গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি: সম্ভাবনাময় সেক্টরে বঞ্চিত শ্রমিক


(এদেশে হলো পুজিবাদ নির্ভর সমাজ৷ এখানে শ্রমিকের ঘামে মালিকের বিলাস হবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ প্রশ্ন হলো একজন শ্র্রমিকের সঙ্গে তার মালিকের আয়ের বৈষম্য কতটা হবে?
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন অনেকের ধারণা ছিলো আমরা একটি অভুক্ত জাতি হিসেবে বেচে থাকবো৷ কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্থনীতি পিছন ফিরে তাকায়নি৷ অগ্রগতি সীমিত হতে পারে কিন্তু সামনেই হেটেছি আমরা৷ এটি প্রণিধানযোগ্য৷ আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বছরে ৫ শতাংশের উপরে৷ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার গড় প্রায় ২ হাজার ডলার৷ ২০০৪ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি ছিলো প্রায় ২৭৫ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা৷ আমাদের এই সমৃদ্ধির একটি বড় কারণ আমাদের জাতিসত্ত্বার মধ্যে মিল থাকা৷ আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি৷ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়৷ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ মৌলিক চাওয়া পাওয়াগুলো নিয়েই সন্তুষ্ট৷ দিনে তিনবেলা দুমুঠো ভাত, বছরে কয়েক প্রস্থ কাপড়, মাথা গোজার জন্য একটু ঠাই এই নিয়েই আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ সন্তুষ্ট৷
এই লেখাটি যখন লিখি তখন মাত্র বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শাসনামল শেষ হয়েছে। লেখাটার প্রাসঙ্গিকতা এখনো অটুট রয়েছে। তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ এই লেখাটি ছাপা হয়েছিল দৈনিক যায়যায়দিনের রাজনীতি বিষয়ক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের কাভার স্টোরি হিসেবে ২০০৬ সালের ১৪ নভেম্বর।)

বাংলাদেশের একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির কথা ভাবুন৷ নিজস্ব জমিতে বিশাল বড় এক বিল্ডিংয়ে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি৷ যেখানে বিদেশী বায়ারের আনাগোনা আছে নিয়মিত৷ বছরে লাখ লাখ ডলারের অর্ডারও আছে৷ শুধু একটি জিনিস ওই গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে নেই, ওখানে কোনো মানুষ শ্রমিক নেই৷ আছে অনেকগুলো রোবট৷ ওরাই সব কাজ করছে৷

এটি কল্পনা৷ কিন্তু এটিই যদি সত্যি হয় তবে সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন আমাদের গার্মেন্ট মালিকরা৷ কারণ তখন গ্রামের অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত এদেশের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকতুল্য গার্মেন্ট ওয়ার্কারদের সামলানোর মতো তথাকথিত ছোটোজাতের কাজগুলো তাদেরকে করতে হবে না৷ কিন্তু এরকম একটি অবস্থা তৈরি হলে সবচেয়ে অখুশি হবেন গ্রামের দরিদ্র ও খেটে খাওয়া গার্মেন্ট ওয়ার্কার নারীদের উপর ভর করে টাকার সম্পদ বানানোতে ব্যস্ত ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটানো শ্রমিক নেতা-নেত্রীরা৷ কারণ রোবটদের নিয়ে তো আর পলিটিক্স করা যায় না৷

রোবট প্রসঙ্গটি কল্পনা৷ বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের চালু প্রায় ৩২০০ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কুড়ি লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক কাজ করেন৷ ক্ষেত্রবিশেষে তারাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী৷ গার্মেণ্ট শিল্প আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় সেক্টর৷ দেশের মোট রফতানি আয়ের ৭৬ শতাংশ আসে গার্মেন্ট শিল্প থেকে৷ অতএব আমাদেরকে গার্মেণ্ট শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ ও অব্যাহত উন্নতির লক্ষ্যে বাস্তব অবস্থাগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সামনে আগাতে হবে৷ এই শিল্পকে ঘিরে কোনো ধরনের হঠকারী কাজকারবার একদমই প্রশয় দেয়া যাবে না৷ সাম্প্রতিককালে বর্ধিত বেতন ভাতার দাবীতে গার্মেন্ট শিল্পে যা ঘটে গেল তা দেশ, জাতি, গার্মেন্ট শিল্প কোনো কিছুর জন্যই মঙ্গলজনক কিছু নয়৷

গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে সমস্যা আছে

আমাদের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে সমস্যা আছে৷ বিগত দিনগুলোতে আগুনে পুড়ে গার্মেন্ট শ্রমিক মারা গিয়েছেন৷ ভবন ধ্বসে মারা গিয়েছেন৷ বিপদের সময় হুড়োহুড়ি করে জীবন বাচাতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মারা গিয়েছেন৷ তাদের বেতন কম৷ দীর্ঘসময় ধরে কাজ করতে হয়৷ ওভারটাইম করা বাধ্যতামূলক৷ যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, স্বাধীনতা নেই বললেই চলে৷ আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের আওতায় (যা আমাদের দেশেরও আইন) নন কমপ্লায়েন্স একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে৷ মূলত এই নন-কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলোই শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো মেনে নিতে পারছে না৷ আবার বায়ারদের চাপও আমাদের নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা থাকার কারণ৷

