ই-বুক কতোটা কাজের


(বিদ্যালয়ের পাঠ্য বই এভাবে ওয়েবসাইটে রাখার মানেটা আমি বুঝতে পারিনি। আমার কাছে এটা জনগণের অর্থ কতিপয় লোককে দিয়ে দেওয়ার একটি নমুনা মনে হয়েছে। জনগণ কবে শুধু ভোট দেওয়া ছাড়াও তাদের অর্থ ব্যয় নিয়ে সরকারকে জবাবদিহিতা করতে পারবে? জানি না। এটা হওয়া দরকার। )

‘শিখব যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময়’ স্লোগান নিয়ে ‘ই-বুক জগতে স্বাগতম’ জানাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তৈরি করা ডিজিটাল বইয়ের ওয়েবসাইট http://www.ebook.gov.bd। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৩টি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭২টি বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ রয়েছে।

কোনো ধরনের নিবন্ধন বা অর্থ ছাড়াই সাইটে রাখা বই পড়া কিংবা কম্পিউটারে নামানো (ডাউনলোড) যায়। প্রথম পাতায় ‘সহায়তা’, ‘ই-বুক সম্পর্কে’ ও ‘আর্কাইভ’ নামে তিনটি বোতাম পাবেন। ‘ই-বুক সম্পর্কে’র মধ্যে আশা করা হয়েছে, ব্যবহারকারীরা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ই-বুক রিডার, মোবাইল ফোন (ফ্ল্যাশ সমর্থিত) ও স্পর্শকাতর পর্দার (টাচস্ক্রিন) ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহার করে বইগুলো পড়বে। এই সাইটে আশানুরূপ ব্যবহারকারী বা ভিজিটর নেই। প্রথম পাতার নিচে থাকা ভিজিটর কাউন্টারে আমি ছিলাম ৪১ হাজার ৯৮০ নম্বর ভিজিটর। তবে পাতাটি রিফ্রেশ করলে ব্যবহারকারী সংখ্যাও বদলে যায়। তার মানে, প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখান থেকে জানার উপায় নেই। তবে এ কথা বলা যায়, নগণ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী সাইটটিতে গেছে।

এ বছর বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া প্রায় তিন কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকার বিনামূল্যে প্রায় ২৩ কোটি বই বিতরণ করেছে। ওয়েবসাইটটি সম্পর্কে প্রচার না হওয়াটাই এর অন্যতম কারণ হতে পারে। ওয়েবসাইটটি সম্পর্কে বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে জানিয়ে দেওয়া দরকার। আরেকটি বিষয় হলো, গুগল থেকে এই ওয়েবসাইটটি খুঁজে পাওয়া বেশ দুঃসাধ্য। ‘ই-বুক’ লিখে পাইনি। ‘ই-টেক্সটবুক’ লিখে পাইনি। তারপর এনসিটিবি লিখে খুঁজে পেয়ে দেখলাম, ওয়েবসাইট ডাউন। সবশেষে এটুআই প্রকল্পের সূত্র ধরে খুঁজে নিলাম।

‘সহায়তা’ বোতাম চেপে জানা গেল, এই ওয়েবসাইটটি ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে ‘অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ প্লেয়ার’ ও ‘উইনরার’ নামক সফটওয়্যার থাকতে হবে। এখানে এই সফটওয়্যারগুলো নামানোর ওয়েব ঠিকানা দেওয়া আছে। কেউ যদি বাংলা দেখতে না পান, তবে নিকস নামের ফন্ট নামাতে হবে। সেটিও এখানে দেওয়া আছে। আর ‘আর্কাইভ’ বোতাম চেপে দেখি, একটি বইয়ের তাকের ওপরের খোপে ‘নির্মাণাধীন’ লেখা রয়েছে।

তাহলে বই পড়ার জন্য কী করবেন? মূল পাতার নিচে প্রতিটি শ্রেণীর জন্য পৃথক বোতাম রয়েছে। আপনি যে শ্রেণীর বই পড়তে চান, সেই বোতাম চাপুন। যেমন—প্রথম শ্রেণী লেখা বোতামে চাপার পর একটি নতুন পাতা পাওয়া গেল। সেখানে বইয়ের তাকে তিনটি বই পেলাম—আমার বাংলা বই, ইংলিশ ফর টুডে ও প্রাথমিক গণিত। প্রতিটি বইয়ের ওপরে ইংরেজিতে ‘ওপেন’ ও ‘ডাউনলোড’ লেখা রয়েছে। ‘ওপেন’ বোতাম চেপে আপনি বইটি মনিটরে খুলে পড়তে পারবেন। বইয়ের লেখাগুলো অনেক ঝকঝকে ও তকতকে। পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু সমস্যাটি অন্যখানে। সেটি হলো পৃষ্ঠা খোলার ব্যাপারে। ধরা যাক, আপনি বইটির ৭০ নম্বর পৃষ্ঠাটি পড়বেন। এটি করার জন্য আপনাকে ৭০ বার মাউস ক্লিক করতে হবে। সূচি ধরে নির্দিষ্ট অধ্যায়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই অসুবিধাটি একজন শিক্ষার্থীকে বই পড়ায় নিরুৎসাহিত করতে যথেষ্ট। আরেকটি বড় ধরনের অসুবিধা হলো লেখা বড় আকারে (জুম) দেখা নিয়ে। পাশাপাশি দুটি পৃষ্ঠা খোলা অবস্থায় আপনি নিচের জুম বোতাম চাপলে বাঁ দিকের পাতাটি বড় হবে। ডান দিকের পাতাটি জুম করতে হলে আপনাকে ওই পাতার ওপর ক্লিক করতে হবে। ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে এ ধরনের খুঁটিনাটি বিষয় ‘সহায়তা’ বোতামে বলে দেওয়া দরকার ছিল।

