জনগণের প্রিয় RAB, কেন প্রশ্নবিদ্ধ?


আজকে প্রকাশিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (https://bangla.amnesty.org/bn) প্রতিবেদন-‘অগোচরে অপরাধ: বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ (http://www.amnesty.org/en/library/info/ASA13/005/2011/en) পড়তে পড়তে মনে হলো- জনগণের প্রিয় RAB, কেন প্রশ্নবিদ্ধ? নিচের লেখাতে আমি সেই বিষয়টি আমার মতো করে বোঝার চেষ্টা করেছি। আপনার মতামত জানাবেন।

 

২০০৪: প্রচলিত ব্যবস্থার অকার্যকারিতায় RAB গঠনে জনমনে স্বস্তি

২০০৪ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার বিশেষ বাহিনী RAB গঠন করে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তখন ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। বিশেষ করে দেশের পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল। রাজশাহী, খুলনা ও ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে সশস্ত্র অপরাধী দলগুলো কিংবা শক্তিশালী ভাড়াটে গুণ্ডাবাহিনী স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে গোপনচুক্তির ভিত্তিতে চোরাকারবার পরিচালনা কিংবা স্থানীয় জনগণকে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছিল। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে আসছিল। এই অবস্থায় RAB গঠন মানুষের মনে শান্তির সুবাতাস বয়ে আনে। RAB হয়ে উঠেছিল আশার আলো। যেখানে অন্যায় সেখানেই RAB। ক্রমশ RAB দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা ও রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে থাকে। ছোটবড় সকল অপরাধ দমনে জনগণের কাছে আশা ও ভরসার স্থান হয়ে উঠে RAB।

এ অবস্থায় সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিকোণ থেকে মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো RAB এর কর্মকান্ডের বিরোধীতা করলেও জনসমর্থনের জোয়ারে তাদের সেই বিরোধীতা টেকেনি। রাজনৈতিক সরকারও জনসমর্থনের বিপরীতে কিছু করার সাহস দেখাতে পারেনি। ফলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর RAB নিয়ে আশঙ্কা দ্রুতই বাস্তবে রূপ নেয়।

 

ক্রসফায়ারে মৃত্যু

RAB গঠনের পর এই দেশের মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠে। কয়েকদিন পরপর গণমাধ্যমে শব্দটি এতো আসতে থাকে যে, এটি সকলের কাছে সাধারণ এক শব্দে পরিণত হয়। শব্দটি হলো ‘ক্রসফায়ার’।

ক্রসফায়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হলেও জনগণ কেন যেন একে স্বাগতই জানিয়েছিল। ফলে, জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হওয়ায় RAB ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদনে লিখেছে, অপরাধ দমনে RAB এর অভিযানগুলো এসময়ে খুনের একটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পরিচিতি পায়, যাকে কর্তৃপক্ষ বলছেন “ক্রসফায়ারে মৃত্যু”। এমন অনেক মৃত্যুতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সুস্পষ্ট। দেখা যায়, সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের পর নির্জন স্থানে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে। কোন কোন ঘটনায় গ্রেফতারের প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও RAB কর্তৃপক্ষ তাদের দাবীতে অটল থেকেছে। জানিয়েছে যে, ঘটনার শিকার ব্যক্তি “ক্রসফায়ার”, কিংবা “গোলাগুলি” কিংবা “বন্দুকযুদ্ধে” মারা গিয়েছে।

এগিয়ে বিএনপি: তাতে কি আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে?

প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দাবী করেছে যে, বাংলাদেশে এমন সপ্তাহ খুব কমই যায়, যে সপ্তাহে RAB -এর গুলিতে কেউ মারা যায় না। আসুন একটা অঙ্ক করে দেখি তাদের কথা সত্যি কিনা?

RAB গঠনের পর ৭ বছর ৫ মাস পার হয়েছে। বছরে ৫২ সপ্তাহের হিসেবে ৩৮৪ সপ্তাহ হয়েছে RAB গঠিত হয়েছে। অ্যামনেস্টির দাবী সঠিক হতে হলে কমপক্ষে ৩৮৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে হবে। কিন্তু এসময়ে কমপক্ষে ৭০০ লোক RAB এর গুলিতে মারা যাওয়ায় প্রতি সপ্তাহে মৃত্যুর গড় বেড়ে গেছে।

গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১.৮২ জন RAB -এর গুলিতে মারা গিয়েছে। তারা আরো লিখেছে যে, অন্ততপক্ষে ২০০ জন খুন হয়েছে বর্তমান আওয়ামী সরকারের শাসনামলে। আওয়ামী লীগ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। সেই অর্থে আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রতি সপ্তাহে RAB -এর গুলিতে খুনের ঘটনা বিএনপির চেয়ে কম, সপ্তাহে গড়ে ১.৪৭ জন। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে ০.৩৫ জন কম মারা যাচ্ছে। বা বলা যায় প্রতি তিন সপ্তাহে ১ জন করে কম খুন হচ্ছে। তাতে কি স্বস্তি পাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে?