একটি বিকাশমান শিল্প

আমাদের গার্মেন্ট শিল্প যখন মাত্র বিকশিত হতে শুর“ করেছিল তখন প্রায় সব কিছুই আমাদেরকে বিদেশ থেকে আনতে হতো৷ এখন গার্মেন্ট এক্সেসরিজের মধ্যে কার্টন, সুতা, বোতাম, লেবেল, পলি ব্যাগ, গাম টেপ, শার্ট বোর্ড, গলার বোর্ড ইত্যা িদ দেশেই তৈরি হচ্ছে৷ তবে বছরের দরকারি ৩০০ কোটি গজ কাপড়ের বড় অংশটাই আমাদেরকে এখনো বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়৷ এজন্য আমরা চীন, ইনডিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান ইত্যা িদ দেশের উপর নির্ভরশীল৷ বছরে কাপড়ের চাহিদা বাড়ছে ২০ শতাংশ হারে৷ যে সূত্রে আমাদের টেক্সটাইল শিল্প বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে৷ অন্—ত আগামী ৫ বছরে আমরা যদি প্রতি মাসে একটি করে মাঝারি মাপের কম্পোজিট টেক্সটাইল ইন্ড্রাস্ট্রি করতে পারি তবে ৫ বছরে ৬০টি টেক্সটাইল মিল করা সম্ভব হবে৷ যা আমাদের বর্তমান মোট চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পারবে৷

সবমিলিয়ে আমাদের গার্মেণ্ট শিল্প একটি বিকাশমান শিল্প৷ আমাদের দেশের উদ্যোক্তরা বিদেশী সহযোগীদের সহযোগিতায় ও তাদের প্রত্য¶ তত্ত্বাবধানে ৭০ দশকের শেষভাগে গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে৷ আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশের প্রথম দিকে ইনডিয়ান পুজি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করেছে৷ শ্রীলংকান, কোরিয়ান ও ফিলিপনোরা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে৷ এসবের মধ্য দিয়ে আজকে গার্মেন্ট শিল্প ৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে৷ এখান এই শিল্পে প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক কাজ করেন৷ এরা হলেন প্রত্য¶ কর্মী৷ কিন্তু গার্মেন্ট শিল্পকে ঘিরে আরো অন্তত ২ কোটি লোকের রুটি রুজি ঘটছে৷ এটি কোনো ফেলনা বিষয় নয়৷ এই অবস্থায় আমাদের পিছনে ফেরার সুযোগ নেই৷

প্রয়োজনে কারখানাগুলো বন্ধের আদেশ দিতে হবে

গার্মেন্ট এক্সপার্টরা মনে করেন, গার্মেন্টগুলোতে যদি আন্দোলন করতে হয় তবে প্রথমত করা দরকার কাজের বৈরি পরিবেশ, শ্রমিকদের নিয়োগ পত্র না থাকা, যৌন হয়রানি, ইচ্ছেমতো চাকরিচ্যুতি ইত্যাদির জন্য৷ শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত ৪৭০০ গার্মেন্টসের মধ্যে ১৫০০ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ এবং বাকিগুলোর মধ্যে আরো প্রায় ১৫০০ মানসম্পন্ন নয়৷ মানহীন গার্মেন্টগুলোতে কাজের পরিবেশ ভালো নয়৷ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ৷ এ ধরনের কারখানাগুলো বিভিন্ন সময়ে খবরে উঠে আসে৷ এই ধরনের কারখানাগুলোয় আগুন লাগে, ভেঙ্গে পড়ে৷ মারা যায় শ্রমিক৷ ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়৷ এই সুযোগকে কাজে লাগান গার্মেন্ট শ্র্রমিক নেতা-নেত্রীরা৷ তারা শ্রমিক অসন্তোষের যেকোনো সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মালিকদের সঙ্গে দরকষাকষি করেন৷ উদ্দেশ্য নিজেদের অবস্থা ও অবস্থান পোক্ত করা৷ ফলে পুরো সেক্টর অনেকাংশেই জিম্মি হয়ে পড়ে৷ এই ধরনের অবস্থা যাতে তৈরি না হতে পারে সেলক্ষ্যে কর্তৃপক্ষকে মানসম্পন্ন নয় এমন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর মালিকদের সময় বেধে বলে দিতে হবে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে৷ তারা যদি ব্যর্থ হন, কারখানাগুলো প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে হবে৷