যদিও ৫১২ কেবিপিএস ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট লাইনে পাতাগুলো আসতে বেশ সময় নিচ্ছিল। মোবাইল ফোন সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট লাইন ব্যবহার করে পড়তে গিয়ে দেখি, সময় আরও বেশি লাগছে। ঢাকার বাইরের ছেলেমেয়েরা এই পরিমাণ ধৈর্য নিয়ে কম্পিউটারে পড়বে বলে মনে হয় না; বরং তারা নামিয়ে নেবে। এতে সময় অনেক কম লাগে। ৪.৬ মেগাবাইটের প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইটি ৭০ সেকেন্ডে ডাউনলোড করতে পেরেছি। তবে কিছু কিছু বইয়ের ফাইলের আকার ৬০ মেগাবাইট কিংবা তারও বেশি। যেমন: নবম শ্রেণীর সমাজবিজ্ঞান বই। এগুলো ডাউনলোডের চিন্তা করাটাই সাহসের ব্যাপার।

ওয়েবসাইট সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম কয়েকজনের কাছে। তাঁদের একজন জবাব দিয়েছেন এভাবে: ‘আমি নিজে পাস করেছি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে। এ ধরনের বড় স্কুলের ছেলেমেয়েরা সাধারণত বছরের শুরুতেই বই পেয়ে যায়। আমার বাবা পাস করেছেন গ্রামের যে হাইস্কুল থেকে, সেখানে ইন্টারনেট নেই। আমাদের বাসায় যে গৃহকর্মী কাজ করেন, তাঁর ছেলে পড়ে নাখালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০১০ সালে পাঠ্যবই বিতরণের সময় তাঁর ছেলে এক মাস বই পায়নি। তাঁর পক্ষে এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করা সম্ভব নয়।’

তাহলে ওয়েবসাইটটি আসলে কাদের জন্য? তা ছাড়া বইগুলো কেনই বা ফ্ল্যাশের মতো সফটওয়ারে? আমাদের দেশের ইন্টারনেটের যে গতি, তাতে তো এ ধরনের সিদ্ধান্ত ঠিক নয়; বরং পুরো সাইটটি এইচটিএমএলে করা যেত। আর ফ্ল্যাশ দিয়ে যদি ওয়েবসাইটটি করাই হলো, তবে তাহলে কেন আরও বেশি অডিও-ভিডিও দিয়ে সাইটটি আকর্ষণীয় করা হলো না? এ রকম প্রয়োজনীয় একটি সাইট শুধু দেখতে ভালো হলেই হবে না, কাজেও যেন লাগে সে দিকটিতেও নজর দেয়া দরকার।

(প্রথম আলো, প্রজন্ম ডট কম, ৩ জুন ২০১১ তারিখে প্রকাশিত)

Advertisements

7 thoughts on “ই-বুক কতোটা কাজের

  1. সরকার আসলে ঠিক করতে ভুলেই গিয়েছে এই ওয়েবসাইটটি মূলত কাদের জন্য। শহুরে শিক্ষার্থীরা বইগুলো মোটামুটি ঠিক সময়েই পেয়ে যায়। তাদের কষ্ট করে এই ওয়েবসাইট থেকে বই ডাউনলোড করার কোন মানেই হয়না। আর গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে বই ঠিক সময়ে পৌছাতে পারেনা সেখানে ইন্টারনেট আদৌ পৌছাবে কিনা তা সরকারের চিন্তা করা উচিত ছিল। আপনার সময়োপযোগী রিপোর্টটা যেন সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে এই কামনা করি।

  2. টাকা বানাবার জন্য হাতি ঘোড়া সাপ ব্যাং অথবা এই ইটেক্সট-বুক যাহোক একটা কিছু হলেই হলো! হীরক রাজার দেশের মতো – ‘সাত মাসে সাড়ে সাত লক্ষ মুদ্রায় এই কাগজের ফুল’… 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s