এই কুফল কোথায় ছিলো৷ তারাও তো ওই বয়সী মেয়েদেরকেই বিয়ে করেছেন তাতে তো কোন অসুবিধা হয়নি৷ এরকম যুক্তিতে আপনি কাবু না হলে আপনাকে বলা হবে ঠিক বয়সে বিয়ে হলে কি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মানুষ মরে না?

উত্তর হলো অবশ্যই মরে৷ যেমনটা মরেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়ি ইউনিয়নের কৈবত্যপাড়া গ্রামের পাবর্তী রাণী৷ পাবর্তীর বিয়ে হয়েছে ২০ বছর বয়সে৷ বিয়ের পর তার পরপর তিনটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়৷ তারপরও সে চতুর্থ বারের মতো গর্ভবতী হয়৷ নয় মাসের গর্ভকালীন সময়ে তার খুব অস্থির লাগতো এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হতো৷ প্রসবের ২/৩ দিন আগে থেকে তার এই সমস্যা আরো বেড়ে যায়৷ পার্বতীর প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলে তার স্বামী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে স্ত্রী রাজী হয়নি বলেছে, আগের সন্তানরা তো বাড়িতেই হয়েছে৷ তখন পাশের বাড়ির এক অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাই ডেকে নিয়ে আসা হয়৷ সকাল ৬টার সময় বাড়িতে পার্বতী একটি মৃত পুত্র সন্তান প্রসব করে কিন্তু তার গর্ভফুল পড়ে না৷ তার স্বামী বলে চলেন, তবুও পার্বতী হাসপাতালে যেতে রাজি হয় না৷ এভাবে ৫/৬ ঘন্টা সময় চলে যায়৷ পার্বতী অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ হাসপাতালে আসার পর স্যালাইন ও ইনজেকশন দেয়ার সাথে সাথেই পার্বতী মারা যায়৷ তার স্বামী জিতেন্দ্র চন্দ্রের দেয়া বর্ণনার মধ্যে কোথায় যেন ফাঁক রয়েছে, কিন্তু সেই ফাঁক খোঁজার সময় আমার কই?

আমি বরং আপনাদের খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের রানাই গ্রামের জাহানারা বেগমের মৃত্যুর ঘটনাটি বলি৷ তিনটি কন্যা সন্তানের পর পুত্র সন্তানের আশায় চতুর্থ বারের মতো গর্ভবতী হয়েছিল জাহানারা বেগম৷ একদিন তার সেই সন্তানটি জন্ম নিলো৷ কিন্তু এবারও মেয়ে৷ পরিবারে সবাই যখন মেয়ে হওয়ার শোকে কাতর৷ তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে জাহানারা৷ একজন গ্রাম ডাক্তারকে ডাকা হলেও সে কিছুই করতে পারেনি৷ তবে, শেষ পর্যন্ত সে রোগীকে ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে বলে৷ সেখানকার ডাক্তাররা বলেন, দেরি হয়ে গেছে, এখনই খুলনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে৷ খুলনায় নেয়ার আগে জাহানারার স্বামী তাকে একটি স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যান৷ কিন্তু সেখানে চিকিত্সার খরচ বেশি হওয়ায় অবশেষে জাহানারাকে খুলনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি৷ এভাবেই ভাগ্যের হাতে আরেকটি প্রাণ সপে দেওয়া হয় এই বাংলাদেশে৷

(সাপ্তাহিক বিপরীত স্রোত, রাইট টার্ন, মোহাম্মদ গোলাম নবী, বর্ষ ১, সংখ্যা ১১, ৩১ মে ২০১১ তারিখে প্রকাশিত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s