বিরোধে সমাধান হবে না

আমাদের দেশের গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা-নেত্রীদের বুঝতে হবে মালিকদের সঙ্গে বিরোধ করে নয়, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ ভাঙচুর কিংবা জ্বালাও পোড়াও করে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না, তাদের জন্য কোনো দাবী আদায়ও করা যাবে না৷ অন্যদিকে মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে গার্মেন্ট শ্রমিকরাও মানুষ৷ তাদেরও জীবনে পরিবার পরিজন রয়েছে৷ তাদেরও কাজের বিশ্রাম দরকার৷ বিনোদন দরকার৷ ছুটি দরকার৷ ভদ্রভাবে বেচে থাকার মতো মজুরি পাওয়া দরকার৷ গার্মেন্ট মালিকদেরকে শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক হওয়ারও দরকার রয়েছে৷ দক্ষ ও শিক্ষিত সুপারভাইজর যেমন নিয়োগ দেয়া দরকার তেমনি সকলের জন্য উদ্দীপনামূলক ও দরকারি প্রশিক্ষণের নিয়মিত আয়োজন করা দরকার৷ আর দরকার নিয়ম চালু করা ও পালন করা৷ আমরা লক্ষ্য করেছি আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ের মতো বেশিরভাগ গার্মেন্ট কারখানা নিয়মনীতি দিয়ে নয়, পরিচালিত হয় গার্মেন্ট মালিকের ইচ্ছে অনুযায়ী৷  এর আশু পরিবর্তন হওয়া দরকার৷

আমাদের গার্মেন্ট শিল্পে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত রয়েছে৷ মোটা দাগে এই পক্ষগুলো শ্রমিক ও মালিক হলেও৷ এরসঙ্গে আরো জড়িত রয়েছে অনেকগুলো পক্ষ যেমন, মধ্যস্বত্বভোগী (বায়ার),বিদেশীক্রেতা, পরিবহন, প্যাকিং, ফ্রেইট এন্ড ফরওয়ার্ড, ব্যাংক লেনদেন, এয়ারলাইন্স, জাহাজ পরিবহন, স্থল পরিবহন, কুলি/শ্রমিক, গ্রামে বসবাসকারী গার্মেন্টস কর্মীর পরিবারের সদস্য ইত্যাদি৷ সবমিলিয়ে গার্মেন্ট শিল্প অচল হওয়া মানে দেশের বড় বিপর্যয় ঘটা৷ যেকারণে সাম্প্রতিককালের গার্মেন্ট সেক্টরে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সকলেই৷ এবারের আন্দোলনে মূল কারণ হিসেবে খবরে উঠে এসেছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতনের বিষয়টি৷

৩০০০ টাকা দিতে বাধা কোথায়?

আমাদের আন্দোলনরত শ্রমিক স্বার্থ দেখায় নিয়োজিত পক্ষগুলোর দাবী হলো গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৩০০০ টাকা করা৷ নিম্নতম মজুরি বলতে আমরা কি বুঝব? নিম্নতম মজুরি একজন মানুষকে খেয়ে পড়ে বাচার মতো সুযোগ দেবে, তাইতো? একথা সত্যি গত এক বছরে বাজারে সবকিছুর দাম এতোটাই বেড়েছে যে একজন মানুষকে খেয়ে পড়ে বাচার জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা বা তারচেয়েও বেশি দরকার৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো শ্রমিকের মজুরি ৯৩০ টাকা হিসেব ধরে বিদেশ থেকে অর্ডার জোগাড় করতে অভ্যস্ত গার্মেন্টগুলোর পক্ষে রাতারাতি শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৩০০০ টাকা দেয়া সম্ভব কিনা? আর একজন নতুন গার্মেন্ট শ্রমিক যখন ৩০০০ টাকা পাবেন তখন পুরনো যে শ্রমিকটি ৩০০০ টাকা বেতন পাচ্ছেন তিনি কি মেনে নেবেন? তিনিও তো বেশি বেতন চাইবেন? এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন হবে৷ তখন মোট খরচ বাড়বে কতো? সেই খরচ মেনে একজন গার্মেন্ট মালিক কারখানা চালাবেন কি? এমন আরো অনেক প্রশ্ন রয়েছে৷ সেসব প্রশ্নের সমাধান না হলে শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ৩০০০ টাকা করা সম্ভব হবে না৷

টেসকো উদাহরণ

আমেরিকান ক্যাজুয়াল ওয়্যার ব্র্যান্ড টেসকো বৃটেনে মার্কেটিং করতে শুর“ করেছে গত ২০০২ সাল থেকে৷ মাত্র দুই বছরে তাদের বাণিজ্য বেড়েছে চার গুণ৷ টেসকো ভ্যালু জিনস নামে একটি জিনস প্যান্ট বিক্রি করে মাত্র ৩ পাউন্ডে৷ এই জিনস প্রতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩০ হাজার পিসেরও বেশি৷ টেসকো এই ভ্যালু জিনসে কোন দেশ থেকে তৈরি করা হচ্ছে সেটি লেবেল করে না৷ টেসকোর পুরো ভ্যালু জিনস তৈরি হয় বাংলাদেশে৷ গত বছর টেসকো বাংলাদেশ থেকে ৫৪ মিলিয়ন পাউন্ডের ভ্যালু জিনস তৈরি করিয়েছিল৷

