হরতালে পুলিশ কি করতে পারে, কি করতে পারে না


(আবার হরতাল শুরু হয়েছে দেশে। ৩৬ ঘণ্টা হরতালের প্রথম দিনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। এরপর তাকে চ্যাংদোলা করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। আজকের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সেই ছবি ছাপানো হয়েছে। পুলিশ কি এমনটা করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইন কি বলে?

পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মানবিক ও মানবাধিকার আইনের অধীনে কাজ করতে বাধ্য। তাদেরকে এ সম্পর্কে ধারণা দিতে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) ১৯৯৮ সালে সেবা ও সুরক্ষা নামে একটি প্রশিক্ষণ সহায়িকা প্রকাশ করে। এই বইটিকে বিশ্বের দেশে দেশে পুলিশ বাহিনীগুলোতে অবশ্য পাঠ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০৯ সালে আইসিআরসি-র বাংলাদেশ অফিস সেবা ও সুরক্ষা বইয়ের সারসংক্ষেপ ‘পেশাদারী পুলিশী ধারণায় মানবাধিকার ও মানবিক আইন’ শিরোণামে প্রকাশ করে। বর্তমান লেখাটি তৈরিতে উল্লেখিত বইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।)

পুলিশ গণতান্ত্রিক দেশসমূহে আইন প্রয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি বাহিনী। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেয়ার মাধ্যমে সমাজের সেবাদান। পুলিশ সমাজের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পুলিশ আইন জানবে, বুঝবে, শ্রদ্ধা করবে নিয়ম মেনে প্রয়োগ করবে৷ এক্ষেত্রে তাদেরকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানবিক উভয় আইন সম্পর্কেই জানতে হবে। তাদেরকে মনে রাখতে হবে, আইনের চোখে সকল ব্যক্তি সমান এবং তারা সমানভাবে সুরক্ষার দাবী রাখে৷ এক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য চলবে না৷

একটি পেশাদার সংস্থা হিসেবে পুলিশ বিভাগের আচরণবিধি এবং নৈতিকতা রয়েছে, যা তাদের মেনে চলার কথা। তারা একটি আইনী কাঠামোর মধ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, ফলে পুলিশের কাজ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশ বিভাগের কোন সদস্য মানবাধিকার লংঘন করলে বিস্তারিতভাবে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পুলিশ কোনভাবেই তাদের বেআইনী আচরণের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য বলতে পারে না যে, তারা কাজটি ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতিতে করেছিল কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে করেছিল। এই ধরনের কোন অজুহাত দেওয়ার সুযোগ তাদের দিক থেকে নেই।

একটি দেশের পুলিশ বাহিনী শুধুমাত্র তখনই মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে যখন তারা নিজেরা আইন সম্পর্কে জানে, শ্রদ্ধা করে, বোঝে যথাযথভাবে প্রয়োগ করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়া ও সমবেত হওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অর্থে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করা, হরতাল করা মানুষের মৌলিক অধিকার। পুলিশ এই ধরনের অধিকার চর্চায় বাধা দিতে পারে না।

তবে অপরাধ প্রতিরোধ করা পুলিশের একটি কাজ। সেঅর্থে হরতাল চলাকালে কোন ধরনের অপরাধ যাতে না হয় সেলক্ষ্যে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা কিংবা সম্মান দেখানোর প্রয়োজনে কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা, জনসাধারণের নিরাপত্তা, সরকারি আদেশ, জনস্বাস্থ্য কিংবা জনগণের নৈতিকতা রক্ষার স্বার্থে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তাদের বাধা দেওয়ার কাজটিও আইনভিত্তিক হতে হবে। এটি কোনমতেই ইচ্ছেমাফিক হতে পারবে না। অসহিংস সমাবেশের ঘটনায় পুলিশকেও বল প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

শুধুমাত্র অপরিহার্য হলেই পুলিশ বল প্রয়োগ করতে পারে, এবং ততোটুকু বল প্রয়োগ করতে পারে যতটুকু তাদের দায়িত্ব পালনের জন্যে দরকার৷ শক্তি প্রয়োগের ঘটনার দায়দায়িত্ব ঘটনাকারী এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উভয়কেই বহন করতে হবে৷ এই ধরনের ঘটনার জন্যে বিচার বিভাগ পুলিশ সংস্থাকে, এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এবং পুলিশ সদস্য সদস্যগণ প্রত্যেককেই দায়ী করতে পারে৷

হরতাল চলাকালে অপরাধের অভিযোগে আটক ব্যক্তির কতগুলো অধিকার রয়েছে যেমন: গ্রেফতার করা মাত্র একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ জানাতে হবে৷ এবং অনতিবিলম্বে তাকে বিচারবিভাগ কিংবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করতে হবে যাতে করে তার গ্রেফতার বা আটকের বিষয়টি আইনসম্মত হয়৷ আটককৃত ব্যক্তি আইনী সহায়তা পাবেন। তিনি তার পছন্দের আইনবিদের সঙ্গে বিনাবাধায় যোগাযোগের সুযোগ পাবেন৷ তিনি তার আটক হওয়ার বিষয়টি নিজে কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে পরিবারকে জানাতে পারবেন।

পুলিশ ইচ্ছে করলেই কাউকে গ্রেফতার ও আটকাদেশ দিতে পারে না। গ্রেফতার কিংবা আটক করার বিষয়টি শুধুমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিই করতে পারেন৷ তবে, একথা মনে রাখতে হবে যে, ফৌজদারি অপরাধে আটককৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাছাড়া আটককৃত ব্যক্তিকে দোষ স্বীকারে জোর করা যাবে না কিংবা অন্যকে দোষী করার কাজে তাকে ব্যবহার করা যাবে না৷