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতায় এলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারের প্রথম পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে’ বলে সুনিদিষ্ট অঙ্গীকারও করা হয়েছে। এই ধরনের অঙ্গীকার না করলে হয়তো আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে থাকতে পারত।

অঙ্গীকার করার কারণেই RAB -এর বিষয়গুলো আওয়ামী লীগের কাছে অস্বস্তিদায়ক হয়ে উঠার কথা।

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছিলেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের। তিনি প্রথম কয়েকমাস বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ব্যাপারে “একদমই সহ্য না করার (জিরো টলারেন্স)” নীতির কথা বলেছিলেন। এসময়ে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাগণও প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারের কথারই পুনরাবৃত্তি করছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন ও ব্যক্তিরা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আশাপ্রদ পরিস্থিতি হোচট খেতে সময় লাগেনি। ২০০৯ সালের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কর্তৃপক্ষ দাবী করলেন যে, দেশে কোন বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনা নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বনাম অ্যামনেস্টির দাবী

একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবী করছেন যে দেশে কোন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নেই অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, আছে। সংস্থাটি তাদের স্বপক্ষে প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছে।

তপন, কামাল, পাপ্পু, হৃদয়: RAB কর্মকর্তারা ২০০৯ সালের ১০ জুলাই সন্ধ্যায় তপন, কামাল, পাপ্পু ও হৃদয়কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারা চারজনই গুলিবিদ্ধ ছিল। RAB দাবী করে যে, ওই ব্যক্তিরা RAB কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধকালে জখম হয়েছে, কিন্তু আহতদের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে, তারা জখম হওয়ার কয়েকঘণ্টা আগেই RAB তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তপনের জখম সারেনি, সে মারা যায়। বাকি তিনজনকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অপরাধে অভিযুক্ত করে কারাগারে পাঠানো হয়।

মুরাদ, ফোরকান ও মিজানুর: মুরাদ একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামী। ১৭ এপ্রিল সে তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু সেই দেখা আর হয়নি। ১৮ এপ্রিল একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মুরাদের ভাইকে ফোনে জানায় যে, মুরাদ RAB -এর জিম্মায় রয়েছে। অনেক চেষ্টার পর ২৭ এপ্রিল যখন তাকে পাওয়া গেলো তখন সে মৃত। ওইদিন ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় গর্তের মধ্যে ফোরকান ও মিজানুরের সঙ্গে মুরাদের লাশ পাওয়া যায়। তাদের শরীরে ছুরির আঘাতসহ মারাত্মক ধরনের জখমের চিহ্ন ছিল। তাদের কব্জিতে যে দাগ দেখা গিয়েছে তাতে একথা বোঝা যায় যে তাদের হাত রশি দিয়ে শক্ত করে বাধা হয়েছিল।

রবিউল ইসলাম: রবিউল অবশ্য মারা যায়নি। সে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। কিভাবে সেই বর্ণনা লেখা হয়েছে প্রতিবেদনে এভাবে: ‘৩১ বছর বয়সী রবিউল ইসলামকে সাদা পোষাকধারী কর্মকর্তারা খুলনার একটি হোটেল থেকে ২০০৯ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেফতার করে। চোখ বেধে ও হাতকড়া পরিয়ে তাকে শহরের খালিশপুর এলাকায় অবস্থিত RAB কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এসময়ে তাকে পেটানো হয়, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং তার যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়।

তার সঙ্গে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কথা হয়েছে খুলনাতে।