একটি জিনস প্যান্ট যখন মাত্র ৩ পাউন্ডে বিক্রি হয় তখন সেটি স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেক কম দামে তৈরি করতে হয়৷ কমপ্লায়েন্স আছে এমন কারখানায় টেসকোর এই ভ্যালু জিনস তৈরি করা সম্ভব নয়৷ এটি দুর্বল পরিবেশে কর্মরত শস্তা দরের শ্রমিককে দিয়েই তৈরি করা সম্ভব৷ শস্তা শ্রমের চক্রটি এভাবেই গড়ে উঠে৷

এর মূল উত্পাটন এখানে বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিম্নমজুরি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্ভব নয় সেকথা এদেশের লেখাপড়া জানা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারসমৃদ্ধ শ্রমিক নেতারা জানেন না তা নয়৷ কিন্তু তারা জানলেও সেসব কথা খুলে বলেন না৷ কারণ তাতে তাদের শ্রমিক ঠকানোর ব্যবসায় ভাটা পড়ার ঝুঁকি থাকে৷ শ্রমিকরা শিক্ষিত হয়ে গেলে তাদের বড় বিপদ৷

দায়ী কে?

গার্মেন্ট শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি কাঠামো নিয়ে ঢাকাসহ গার্মেন্ট অধ্যুষিত এলাকাগুলো যখন উত্তপ্ত হয় গত অক্টোবরে৷ তখন আওয়ামী লীগসহ তত্কালীন সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী পূরণে জোট সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে, এই সরকারের আমলে গামেন্ট শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না৷

আমরা যদি গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো ১৯৯৪ সালে সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি কাঠামো ঠিক করা হয়েছিল ৯৩০ টাকা৷ সেসময় ক্ষমতায় ছিলো বিএনপি৷ এরপর আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করেছে কিন্তু নিম্নতম মজুরি তারা বাড়ায়নি৷ তারা যদি তখন ধারাবাহিকভাবে অন্তত তিন বছর অন্তর নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করতো এবং সেই ধারাবাহিকতা জোট সরকার অনুসরণ করতো তাহলে আজকে নিম্নতম মজুরি নিয়ে গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিক নামধারী কতিপয় দুষ্কৃতিকারী এই অরাজকতা করার সুযোগ পেতো না৷

কাজটি সহজ নয়

এদেশে বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কতটা কঠিন তা তো আমরা সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে সংগ্রাম ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বুঝতে পারি৷ সংবাদপত্র হলো শিক্ষিত মানুষের জায়গা৷ সেখানেই কত গণ্ডগোল৷ আর গার্মেন্ট হলো শিল্প তো নিরক্ষর কিংবা অশিক্ষিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এবং শ্র্রমিক-কর্মচারীদের বিশাল কর্মযজ্ঞ৷ সেখানে অনেক ধরনের জটিলতা আছে৷

যেমন, কোনো একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি কাজ জোগাড় করছে ৪৫ সেন্ট রেটে৷ আবার একই ধরনের প্রোডাক্ট অন্য একজন তৈরি করছে ১ ডলার ২৫ সেন্টে৷ কারণ প্রথমজনের বায়ার বা ক্রেতা নন-ব্র্যান্ড প্রোডাক্ট বিক্রি করেন৷ অন্যজনের বায়ার ব্র্যান্ড শপ পরিচালনা করে৷ কিংবা প্রথমজনের ফ্যাক্টরি কমপ্লায়েন্স। অন্যজনেরটা কমপ্লায়েন্স নয়৷ কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরিগুলোতে একজন শ্রমিক ৯০০ টাকা মজুরিতে কাজে যোগ দিলেও ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে তার বেতন ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা হয়৷ বছর দুয়েকের মধ্যে একটি কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরির শ্রমিকের নিম্নতম বেতন ২২০০ থেকে ৩০০০ টাকা হয়৷ এছাড়া ওভারটাইম মিলিয়ে আরো কয়েকশ টাকা তারা পায়৷ নন-কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরিতে বেতন বাড়ার হার এমনটা নয়৷

এই ধরনের খুটিনাটি বিষয়গুলো মিডিয়াতে প্রকাশ হয় না৷ ফলে মানুষ পুরো চিত্রটি বুঝতে না পারায় সঠিক জনমত গঠিত হচ্ছে না৷ এটি একটি জটিল পরিস্থিতি৷ এই ধরনের জটিল পরিস্থিততে জল ঘোলা করে মাছ শিকার করতে ব্যস্ত হয় কেউ কেউ৷ সেটিই স্বাভাবিক৷

বিদেশীরা জড়িত

গার্মেন্ট মালিকরা বলছেন বিদেশীদের মদদে দেশে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলছে৷ বিদেশী বলতে তারা কোন দেশকে বোঝাচ্ছেন? ইনডিয়া, চায়না নাকি অন্য কোনো দেশ? যেটি বা যেই দেশগুলো বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের ক্ষতিতে ব্যস্ত তাদের সম্পর্কে যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে গার্মেন্ট মালিকদের কথা বলা উচিত৷ নতুবা বিষয়টি জুজুর ভয় দেখানোর পর্যায়ে থেকে যাবে৷ সেক্ষেত্রে এরকম কথা বলা গার্মেন্ট মালিকদের বন্ধ করা উচিত হবে৷

