প্রাণতুনে ইফতার আড্ডায় NDC 864


প্রাণতুন হলো শামীমের ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং অফিস কাম ফার্নিচার শপ। গুলশানের ১৩০ নাম্বার রোডের ৭নং এর দ্বিতল বাড়িটা লেকের ধারে হওয়ার কারণে যে ওখানে যেতে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তা কিন্তু নয়। বরং শামীমের আতিথেয়তা সবাইকে টানে। সেসঙ্গে বাড়তি পাওনা হলো বাড়ির মধ্যে সুন্দর একটা সবুজ লন, যা আজকাল ঢাকা শহরে বিরল হতে বসেছে। আড্ডার জন্যও জায়গাটা অনেক সুন্দর। যদিও এবার বৃষ্টির কারণে ওখানে বসা হয়নি। এবার আরো কিছু ব্যতিক্রম হয়েছে। যেমন, অন্যবার ইফতার আড্ডা মানেই শামীমের আয়োজন। এবার নিটোল সেটা হতে দেয়নি। এবারের ইফতার আড্ডায় সবাই কিছু না কিছু নিয়ে গিয়েছে। তবে, এবার লোকসংখ্যা ছিলো অন্যবারের তুলনায় কম। সবাই কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে!

নটরডেম কলেজের ৮৪ সালের গ্রুপ ফোর এ আমরা ছাত্র ছিলাম ১১৮ জন। এর মধ্যে অন্ততপক্ষে ৬০/৭০ জন এখন আর দেশে নেই। বাকিদের মধ্যে প্রতিবছর ১৫/২০ জন আড্ডায় এলেও এবছর আমরা ছিলাম মাত্র ৮ জন। নিটোল, মহিউদ্দিন, শামীম, ইন্দ্রজিৎ, মাজ্জাদ (তিতাস), শওকত, হানিফ এবং আমি। আসার কথা ছিলো আরো অনেকের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আসতে পারেনি। কেউ রোগী দেখার কারণে। কিংবা অফিসের কোন মিটিং থাকায়।

তবে, অন্য বছরের মতো এবারও আড্ডায় নতুন একজন এসেছিল। ইন্দ্রজিৎ সাহা। ২৫ বছর পরে ইন্দ্রজিতের সঙ্গে দেখা হলো অনেকের। অনেক কথা হলো। আড্ডাতে যা হয়। প্রায় পাঁচঘণ্টা আমরা একসঙ্গে ছিলাম। এখানে যতোটুকু মনে আছে তুলে দিলাম। যারা যায়নি কিংবা যেতে পারেনি তারা পড়ে হয়তো মজা পাবে। (তবে খুশি হবো জ্বলুনি হলে!)

তবে আমরা মিস করেছি সবাইকে। যারা দেশে থেকেও আসেনি তাদের উপর রাগ হয়েছে।

বন্ধুদের আড্ডা কেমন হয় দেখা যাক:

এক.

– মাত্র এই কয়জন? আর কেউ আসবে না?

– খালেদ আজিজের মিটিং আছে।

– প্রতিবছরই ওর মিটিং থাকে।

– আনোয়ার জানিয়েছে চেষ্টা করবে।

– রনি তো আসবে বলল।

– আমি এবছর কাউকে বলিনি।

– আসলে সবাই এতো ব্যস্ত যে আসতে পারে না।

 

দুই.

– ইন্দ্রজিৎ তুমি কোথায় আছো?

– বাটাতে।

– কতো বছর পর দেখা। চেনাই যায় না।

– না, দেখ আগের মতোই আছে।

 

তিন.

– ইফতারের সময় হয়ে এলো।

– আরে খেজুর তো কেউ আনেনি। আমি একবার আনতে চেয়েছিলাম।

– পানি দিয়ে শুরু করলেই হলো।

– জিলাপিটা ভালো।

– এটা তো তোর বাড়ির কাছে।

– আমাকে অর্ধেক শর্মা দে।

– চারবছর আগে যখন তোর অফিসে গ্রুপ ফোর এর প্রথম ইফতার পার্টি হলো তখনও তুই দুইটা শর্মা খাইতি। এখন অর্ধেক খেতে চাচ্ছিস।

– হ্যা, এবছর দেখলাম ইফতারে তেমন খাওয়া হয় না। খাওয়ার আগে মনে হয় অনেক কিছু খাব কিন্তু খাওয়ার সময় আর না।

– শর্মাটা তো অনেক মজার।

– হালিম কি পুরনো ঢাকা থেকে এসছে?