“আমাকে একটি হুইলচেয়ারে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমার হাত-পাগুলো বেধে রাখা হয়েছিল। প্রথমে হুইলচেয়ারটি এমনভাবে ঘুরানো হয়েছিল যে আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল, ওই অবস্থাতে হুইলচেয়ারে রেখেই আমাকে পেটানো হয়। আমার চোখ বাধা ছিল। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে আমাকে নির্যাতন করার পর হাতকড়া ও চোখ বাধা অবস্থায় মেঝেতে ফেলা হয়। এরপর তারা আমার চোখ খুলে দেয় এবং কিছু খাবার খেতে দেয়। খাওয়া শেষে আবারো আমার চোখ বেধে দেয় এবং হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। তবে এবার আর হুইলচেয়ারে নয় আমাকে মেঝেতে ফেলে রাখে।”

“পরদিন সকালবেলা ৭টা নাগাদ তারা আমাকে সকালের নাস্তা করার জন্য দুই মিনিট সময় দিয়েছিল। তারপর আবারো চোখ বেধে, হাতকড়া পরিয়ে আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। দ্বিতীয় জায়গায় আমাকে প্রায় ১৬দিন আটকে রাখা হয়। এসময়ে আমার হাতগুলো বেধে মাথার উপর রাখা হয়েছিল। অনেকটা ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার মতো। এসময়ে আমাকে বারবার বলা হচ্ছিল যে, আমি যদি তাদের কথা মতো না চলি, তাদের বলা কথা স্বীকার না করি তাহলে আমাকে মেরে ফেলা হবে। দ্বিতীয় এই জায়গাতে আমাকে দুইবার কিংবা তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এখানে শাস্তি হিসেবে মূলত আমাকে একেক দফায় একটানা প্রায় দেড়ঘণ্টা ধরে ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন একসময় তারা আমার পুরুষাঙ্গে বৈদ্যুতিক তার পেচিয়ে বৈদ্যুতিক শক দিয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল আমি মারা যাচ্ছি। এটা আমার নিশ্চিতভাবে মনে হচ্ছিল যে আমি আর কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাব। প্রচন্ড ঝাঁকুনির পর আমি শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছিল।”

“অনেকদিন পরে, ২০০৯ সালের ৯ নভেম্বর আমাকে মোহাম্মদপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ আমার বিরুদ্ধে একটা ফৌজদারি মামলা রুজু করে। সেসময়ে পুলিশ আমাকে বলেছিল: ‘দেখো, আমাদের কিছু করার নেই। RAB আমাদেরকে তোমার বিরুদ্ধে এই মামলা করতে বলেছে।’

“মামলা রুজু হওয়ার পর আমাকে আদালতে চালান দেওয়া হয়; আদালতে পাঠানো নথি থেকে দেখা যায় যে আমাকে ৯ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে গ্রেফতার করা হয়েছে যদিও প্রকৃতপক্ষে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে এবং ৠাবের জিম্মায় রাখা হয়েছিল। আমি এবিষয়ে প্রতিবাদ জানালাম, কিন্তু কেউ আমার কথায় কান দিল না। কয়েকদিন পরে আমাকে আবারো আদালতে হাজির করা হলো এবং সেখান থেকে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলো।”

“যদিও আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল খুলনাতে কিন্তু পুলিশের কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে আমাকে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় সাড়ে ছয়মাস আটক ছিলাম। এরপর আদালত আমাকে জামিনে মুক্তি দেয়।”

“প্রতিমাসে আমাকে খুলনা থেকে ঢাকায় আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয়। আমার জন্য এটা বড় ধরনের আর্থিক বোঝাস্বরূপ।”

 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আশঙ্কা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল RAB গঠনের পর থেকে ক্রসফায়ার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, RAB কর্মকান্ডের দায়মুক্তির ঘটনাগুলো থেকে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে যেখানে অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, যেমন, পুলিশ বিভাগ বিশ্বাস শুরু করতে পারে যে তারাও লংঘনের ঘটনায় একইভাবে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা এড়াতে পারবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এমন আশঙ্কা যেন সত্যি হতে চলছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের শুরু থেকে এপর্যন্ত শুধুমাত্র পুলিশী অভিযানে কমপক্ষে ৩০ জন ব্যক্তি খুন হয়েছেন, যাদের মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে তারা “গোলাগুলিতে” কিংবা “বন্দুকযুদ্ধে” মারা গিয়েছেন।

 

রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা নাকি অন্যকিছু

একসময় দেখা গেলো বাংলাদেশের দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই RAB এর সকল কর্মকান্ডকে মেনে নিচ্ছে। কেন? এটা কি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা নাকি অন্যকিছু?