তবে একটি বিষয় গত ২/৩ বছরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ সেটি হলো কয়েকটি সুপরিচিত ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডের বায়িং অফিস হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে শিফট হয়ে ইনডিয়াতে চলে এসেছে৷ এই অফিসগুলোতে আগে যেখানে কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ইওরোপীয় বা আমেরিকান কর্মকর্তারা কাজ করতেন সেসব পোস্টে এখন ইনডিয়ানরা কাজ করছেন৷ ইনডিয়ান কর্মকর্তারা আমাদের দেশের গার্মেন্টগুলোর উপর অনেক বেশি চাপ তৈরি করছেন৷ বিভিন্নভাবে তারা এদেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর মার্চেন্ডাইজারসহ বিভিন্ন সেকশনকে নাকানি চুবানি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন৷ আবার এও দেখা যায়, যে গার্মেন্টগুলো ম্যানুফ্যাকচারিং করার ঝামেলা বেশি অন্যদেশ যেমন শ্রীলংকা বা চায়নার গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো নিতে চায় না সেগুলো বাংলাদেশকে বেশি অফার করা হয়৷

গার্মেন্ট সেক্টরে যারা কাজ করেন তারা জানেন প্রতিটি প্রোডাক্ট সাপ্লাই দেয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেধে দেয়া হয়৷ এই অবস্থায় কঠিন ও জটিল কাজগুলো সময়মতো করতে আমাদের দেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো স্বাভাবিক কারণেই হিমশিম খায়৷ তদুপরি খুব ভালো রেটও তারা পায় না৷ বাংলাদেশের গার্মেন্টকে বেকায়দায় ফেলতে এরকম করার ঘটনা ইদানিং বেশি হচ্ছে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন৷

প্রমাণ দিতে হবে

আবার যারা শ্রমিকের স্বার্থ দেখার দাবী করছেন সেই সব গার্মেন্ট শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে বলতে পারতে হবে কোন গার্মেন্টে শ্রমিকদের কিভাবে কতটা শোষন করা হচ্ছে? সুস্পষ্ট তথ্য দিয়ে জনগণের সামনে দাবী দাওয়া তুলে ধরতে হবে৷ গার্মেন্ট মালিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও বিষোদগার করে বিভিন্ন সময়ে হরতাল অবরোধ করার মতো হঠকারি কর্মকাণ্ড তারা করতে পারেন না৷

কিছুদিন আগে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের এক শ্রমিক সম্মেলনে দেশের বরেণ্য অর্থনীতিবিদ মি. আবুল বারাকাত বিগত বিএনপি ও জোট সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, এই সরকার শ্রমিক কল্যাণমুখী না হওয়ায় গত বছরে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কোনো পদক্ষে নেননি৷ তিনি আরো বলেছেন, ১৯৯৪ সালে যেখানে নিম্নতম মজুরি ছিলো ৯৩০ টাকা সেটি এখন কমপক্ষে ২৫১১ টাকা হওয়া উচিত৷ কারণ গত ১১ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বেড়েছে . গুণ

তাকে সেদিন যে প্রশ্নটি কেউ করেননি, শ্রমিক কল্যাণমুখী চিন্—াবিদ ও অর্থনীতিবিদ মি. আবুল বারাকাত গত এগারো বছর কোথায় ছিলেন? এতোদিন তিনি এনিয়ে কেন কথা বলেননি? নাকি তিনি কথা বলার জন্য একটি মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় বসে ছিলেন?

প্রশিকার ফারুক সাহেবের হাত ধরে এনজিওরা অনেক বদনাম কুড়িয়েছে৷ এখন কি মি. আবুল বারাকাত ও মি. দেবপ্রিয়দের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের হাত ধরে আমাদের সুশীল ও চিন্তাশীল সমাজ বদনাম কুড়াবে?

সুশীল ও চিন্তাশীল মানুষরা জনগণের জন্য ও তাদের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন সেটি স্বাভাবিক সেখানে দল যেন বিবেচ্য না হয়ে যায়৷ সত্য কথা বলতে তাদের পিছপা না হওয়াই উচিত৷ কোনো ফোরাম নয়, তাদের উচিত নিজ দায়িত্বে সত্য প্রকাশে অগ্রবর্তী হয়ে অন্যদের মাঝে আলো ছড়ানো৷ যাতে করে আমরাও আলোকিত হতে পারি৷ আমরা যেন বিভ্রান্ত না হই৷ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সেদিনের সেই সভাতে আরো অনেকেই ভুল তথ্য দিয়েছেন৷

যেমন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রেসিডেন্ট হাসানুল হক ইনু বলেছেন, দেশের ৩৮টি সেক্টরের মাত্র ৭০ হাজার শ্রমিক নিম্নতম মজুরি বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী নিম্নতম মজুরি পেয়ে থাকেন৷ যারা দেশের মোট শ্রমিকের মাত্র ২৫ শতাংশ৷ তাহলে প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে নিম্নতম মজুরির আওতায় কি মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন, তাও আবার ৩৮টি সেক্টরে?