আর নারী কিশোরকিশোরীদের ক্ষেত্রে তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে গ্রেফতার, আটক করা এবং সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷

যখন কোনো নারীকে গ্রেফতার আটকাদেশ দেয়ার দরকার হবে তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাগণ ‍নারীদের বিশেষ প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন৷ নারী অপরাধীদের বিষয়টি সবসময় দেখার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নারী আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের উপর ন্যস্ত করতে হবে এবং কারারুদ্ধ নারী অপরাধীদের অবশ্যই পুরুষ অপরাধীদের থেকে পৃথক রাখতে হবে৷যখন কোনো নারীকে গ্রেফতার আটকাদেশ দেয়ার দরকার হবে তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাগণ ‍নারীদের বিশেষ প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন৷ নারী অপরাধীদের বিষয়টি সবসময় দেখার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নারী আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের উপর ন্যস্ত করতে হবে এবং কারারুদ্ধ নারী অপরাধীদের অবশ্যই পুরুষ অপরাধীদের থেকে পৃথক রাখতে হবে৷

আমরা সর্বশেষ হরতালে এই অধিকার লংঘিত হতে দেখেছি বিএনপির নারী আন্দোলনকারীদের বেলায়। একই ধরনের ঘটনা আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে যখন লাগাতার দিনের পর দিন হরতাল করেছে তখন বিএনপি ক্ষমতা দেখিয়ে একই ধরনের কাজ করেছিল। কিন্তু পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে এব্যাপারে সচেতন থাকা দরকার ছিল।

পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেয়া এবং প্রয়োজনে তাদের জন্যে চিকিত্সার ব্যবস্থা করা পুলিশের দায়িত্ব৷ আর কোনো ধরনের দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড করা তাদের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ৷ তারা অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং এই আচরণবিধি মেনে চলবে৷ তারা যেকোনো ধরনের লংঘনের ঘটনা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে৷

আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক বেআইনী এবং/অথবা অনৈতিক আচরণের দ্রুত, সার্বিক নিরপেক্ষ তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জিজ্ঞাসাবাদ করা যেমন পুলিশের অধিকার ঠিক তেমনি সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদ অবশ্যই সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে করতে হবে এবং এজন্যে যারা জিজ্ঞাসাবাদ করবে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হবে যাতে করে তারা এসংক্রান্ত দরকারি সুনির্দিষ্ট আইন পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে জানতে পারে৷ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি সবসময় মনিটরিং তত্ত্বাবধান করার ব্যবস্থা থাকতে হবে৷

একটা কথা মনে রাখতে হবে, সকল অপরাধীর সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে৷ সেসঙ্গে তার অধিকার আছে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি দক্ষ, স্বাধীন নিরপেক্ষ আদালতে জনসম্মুখে শুনানি হওয়ার ব্যবস্থা থাকা৷

হরতাল চলাকালে কাউকে যদি বেআইনিভাবে গ্রেফতার বা আটক রাখা হয় সেক্ষেত্রে তার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে৷ আমরা পত্রিকায় পড়েছি যে, গতকাল অনেককে মধ্যরাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেখতে হবে এই ধরনের গ্রেফতার বেআইনী কিনা সেক্ষেত্রে তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

পুলিশিং হলো অনেকগুলো সেবার সমষ্টি৷ এই সেবাগুলো কেমন হবে এবং সেবার মান কেমন হবে সেটি নির্ভর করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যে সমাজকে সেবা দিচ্ছে তাদের আকাঙ্ক্ষা চাহিদা অনুধাবনের সামর্থ্যের উপর৷ কোন কোন দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজের তদন্তের দায়িত্ব পালন করে বেসামরিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত রিভিউ বোর্ড৷

Advertisements

2 thoughts on “হরতালে পুলিশ কি করতে পারে, কি করতে পারে না

  1. সুন্দর লেখা; ধন্যবাদ!
    বাংলাদেশের পুলিশের দুর্ভাগ্য, এত করেও তারা সরকারের মন পায় না; পুলিশকে দিয়ে এইসব কাজ করিয়ে নেয় সরকার, অথচ লালন করে র‍্যাবের মতো এলিট বাহিনী!

  2. “মোবাইল কোর্টগুলো একাধারে রাস্তায়, গাড়িতে এবং বিভিন্ন থানায় বসে বিচার কার্যক্রম চালিয়েছেন বলে জানা গেছে। থানায় বসে যেসব বিচার হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘন হয়েছে। আইনে বলা আছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত বা উদ্‌ঘাটিত হয়ে থাকলে সেই অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে নিয়ে বিচার করতে হবে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হরতালের সময় বা এর আগের দিন কোনো থানায় হরতালকেন্দ্রিক (যানবাহন ভাঙচুর, অগি্নসংযোগ, চলাচলে বাধাদান ইত্যাদি) কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে আসার পর মোবাইল কোর্ট থানায় বসে বিচার করেছেন এবং শাস্তি দিয়েছেন। এটা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আইনজ্ঞদের মত।
    আদাবর থানার ওসি জাকির হোসেন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, থানায় বসেও মোবাইল কোর্ট বিচার করেছেন। তবে সব মোবাইল কোর্ট যে থানায় বসেছেন তা বলা সঠিক হবে না। মোবাইল কোর্ট রাস্তায় এমনকি গাড়িতে বসেও বিচারকাজ করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, একই সঙ্গে সাক্ষ্যও দিয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পাবলিকও এসব মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছে।” – কালের কন্ঠ, জুন ১৪/২০১১

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s