অস্ত্রের রাজনীতি বনাম মানবাধিকার


অস্ত্রের রাজনীতি বনাম মানবাধিকার

খবরটা সব পত্রিকায় আসেনি৷ ছোট্ট একটি শিরোণাম: ‘অস্ট্রিয়ার ছাড়পত্র না পাওয়ায় এক হাজার পিস্তল কেনা বাতিল৷’ খবরে ভেতরে বলা হয়েছে, অস্ট্রিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার তিন বছর ধরে চিঠি চালাচালি করেও বাংলাদেশ পুলিশের জন্য এক হাজার নাইন এমএম পিস্তল সংগ্রহ করতে পারেনি৷ প্রথম আলোতে ১৩ জুন তারিখে প্রকাশিত সংবাদে আরো উল্লেখ করা হয় যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের কাছে অনেক দেশ পিস্তল রপ্তানি করতে চায় না৷

ইন্টারনেট থেকে জানতে পারলাম, জাতিসংঘের অস্ত্রের নিবন্ধন তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে তুরস্ক থেকে বড় ধরনের সামরিক যন্ত্রপাতি আমদানী করেছে (১৭টি কমব্যাট গাড়ি, অটোকার এপিসি); এবং রাশিয়া থেকে আমদানী করেছে ৬০টি সাজোয়া যান (এপিসি)৷ এছাড়াও ইইউ, চীন ও আমেরিকা ২০০৬ থেকে ২০০৮ সময়কালে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে৷ যেমন, ইইউ ২০০৮ সালে ৫ লাখ ৫০ হাজার ইউরোর সমপরিমাণ মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে৷ আরো ৪৪ লাখ ইউরোর সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমতি রয়েছে৷ ইইউ-র প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো হলো ইটালি, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পোল্যান্ড৷

বাংলাদেশ ২০০৭ সালে ইইউ থেকে ৪০ লাখ ইউরোর সামরিক সরঞ্জাম আমদানী করেছে৷ যা ২০০৬ সালে ছিল ২২ মিলিয়ন ইউরো৷ য িদও ওই বছর বাংলাদেশের জন্য রপ্তানির অনুমতি ছিল ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর৷ আমেরিকার অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০০৮ সালে বাংলাদেশে ৮৪ লাখ ডলারের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করে৷ ২০০৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার এবং ২০০৬ সালে ২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার৷ এতো গেলো অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি৷ এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থা ফরেন মিলিটারি সেলস-এর আওতায় বাংলাদেশে ২০০৪ সালে ৬৪ লাখ, ২০০৫ সালে ৮ লাখ ৬০ হাজার, ২০০৬ সালে ৫ লাখ ১০ হাজার, ২০০৭ সালে ৮৯ লাখ এবং ২০০৮ সালে ৬৭ হাজার ডলারের সামরিক সরঞ্জামা িদ সংগ্রহ করে৷ প্রকাশিত সংবাদ থেকে আরো জানা যায় যে, ২০০৭ সালে সার্বিয়া আটটি পৃথক অস্ত্র রপ্তানি অনুমতির আওতায় বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ ডলার মূল্যের অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেয়৷ একই বছরে সার্বিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ লাখ ডলারের সামরিক সরঞ্জাম (গোলাবারুদ, রকেটের মডেল, রকেট প্রস্তত করার যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও নথিপত্র, রাইফেলের পার্টস এবং বিমান বিধ্বংসী ট্যাংকের পার্টস) সরবরাহ করে৷

ইটালি বাংলাদেশে সামরিক ও পুলিশ বিভাগের সরঞ্জামাদি সরবরাহকারী প্রধান দেশগুলোর অন্যতম৷ ২০০৯ সালে দেশটি বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ইউরোর সামরিক সরঞ্জামা িদ সরবরাহ করেছে৷ ২০০৮ সালে ইটালি ৩৭ লাখ ইউরোর অস্ত্রপাতি সরবরাহের অনুমতি দেয়৷ আর ২০০৭ সালে ২৩ লাখ ইউরোর সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমতি দেয়৷ ওই বছর রপ্তানিকারকদের মধ্যে সিমাড স্প্যা ছিল যারা দাঙ্গাবিরোধী বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রপাতি তৈরি করে থাকে৷

গতবছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের একটি বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত গোলাগুলির তথ্য জানাতে গিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটান পুলিশের কমিশনার জানিয়েছিলেন যে, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ ৫১৯ রাউন্ড রাবার বুলেট, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান থেকে ৬০ রাউন্ড এবং ৯৬টি টিয়ারগ্যাস সেল নিক্ষেপ করেছিল৷ মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানাচ্ছে যে, ২০০৪ সালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এলিট ফোর্স ৠাপিড একশন ব্যাটেলিয়নের গোলাগুলিতে ৬০০ এরও বেশি লোক মারা গিয়েছে৷

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (https://bangla.amnesty.org/bn) মনে করে বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের চালানের পরিবহন পর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই দেশে দেশে মানবাধিকার লংঘনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে৷ সংস্থার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন, ‘প্রাণঘাতি চলাচল: অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তিতে অস্ত্র পরিবহন নিয়ন্ত্রণ’-এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে৷ প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশে নিবন্ধিত পরিবহন কোম্পানিগুলো কিভাবে প্রচলিত অস্ত্রাদি ও গোলাবারুদ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহন করে তা তুলে ধরা হয়েছে৷ তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায় যে, বিশ্বের ১০০টি দেশের অন্তত ১২০০ কোম্পানি পিস্তল, রিভলবার, রাইফেলসহ স্মল আর্মস বা ক্ষুদ্রাস্ত্র তৈরি করে থাকে যা ব্যক্তির দ্বারা বহনযোগ্য৷ বর্তমানে বিশ্বে এই ধরনের সচল ক্ষুদ্রাস্ত্রের পরিমাণ অন্ততপক্ষে ৮৮ কোটি এবং প্রতিবছর আরো ৮০ লাখ নতুন আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হচ্ছে৷ আর এসব অস্ত্রের জন্য প্রতি বছর অন্তত ১০০০ থেকে ১৪০০ কোটি গুলি তৈরি হচ্ছে৷ সবমিলিয়ে যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা৷

অস্ত্র যখন তৈরি হয় তখন সেটি শুধুমাত্র যে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে থাকে তা নয়৷ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসীদের হাতেও৷ গত ৫০ বছরের অস্ত্র কেনাবেচা পর্যালোচনা করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, স্মল আর্মস বা ক্ষুদ্রাস্ত্রের বড় মালিকানা ব্যক্তির হাতে৷ বিশ্বের মোট ৮৭ কোটি ক্ষুদ্রাস্ত্রের ৬৫ কোটিই রয়েছে নাগরিকদের হাতে৷ মাত্র ১ কোটির মতো অস্ত্র রয়েছে সশস্ত্র দলগুলোর হাতে৷ কিন্তু সশস্ত্র দলগুলোর হাতে আবার বহনযোগ্য ম্যানপ্যাডস বা ম্যান-পোর্টেবল এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম কিংবা এন্ট্রি ট্যাংক গাইডেড উইপনস রয়েছে, যা সাধারণ ব্যক্তিদের হাতে নেই৷ ৪২টি সশস্ত্র দলের তথ্য জানা গিয়েছে৷ সশস্ত্র দলগুলো তাদের অস্ত্র সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে৷ আর এই ধরনের কর্মকান্ডে বিপদে পড়ে সাধারণ মানুষ৷ এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৮৬ সালে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন একটি সংস্থা যারা মনে করে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র থাকা প্রয়োজন৷ তাদের যু িক্ত হলো সাধারণ মানুষের কাছে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র না থাকায় যুদ্ধবাজ সন্ত্রাসী ও সরকারের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যার শিকার হয়৷ তদুপরি, তারা আরো মনে করে যে দেশগুলোতে নাগরিকদের কাছে অস্ত্র নাই তারাই গণহত্যার শিকার বেশি হয়৷