মনে রাখতে হবে ইচ্ছেমতো তথ্য দেয়ার দিন এখন আর নেই৷ এটি চিরতরে যাতে বন্ধ করা যায় সেজন্য আমাদেরকে আরো বেশি বেশি করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে৷ এক্ষেত্রে বিজিএমইএ-সহ গার্মেন্ট শিল্পের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে৷

তত্পর ছিলো অনেক পক্ষ

গার্মেন্ট নিয়ে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে যে, এতে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত ছিলো৷ সর্বশেষ অক্টোবর মাসে মিরপুরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেখানে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে বিএনপি ও আওয়ামী উভয় দলের মিছিলের কিছু চেনামুখকে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণে অংশ নিতে দেখেছেন স্থানীয় জনগণ ও গার্মেন্ট মালিকরা৷ গত অক্টোবরে ২০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিরপুর ১২ নাম্বারে অবস্থি স্থানীয়ভাবে প্রতাপশালী মোল্লা পরিবারের মার্কেটে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে৷ সেই ঘটনা পুলিশের হস্তক্ষেপে নয়, থেমেছে মোল্লা পরিবারের নিজস্ব আগ্নেয়াস্ত্রের ফাঁকা গুলিবর্ষনের মধ্য দিয়ে৷ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন বীরদর্পে ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেয়া শ্রমিক নেতারা মোল্লাদের ধমকি খেয়ে কিভাবে লেজ তুলে পালাচ্ছেন৷ এভাবে বিভিন্ন ঘটনার যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা জানেন আমাদের দেশের নিরীহ গার্মেণ্ট শ্রমিকরা কোনো ধরনের ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত হননি৷

এবছরের গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে সহিংসতার কারণে সাভার ইপিজেডসহ ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুরের প্রায় ৫০০ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ মোট ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২০ কোটি টাকা৷ অর্থাত্ নূন্যতম মজুরির ভিত্তিতে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার গার্মেন্ট কর্মীর একমাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ গার্মেন্ট নেতা-নেত্রীদের অরাজকতার কারণে নষ্ট হয়েছে৷ এই অর্থ এই গার্মেন্ট মালিকদের শুধু নয়৷ এই অর্থ এই দেশের৷ এতো গেল সরাসরি আর্থিক হিসেব৷ আরো অনেক হিসেব রয়েছে৷ যেমন, বিদেশী অনেক ক্রেতা বিজিএমইকে জানিয়ে দিয়েছে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাদের পক্ষে বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্ট নেয়া সম্ভব হবে না৷

 

বেতন বাড়ার দরকার নেই, জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দিন

মিরপুর এলাকায় বসবাসরত বিভিন্ন বয়সী সাধারণ গার্মেন্ট কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিদেশী ষড়যন্ত্র বোঝেন না, ভাঙচুর চান না, তারা যে ঠকছেন সেটিও তারা পুরোপুরি বোঝেন না৷ সবচেয়ে বড় কথা তারা সবসময় কাজ হারানোর ভয়ে থাকেন৷ তারা মনে করেন মালিক যদি গার্মেন্ট রপ্তানি করতে না পারেন তবে তাদের কাজ থাকবে না৷ তাদের ভয় সেখানে৷ তাদের বেশিরভাগই আন্দোলন সম্পর্কে তেমন কিছু বোঝেন না৷ বুঝতেও চান না৷

গার্মেন্ট কর্মীরা গ্রাম থেকে আসা সহজ সরল মানুষ৷ তাই তাদের সহজ  স্বীকারোক্তি মালিক যদি অনেক বেশি আয় করেন তবে আমাদের বেতন বাড়িয়ে দিলেই তো পারে৷ কেন বাড়াবে তার পক্ষেও রয়েছে সহজ যুক্তি৷ অকপটে কোন জড়তা ছাড়াই তারা বলেছেন- বাজারে তরিতরকারি, আলু, ডিম, চালের যে দাম বেড়েছে তাতে তিনবেলা ভালোভাবে খেয়ে আগে যে বাড়িতে টাকা পাঠানো যেতো এখন আর পাঠাতে পারি না৷ (লক্ষণীয় তারা মাংস কিংবা মাছের দাম বাড়ার কথা বলেনি)৷ আবার বাড়িতে টাকা না পাঠালেই নয়, সেক্ষেত্রে নিজের পেটে তিনবেলা খাওয়া জুটানো মুশকিল হয়ে পড়ছে৷