আমার মনে এই প্রত্যয় জন্মাছে যে, বিচার বিভাগ দলীয়করণের কারণে আজকে রাজনীতিবিদরা জনগণের আস্থা হারিয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সাধারণ জনগণের হাতের নাগালের বাইরে দীর্ঘদিন যাবত। দেশে ৩০ লাখের মতো মামলা বিচারাধীন। এই অবস্থায় জাতীয় ইস্যুগুলোতে যতো দিন যাচ্ছে বিচার বিভাগ সাধারণের আস্থা হারাচ্ছে। আইনজীবী ও বিচারপতিদের যে ধরনের কর্মকান্ডের খবরাখবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে জনগণের সামনে যেন এখন আর কোন পথ খোলা নেই। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা থেকেই জনগণ ক্রমশ তাদের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে RAB কে দেখতে শুরু করেছিল, সেই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তাই বলে কি “ক্রসফায়ার” চলতে থাকবে? ক্রসফায়ার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে RAB -এর একজন মুখপাত্র অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে ২০১০ সালের মে মাসে জানিয়েছেন যে, RAB বাহিনী এখন “ক্রসফায়ার” শব্দটি ব্যবহারে অনিচ্ছুক কারণ “এটি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করছে; সবাই মনে করছে ঘটনাস্থলে হঠাৎ উপস্থিত হওয়া কাউকে মেরে ফেলা হচ্ছে”। তারই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারি ২০১০ থেকে জুন ২০১১ সময়কালে RAB কর্তৃক ৮৮টি গুলির ঘটনার মধ্যে মাত্র চারটি ঘটনাকে RAB “ক্রসফায়ার” বলে উল্লেখ করেছে এবং বাকিগুলোকে “গোলাগুলি” কিংবা “বন্দুকযুদ্ধ” বলে চালিয়েছে।

এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে যেভাবেই বর্ণনা করা হোক না কেন, এগুলো সন্দেহজনক বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড।

লোকদেখানো তদন্ত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, RAB -এর অভিযানকালে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর তদন্তের মূল ‍দায়িত্ব এখনো পর্যন্ত RAB নিজেই পালন করে থাকে। এটি সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। অভিযুক্ত পক্ষকেই যখন কোন অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মূল নীতিগুলো খর্বিত হয়। অভিযুক্তরা তখন তথ্যপ্রমাণাদি ধ্বংসের স্বাধীনতা পায়, তারা নথিপত্র নষ্ট করতে পারে এবং তদন্তের ফলাফল তাদের মতো করে তৈরি করতে পারে। RAB -এর তদন্তের ফলাফল গোপন রাখা হয়; এবং তাদের তদন্তের ফলাফল বারবার একইরকম হয়ে থাকে। এযাবতকালে RAB -এর যেসকল তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানা গিয়েছে সেগুলোতে কখনোই বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্য RAB -কে দায়ী করা হয়নি; বরং এই ধরনের যতগুলো তদন্ত হয়েছে সবগুলোতে ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ করা হয়েছে, তাদেরকে অপরাধী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাদের মৃত্যুকে যথাযথ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অস্বীকার এবং হাইকোর্ট

হাইকোর্ট ২০০৯ সালের নভেম্বরে সরকারের কাছে RAB -এর হেফাজতে আটক এক বন্দীর সন্দেহজনক বিচার বহির্ভূত হত্যার ব্যাখ্যা দাবী করে, যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছিলেন: “এখন আমরা কোন ক্রসফায়ার করছি না। আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি।”

এরপরও অনেক ঘটনার কথা পত্রিকায় এসেছে। তবে আলোড়ন তুলেছে লিমন হোসেনের ঘটনা। ২০১১ সালের ২৩ মার্চ RAB কর্মকর্তারা ঝালকাঠিতে লিমনের পায়ে গুলি করে। তার জখম এতোটাই মারাত্মক ছিলো যে, চারদিন পরে তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে। লিমন হোসেনের পরিবার জানিয়েছে, মাঠ থেকে গবাদি পশু বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে যাওয়ার পথে লিমনকে গুলি করা হয়।