– হ্যা।

– এটা তো লাস্ট সাপারের মতো অবস্থা। ১৫ জনের হিসেবে খাবার আনার কথা। তুমি তো ৫০ জনের জন্য হালিম আনছো।

– এখনই কি খাবো নাকি নামাজ পড়ে খাব।

– হালিমটা এখন খেয়ে ফেলি। এরপর তো পায়েস, ফালুদা আরো কতো কিছু রয়ে গেছে।

– এরপর চাচার বানানো খিচুড়ি আর মাংস আছে।

– নামাজের পর চা হবে। তারপর খেতে পারলে অন্য কিছু।

– কিন্তু অল্প করে হলেও খেতে হবে।

– আচ্ছা নামাজে যাওয়া যাক।

 

চার.

– নামাজে সবাই তো আসেনি।

– আর তো কেউ আসার নেই।

– এখানে তো ছয়জন। বাকি দুইজন কই?

– ইন্দ্রজিৎ নামাজ পড়বে না।

– অন্যজনও যে পড়বে না!

– শুরু করা যাক।

 

পাঁচ.

– তুমি কিন্তু ইমামতি করার আগে পারমিশন নাওনি।

– একবার ভেবেছিলাম। কিন্তু মনে হলো একমাত্র আমারই দাড়ি আছে! হানিফ অবশ্য দাবী করতে পারত। কিন্তু তোমার কথা মনে হয়নি!

 

ছয়.

– দেশের কি অবস্থা?

– দেশের অবস্থা খুব ভালো।

– শিক্ষার অবস্থা খুব খারাপ।

– কেমনে?

– ভালো শিক্ষক না থাকলে ভালো শিক্ষা কিভাবে আশা করা যাবে? শিক্ষকরা আজকাল ছাত্রদের অঙ্ক করতে দিয়ে ক্লাসে বসে মোবাইলে কথা বলে।

– আমাগো সময় অঙ্ক করতে দিয়া ঘুমাইতো।

 

সাত.

– রাজনীতির কি অবস্থা।

– আগের মতোই।

– শোনো, উত্তরাতে এক ক্লাবে রাত আড়াইটার সময় বিএনপি আওয়ামী লীগের নেতাদের একসঙ্গে ডান্স ফ্লোরে নাচতে দেখেছি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে চেক করে দেখো।

– তোর কথা বিশ্বাস করা কঠিন কারণ নেতারা কি নাচতে জানে?

– আরে এটা কি সেরকম নাচ। দুই হাত উপরে তুইলা শরীর নাচায়।

– তবে একথা ঠিক যে, নেতাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আছে।

– আগেও ছিলো।

 

আট.

– ব্যাংককের পাতায়ার মতো নাকি বাংলাদেশেও আজকাল মেয়েরা আইয়া ধইরা নিতে চায়?

– কই? শুনি কিন্তু দেখি না তো।

– বাংলাদেশে অতোটা সম্ভব না।

– ইদানিং আমাকে ভিয়েতনাম যেতে হচ্ছে। সেখানেও একই অবস্থা। পাশে পাশে হাটে আর জিজ্ঞাসা করে, আর ইউ লুকিং সামথিং?

– বসুন্ধরা শপিং মলের বাইরে কিংবা এরকম জায়গাগুলোতেও জিজ্ঞাসা করে।

– আমারে তো জিগায় না। শুনছি বনানীর ফুটপাথেও জিগায়। কতোদিন বনানীর ফুটপাথ ধরে হাটছি। ভাবছি কোন সুন্দরী আইয়া কইবো, আর ইউ লুকিং ফর সামথিং? কিন্তু জিগাইলো না।

– তুমি তো মিয়া শর্ত দিয়া খুজতাছো। সুন্দরী হইতো হইবো। এইডা বাদ দিয়া খালি মাইয়া খুঁইজো তাইলে পাবা।

– আমার কাছে তো রাস্তা দিয়া হাইটা যাওয়া সবাইরে ভালো মনে হয়।

– তুমি নিজে ভালো তো সবাই ভালো।

 

নয়.