তাদের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছে, এমন যদি হয় তাদেরকে দুটি অবস্থার মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হলো৷ প্রথম অবস্থাটি হলো তাদের বেতন আরো বাড়লো সেইসঙ্গে বাড়লো জিনিসপত্রের দাম (যা আমাদের দেশে সাধারণত হয়ে থাকে)৷ অন্যটি হলো তাদের বেতন বাড়লো না কিন্তু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমলো৷ তখন তারা কোনটি বেছে নেবেন৷ তাদের সহজ জবাব ছিলো বেতন বাড়লো কি কমলো তাতে আমাদের কিছুই যায় আসে না৷ আমরা চাই এমন বেতন যাতে করে তিনবেলা নিশ্চিত করে খাওয়া যায়, ঘুমানোর জন্য একটি ঘর বা জায়গা পাওয়া যায়৷ আর দরকার কিছু টাকা প্রতিমাসে বাড়িতে পাঠানো৷

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি বোঝেন কত অল্পতে এদেশের মানুষরা খুশি থাকে৷ আমাদের দুভার্গ্য আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা গার্মেন্ট মালিকরা এই সামান্য জিনিসটুকু পর্যন্ত লাখ লাখ শ্রমিক পরিবারকে দিতে পারছেন না৷ প্রশ্ন হলো এটুকু দাবী পূরণের সামর্থ্য কি নেই আমাদের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি মালিকদের?

 

কতটা বৈষম্য যুক্তিযুক্ত?

ঢাকার রাস্তায় কোটি টাকা দামের যে গাড়িগুলো চলে তাতে আমাদের অনেক গার্মেন্ট মালিকরা চড়েন৷ ঢাকার তেজগাতে পৃথিবী খ্যাত মার্সিডিজ, নিশান, টয়োটা, কিয়া, ভলভো কিংবা ফিয়াটের যে শোর“ম রয়েছে সেগুলোর ক্রেতাদের মধ্যে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি গার্মেন্ট মালিকদের দেখা যায়৷ ঢাকা শহরের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোর মধ্যে যেগুলোর মাসিক বেতন চড়া কিংবা বিদেশীদের কারিকুলামে চালানো হয় সেগুলোতে গার্মেন্ট মালিকদের ছেলেমেয়েরা পড়ে৷ যাদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে গার্মেন্ট মালিকদের এই আরাম আয়েশ তাদের দাবী তিনবেলা পেট পুরে খাবার খেতে চাওয়া, গ্রামের বাড়িতে দরিদ্র বাবা-মাকে মাস শেষে ২০০ কিংবা ৩০০ টাকা পাঠানো৷ ঈদে কোরবানিতে ছোট ভাইবোনের জন্য একসেট জামা পাঠানো৷ এই দাবী তারা করতেই পারেন৷

এদেশে সমাজতন্ত্র নেই৷ সাম্যের কথাও আমরা বলছি না৷ এটি হলো পুজিবাদ নির্ভর সমাজ৷ এখানে শ্রমিকের ঘামে মালিকের বিলাস হবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ প্রশ্ন হলো একজন শ্র্রমিকের সঙ্গে তার মালিকের আয়ের বৈষম্য কতটা হবে? এনিয়ে নতুন করে গবেষনা করার কিছু নেই৷ আজকে যে দেশগুলো উন্নত বলে স্বীকৃত সেখানে আমাদের জন্য উদাহরণ রয়েছে৷ সেখানে এমন বৈষম্য নেই৷ তাই সহজ কথাটি হলো, আয় বৈষম্য দূর করার দায়িত্ব নিয়ে সরকার, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এগিয়ে আসতে হবে৷ তবে বোধকরি সেই দায়িত্ব প্রথমত যদি গার্মেন্ট মালিকরা কিংবা তাদের সংগঠনগুলো নিজেরাই পালন করতে পারেন তবে সকলের জন্য মঙ্গল৷

গার্মেন্ট মালিকদের যুক্তি

গার্মেন্ট মালিকরা দাবী করেন প্রতিটি অর্ডার এবং প্রতিটি শিপমেন্টে তাদেরকে অনেক বড় ধরনের টেনশন নিয়ে কাজ করতে হয়৷ কোনো কারণে শিপমেন্টে দেরী হলে কিংবা উত্পাদনে ভুল হলে তাদেরকে শুধু লাখে নয় কোটি টাকাতে খেসারত গুনতে হয়৷ সেই দায়িত্ব শ্রমিকরা কখনোই নেন না৷ কোনো একটি শিপমেন্টে মালিকের লোকসান হলেও শ্রমিক ঠিকই বেতন পান৷ এটি মালিকদের প¶ থেকে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা৷ সকল ধরনের ঝুঁকি বহন করে, লাভ লোকসানের টেনশন নিয়েই মালিকরা গার্মেন্ট ব্যবসা পরিচালনার পর বছর শেষে লাভের অঙ্ক মেলান৷ তখন দেখা যায় প্রতিটি অর্ডারে তাদের টেনশন ছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় তাদের বছর শেষে বড় অঙ্কের লাভই হয়েছে৷ সেই লাভের টাকায় তারা মালয়েশিয়ায় কিংবা দুবাইতে সেকেন্ড হোম কেনেন৷ সপরিবারে বিদেশে বেড়াতে যান৷ গাড়ির মডেল চেঞ্জ করেন৷ এসব কিছু থেকে কিছুটা অর্থ বাচিয়ে তারা যদি লাভের ৫ থেকে ১০ শতাংশ শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করেন তাতে মালিক শ্রমিক সম্পর্কে নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে৷ আমাদেরকে সেই জায়গাটাতে নজর দিতে হবে৷ বছর শেষে মালিক যদি তার শ্রমিকদের মধ্যে লাভের অংশ বিতরণ করেন তাহলে শ্রমিকরা যেমন কাজ করার আগ্রহ বেশি পাবেন৷ তেমনি দক্ষ শ্রমিকের মধ্যে চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা কমবে৷