ঘটনার পরপর এক সংবাদ সম্মেলনে RAB মহাপরিচালক স্বীকার করেন: “লিমন হোসেন কুখ্যাত কোন অপরাধী নয় তবে সে RAB ও অপরাধীদের গোলাগুলির ঘটনার শিকার।” কিন্তু পরবর্তীতে RAB কর্মকর্তাগণ এই বিবৃতি থেকে সরে আসে; জানায় যে, গুলি করাটা যথার্থ ছিলো, এবং লিমন একটি অপরাধী দলের সদস্য। তারা দাবী করে, দুষ্কৃতকারীরা প্রথমে গুলি ছুড়তে শুরু করে এবং RAB পাল্টা গুলি ছুড়লে লিমন আঘাত পায়।

RAB -এর দাবীর মুখে লিমন বলেছে, “এই মুহুর্তে আমি অন্য কারো কাছে নয়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত দল যদি আমার দোষ খুঁজে পায় আমি চাই তারা আমাকে শাস্তি দিক। আর যদি না পায়, তবে আমি তাদের শাস্তি চাই যারা আমার পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করার আগে আমার জামার কলার চেপে ধরে রেখেছিল।”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে বলেছেন যে, “মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে যেখানে আইন অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় তদন্ত দরকার ছিলো তা করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় কোন তদন্তেই RAB গুলি ছোড়ার ঘটনা অযৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়নি”।

 

শেষ কোথায়? কিভাবে?

প্রশ্ন হলো এর শেষ কোথায় এবং কিভাবে? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে RAB ও পুলিশের সন্দেহজনক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত হওয়া উচিৎ এবং কাউকে দায়ী পাওয়া গেলে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা উচিৎ। এই ধরনের কর্মকান্ড বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের পূর্বাপর সরকারকে এর দায়-দায়িত্ব বহন ও জবাবদিহি করতে হবে।

জীবনের অধিকারের প্রতি সর্বদাই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং জীবনের সুরক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো যেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটাতে পারে তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এলক্ষ্যে কি করতে হবে সেকথা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও চুক্তিগুলোতে বলা আছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০১০ সালের ১২ নভেম্বর গৃহীত এক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রগুলোকে “বিচার-বহির্ভূত, সংক্ষিপ্ত বা বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের সকল সন্দেহজনক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার”, এবং দায়ী ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার ও গণ শুনানির ব্যবস্থা করার কতর্ব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আরো আহ্বান জানানো হয়েছে যে, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোকে যেন পর্যান্ত পরিমাণে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ নিশ্চিত করা হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারের করণীয় হিসেবে প্রতিবেদনে লিখেছে যে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করার মাধ্যমে ২০০৪ সাল থেকে চলে আসা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, নির্যাতন ও আটকের ঘটনাগুলোর অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকরভাবে তদন্ত করা। তদন্তের ফলাফলকে জনসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করা। দায়ী ব্যক্তিদের তাদের পদমর্যাদা কিংবা অবস্থান নির্বিশেষে ন্যায়বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। সত্য প্রকাশ করা এবং মানবাধিকার লংঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

আমি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে একমত হয়ে শুধু একথাই বলতে চাই, এই দেশ সকলের। দেশকে ভালোবেসে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। মানুষের অধিকার যদি না দেওয়া হয় তাহলে নিজের অধিকারও একসময় সঙ্কটাপন্ন হতে বাধ্য। আরো বড় ক্ষতি হওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচার বহির্ভূত সকল ধরনের কর্মকাণ্ড জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে আজই বন্ধ হওয়া উচিৎ।

২৪ আগস্ট। পল্লবী। ঢাকা।

Advertisements

2 thoughts on “জনগণের প্রিয় RAB, কেন প্রশ্নবিদ্ধ?

  1. রণ বলেছেন, কিছুই হবে না। বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস!
    .
    .
    .
    সত্যি বলতে কি এই দেশটা নিয়ে আমি আর আশাবাদী হতে পারিনা। সবকিছুতে নৈরাজ্য চলছে। এ নিয়ে যতো কথাই বলা হোক, এ থেকে মুক্তির পথ আমি খুজে পাই না। যে সকল ভালো ভালো উপদেশ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দিয়েছে, ওগুলো কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায়।

    প্রবীণরা প্রায়ই একটা কথা বলেন, যায় দিন ভালো। ভালোদিনগুলো আসলেই চলে গেছে এবং যাচ্ছে। আমার এক প্রবীণ দাদার কাছে শুনেছি- ব্রিটিশ শাসনামলে রাস্তায় যদি কেউ অন্যায়ভাবে একটা কুকুরও মেরে ফেলতো, তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হতো, সেটারও বিচার হতো। আইনের শাসন হতো। সেই দিনগুলি চলে গেছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s