– চল বাইরে থেকে আমরা কয়জন সিগারেট খেয়ে আসি।

– দরকার নেই। এসি বন্ধ করে দিচ্ছি। এখানেই খাও।

– আমি সিগারেট নিয়ে ‍আসছি।

– তুই তো সিগারেট খাস না।

– খাই যখন একা থাকি। প্রায়ই কাজের জন্য চিটাগাং যেতে হয়। রাতে একা একা ভালো লাগে না। তখন সিগারেট খাই।

– এতোদিন শুনছি আড্ডায় খায়। তুই খাস একলা থাকলে।

– অন্য কিছু খাইলেই পারস।

 

দশ.

– ওই ব্যাটা দুইডা বিয়া করছে। ওর তো হেডম আছে। আমি এই কথাই এতোদিন তোমাগোরে কইতে চাইছি।

 

এগারো.

– ঢাকা শহরের রাস্তার অবস্থা দেখছোস।

– শোন রাস্তাঘাটে যে যেইভাবে পারে চলছে।

– এই দেশে কেউ নিয়ম মানে না। গাড়ি চালাইতে গেলে টের পাওয়া যায়।

– এই দেশে আইলে অন্য দেশের মানুষও নিয়ম মানে না।

– কেমন?

– শোন, আমার অফিস থেকে তো রাস্তা দেখা যায়। তো একদিন দেখি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে এক বিদেশী ছেলে দুই মেয়েকে বগলদাবা করে রাস্তা পার হচ্ছে। এদিকে গাড়ি চলছে। তারা চলন্ত গাড়ি মধ্যেই রাস্তা পার হচ্ছে। যেভাবে আমাদের লোকজন হয়।

 

বারো.

– দেশ ছেড়ে চলে যাবো কিনা ভাবছি। আমার অফিসের এমডি, ডিএমডিসহ সবাই বিদেশে পাসপোর্ট কইরা রাখছে।

– এই দেশের কাম কাজ জানা ৮০ ভাগ লোকের বিদেশী পাসপোর্ট আছে।

– আরে না।

– তুই ব্যাটা জানোস। আমাগো ওষুধ কোম্পানিগুলোর সব মালিক, বড় বড় অফিসার সবার বিদেশী পাসপোর্ট আছে। এর একটা ব্যাখ্যা তোরে দেই। আগে কি হইতো। গ্রামের ধনী লোকেরা ঢাকায় ঘরবাড়ি করতো। জমি কিনতো। আমার বাপেও করছে। এখন দেশের ধনী লোকেরা বিদেশে জমি কেনে। পাসপোর্ট নেয়।

– আমি এজন্যই সবসময় বলি বিদেশী পাসপোর্টধারীদের দিয়ে কখনো দেশের কল্যাণ হতে পারে না। কারণ বড় বিপদে তাদেরকে পাওয়া যাবে না।

– বিপদের কি দেখছো। আমরা সব ভাগছি। আর দেশ চালাতে দিচ্ছি সব বদগুলারে। আমার তো মনে হয় সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন একদল পোলাপান বাসায় গিয়া কইবো শোনেন, আপনার জন্য আর ভাবীর জন্য মাসে দেবেন ৩০০০ হাজার করে। আপনার প্রতিটা বাচ্চার জন্য ১০০০। আর কাজের মেয়ে ফ্রি।

 

তের.

– তাইলে কি নির্বাচন করা উচিৎ?

– কে নির্বাচন করবো? সহজ কাজ হইলো দেশ ছাড়া।

– নির্বাচনও তো একটা বাণিজ্য।

– এমপিরা সব করাপ্ট।

 

চৌদ্দ.

– তুমি তো ফেসবুকে অনেক কিছু লেখো। কিন্তু তুমি নেগেটিভ লিখো। সবসময় নিরাশার কথা বললে মানুষ হতাশ হয়ে যাবে।

– আমি যে আশার কথা লিখি সেগুলো কি তুমি দেখো না। তুমি তো জানো আমি দেশ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। আমি যা লিখি সেটা সতর্ক করার জন্য। কেন যে তোমাদের কাছে নেগেটিভ মনে হয়।

– তবে, কনজিউমার ভয়েসে কিউবি নিয়া যে লেখা হয়েছে এটা নিয়া আমি কিউবির আইটি হেডের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। ও বলল, রাত হলেই আনলিমিটেড ইউজাররা থ্রি এক্স ডাউনলোড করতে শুরু করে। ওরা একাউন্টগুলো চেক করে দেখেছে থ্রি এক্স ডাউনলোড করার সংখ্যাই বেশি।