 

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ: দরকার ঐক্য

আমাদের এই ছোট দেশে ১৫ কোটি মানুষ বাস করে৷ অনেকের ধারণা ছিলো আমরা একটি অভুক্ত জাতি হিসেবে বেচে থাকবো৷ কিন্তু গত পনর বছর ধরে আমাদের অর্থনীতি পিছন ফিরে তাকায়নি৷ অগ্রগতি সীমিত হতে পারে কিন্তু সামনেই হেটেছি আমরা৷ এটি প্রণিধানযোগ্য৷ আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বছরে ৫ শতাংশের উপরে৷ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার গড় প্রায় ২ হাজার ডলার৷ ২০০৪ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি ছিলো প্রায় ২৭৫ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা৷ আমাদের এই সমৃদ্ধির একটি বড় কারণ আমাদের জাতিসত্ত্বার মধ্যে মিল থাকা৷ আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি৷ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়৷ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ মৌলিক চাওয়া পাওয়াগুলো নিয়েই সন্তুষ্ট৷ দিনে তিনবেলা দুমুঠো ভাত, বছরে কয়েক প্রস্থ কাপড়, মাথা গোজার জন্য একটু ঠাই এই নিয়েই আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ সন্তুষ্ট৷

আমাদের দেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্যও এই কথাটি প্রযোজ্য৷ তারা দেশ বোঝে না, তারা রাজনীতি বোঝে না, তারা হরতাল, মারামারি, ভাঙ্গচুর বোঝে না৷ তারা বোঝে তার কাজ, তারা তাদের সেলাই মেশিনটাকে একজন নৌকা মাঝির নৌকা পুজোর মতোই পুজো করে৷ এই মেশিনটার যত্ন তারা পরম মমতায় নেয়৷ কারণ এই মেশিনটা সচল থাকলে তার পেটে তিনবেলা ভাত জুটবে৷ সেই জমিদার প্রথা থেকে শুর“ করে এদেশের মানুষেরা মালিকের বিরোধীতা না করেই আসছে৷ মালিকরা কি করলো না করলো তা নিয়ে তাদের ভাবার সময় পর্যন্ত থাকে না৷ এটিই বাস্তবতা৷ তাদের স্বপ্ন বড়জোর ধানের শীষ পর্যন্ত৷ গ্রামে থাকা বাবাকে টাকা জমিয়ে এক কড়া কিংবা এক কাঠা জমি কিনে দিতে পারলে সেখানে তার বাবা বা ভাই সোনালী ধান ফলাবে এই পর্যন্তই তাদের ভাবনার দৌড়৷ কিন্তু শ্রমিক নেতাদের ভাবনা এতোটা সীমিত নয়৷ তারা সুযোগ খোজে, আর সুযোগ পেলে ন্যায় অন্যায় তারা কম সময়েই চিন্তা করে৷ শ্র্রমিকদের উস্কানি দিয়ে, মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে, পরিস্থিতকে জটিল করে তার ফায়দা পেতে তত্পর হয়৷ যেকারণে শ্রমিক নেতাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না৷

আমাদের শত্রু প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷ বন্যা, খরা, নদী ভাঙ্গন৷ আর আমাদের সমস্যা হরতাল, চাদাবাজি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ট্রেড ইউনিয়নিজম৷ আমাদের সমস্যা বিদ্যুত্৷ রাস্তাঘাট৷ আমাদের দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বেকার এবং প্রায় ৪৫ ভাগ মানুষ দরিদ্র হওয়ার মূল কারণ সম্পদ বণ্টনে অসমতা৷ এই ধরনের সব সমস্যা আমাদের কাটিয়ে উঠতে আমাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হওয়া দরকার৷ যে আন্দোলনে সকল পক্ষই ন্যায্যতার ভিত্তিতে লাভবান হবেন৷

(দৈনিক যায়যায়দিন এর মঙ্গলবারের সাময়িকী পলিটিক্স এন্ড সোসাইটিতে প্রকাশিত, ১৪ নভেম্বর ২০০৬)

2 thoughts on “গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি: সম্ভাবনাময় সেক্টরে বঞ্চিত শ্রমিক

  1. ‘লেখাটার প্রাসঙ্গিকতা এখনো অটুট রয়েছে।’
    ধন্যবাদ, লেখাটি এখানে দেবার জন্য।
    লেখাটি তেমন কিছু দীর্ঘ নয়; (আর এই অজুহাতে কোন লেখাই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়)।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s