কিন্তু এই ধরনের মতবাদ মানতে রাজী নয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো৷ কারণ সাধারণ মানুষের হাতে থাকা অস্ত্রগুলোও মানুষ মারার কাজে ব্যবহৃত হয়৷ আর বিশ্বের ৮৭ কোটি স্মল আর্মস দিয়ে প্রতি দেড় মিনিটে ১ জন করে মানুষ খুন করা হচ্ছে৷ প্রতিবছর যে পরিমাণ গুলি তৈরি হয় সেগুলো য িদ সব ব্যবহৃত হয় তবে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে দু’বার ক েমরতে হবে৷ কি ভয়ংকর কথা, তাই না? তারপরও পৃথিবীতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হোক সেটা যারা চায় না অনেক দেশ৷ এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা৷ তবে এ তালিকার প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে সার্ক দেশভুক্ত দু’টি দেশও রছে- ভারত ও পাকিস্তান৷ যারা ক্ষুদ্রাস্ত্র নিয়ে পড়তে চান তারা (http://www.smallarmssurvey.org/) I ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্রাস্ত্র যে শুধুমাত্র আমদানী কিংবা রপ্তানি হয় তা নয়৷ চোরাচালানও হয়৷ বেআইনী এই সকল অস্ত্র ব্যবহৃত হয় লুটতরাজ, দাঙ্গা তৈরি কিংবা বিভিন্ন ধরনের মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডে৷ প্রতি বছর অন্তত ২ কোটি শিশু স্থানচ্যুত হয় এবং তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে অস্ত্র সংক্রান্ত কর্মকান্ডের ফলে৷ আর অস্ত্র দ্বারা জখম হয়ে কতো লোক হাসপাতালে ভর্তি হয় কিংবা প্রতিবন্ধীত্ব বরণ করে আয় করার সামর্থ্য হারায় সেই হিসেব নেই৷ তবে, বলা হয় যে এই মুহুর্তে বিশ্বে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিচারে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে ক্ষুদ্রাস্ত্র ও এর ব্যবহার৷

এখানে কি বাংলাদেশের করার কিছু আছে? প্রথমত, গরিব এই দেশটি নিজে অস্ত্র ব্যবহারের সংযমী হতে পারে এবং আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য অস্ত্র বাণিজ্য বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে৷ এটি একটি সুযোগ৷ যে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কাঙ্ক্ষিত নোবেল পুরস্কার লাভের চেষ্টা করতে পারেন৷ এজন্য অবশ্য তাকে দেশেও সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ মনোযোগী হতে হবে৷ দমন নিপীড়নের রাজনীতি পরিহার করতে হবে৷ অস্ত্রের ব্যবহারে সংযমী হতে হবে৷ আর সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে৷ এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ধরনের একটি ভাবমূর্তি তৈরিতে অগ্রসর হন কিনা৷ তার উপদেষ্টারা কি বলেন?

(রাইট টার্ন, বিপরীত স্রোত, বর্ষ ১, সংখ্যা ১৫, ২৮ জুন ২০১১)

 

Advertisements

2 thoughts on “অস্ত্রের রাজনীতি বনাম মানবাধিকার

  1. আপনার নিবন্ধে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অস্ত্র না রপ্তানী করার কারনটা পরিষ্কার নয়। তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানী করে থাকে সরকার পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর (বিশেষতঃ জাতিসংঘের কাজে) প্রয়োজনে……সামান্য কিছু পরবর্তিতে বেহাত হতে পারে…যা সারা পৃথিবিতেই হয়। রাবের কারনে রপ্তানি বন্ধ করেছে – এ অভিযোগ তো আপনার লেখায় কোথায়ও দেখলাম না। একটু আলোকপাত করবেন কি ?

    • কি কারণে বাংলাদেশে রপ্তানী করেনি সেকথা আমিও জানি না। খবরে তেমন কিছু বলাও হয়নি। এই লেখাতে আমি যেসব তথ্য ব্যবহার করেছি সেগুলোর মূলত দু’টি ওয়েবসাইট থেকে। তার ঠিকানাও দিয়ে দিয়েছি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s