– কে কি করবে সেটা তো ওদের দেখার দরকার নেই। ওদের কাজ হলো আনলিমিটেড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া।

– কিন্তু তাই বলে থ্রি এক্স বাচ্চারা ডাউনলোড করবে সেটা তো হতে পারে না।

– এখন আমি যদি বলি ৩০০ কোটি টাকা করে যখন কিউবি আর বাংলা লায়নকে লাইসেন্স দেওয়া হলো। তখনই আমি লিখেছিলাম এতো টাকা দিয়ে লাইসেন্স কেনার পর বাণিজ্য করতে হলে তরুণ বয়সীদের পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। কারণ বাংলাদেশে বাংলায় কনটেন্ট খুবই কম হওয়ার পাশাপাশি দরকারি কন্টেন্ট নেই। এখনতো বলবা নেগেটিভ লিখছি। কিন্তু এখন এর ব্যবহার নিয়ে তোমার বন্ধু আইটি হেড চিন্তিত। তার তো এটা চিন্তা করার দায়িত্ব কেউ দেয়নি। তার কাজ হলো আনলিমিটেড মানে আনলিমিটেড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। আর পর্ণোগ্রাফি বন্ধের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ দরকার।

– প্লেবয় ম্যাগাজিনে বাংলাদেশী জাজমিনের কাভার দেখছো?

– দেখছি।

– ভিডিও দেখছো?

– দেখছি।

– ওই মিয়া আমারে ভিডিওডা পাঠাইওতো।

– তোমারে লিঙ্ক পাঠাইয়া দিমুনে।

– ওরে লিঙ্ক পাঠাইলে তো খবর আছে। অফিসের পোলপান ডাইকা লিঙ্ক ডাউনলোড করতে হইবো।

– এই কমপিউটার জিনিসটা আমি শিখতে পারলাম না।

– শোনো হানিফ পরিবহনের হানিফ একবার আমারে কইলো, একজন লোক দিয়েন তো অফিসে কমপিউটার চালাইবো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কি ধরনের কাজ করবে? হানিফ কইলো, ভিডিও চালাইয়া দিবো। তো একবার তার অফিসে গেছি। রুমে কয়েকজন আগে থেকে ছিলো। হঠাৎ শুনি হানিফ সাহেব কইতেছে, ওর ঠ্যাং ভাইঙ্গা দে। দে দে। আমি বলি কি ব্যাপার। দেখি লাওয়ারিশ চলছে। ছবি দেইখা সে চিৎকার করতেছে।

 

পনর.

– চলো গ্রুপ ছবি তুলি।

– ছবি পাঠাতে ভুইলো না। আমার ই-মেইল রেখে দাও।

 

ষোল.

– ‍বুড়িগঙ্গার পানি তো চেনাই যায় না।

– বুড়িগঙ্গার পাড়ে গেলে তো বমি আসে।

– তোমার বাড়ি তো বুড়িগঙ্গার পাড়ে।

– সেখানে তো থাকি না।

– ছিলা তো।

– ছিলাম মানে। তখন তো সেখানেই বেড়াতাম।

 

আড্ডাটা হয়েছিল ২৬ তারিখ। শুক্রবার।

Advertisements

2 thoughts on “প্রাণতুনে ইফতার আড্ডায় NDC 864

  1. স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়, ছেলেবেলার হাসি ভরা দিনের… 🙂

    ভালো লাগলো জুয়েল ভাই… কবে দেশে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসবো কে জানে! হয়তো কপালেই নেই… ‘জীবন এত ছোট কেনে’… প্রিয়মুখগুলো কত দূরে! 😦

    প্রিয়বন্ধুরা ভালো থাকুক… আবারো ঈদের এক সন্ধ্যেয় আড্ডাতে বসুন এই কামনায়, ঈদ মুবারাক।

  2. আর হ্যাঁ… আবার যদি ফিরে যান নটরডেম এ, তবে বোরিং পড়াশোনায় হাঁপিয়ে উঠলে আমাদের ঢাকা কলেজের ছাদে চলে আসতে ভুলে যাবেন না… দোতালার কমনরুমের পাশ দিয়ে এগুলেই সামনে লোহার মই… বেয়ে উঠে পড়ুন… আমাদের রুফ-টপ কলেজে আপনি স্বাগতম… 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s