কিংবদন্তী স্টিভ জবস: জানা অজানা কথা——পর্ব-১


২০০৮-এ ইন্টারনেটে নিজের মৃত্যু সংবাদ পান স্টিভ জবস

খেপুপাড়ার এক লোক তার জীবদ্দশায় ১৮টি গরু জবাই করে চল্লিশা খাইয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ছিল, তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলেমেয়েরা চল্লিশা (মৃত মুসলমানের রূহের সদগতির জন্য মৃত্যুর চল্লিশতম দিনে করণীয় অনুষ্ঠান, যা চেহলাম নামেও পরিচিত) পালন করবে না।

কিন্তু ২০০৮ সালের ২৭ আগস্ট নিজের মৃত্যুসংবাদ স্টিভ জবস নিজে ছড়াননি! ছড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ব্ল‍ুমবার্গ ফিনানশিয়াল নিউজওয়ার। তবে ভুলক্রমে। আর সেই ঘটনায় এপলের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছিল। সন্দেহপ্রবণ মানুষ পরবর্তীতে জানার চেষ্টা করেছে কার লাভের জন্য এই কাণ্ড ঘটেছিল? অনেকে এটাকে নিছকই দুর্ঘটনা বলে মেনে নিয়েছে।

ঘটনাটি ছিল এমন- ২৭ আগস্ট ২০০৮ তারিখ বেলা ৪:২৭ মিনিটে ব্ল‍ুমবার্গ ফিনানশিয়াল নিউজওয়ারের অনলাইন গ্রাহকরা একটি ১৭ পৃষ্ঠার অবিচুয়ারি বা শোকসংবাদসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি পান। যেখানে স্টিভ জবসের মৃত্যু সংবাদ লেখা ছিল। কিভাবে এমনটা হলো সেকথা জানা যায়নি। তবে সংবাদপত্র এবং মিডিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের উপর মৃত্যুসংবাদ তৈরি করে তা নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করে যাতে করে দরকারের সময় দ্রুততম সময়ে প্রকাশ করা যায়।

ভুলক্রমে পাঠানো সংবাদটির ব্যাপারে ব্ল‍ুমবার্গ থেকে এক সংশোধনী দেওয়া হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ব্ল‍ুমবার্গ নিউজ থেকে এপল সংক্রান্ত একটি অসম্পূর্ণ সংবাদ নিউ ইয়র্কের সময় অনুযায়ী বেলা ৪:২৭ মিনিটে আজ (২৭ আগস্ট) অসাবধানতাবশত প্রকাশ করা হয়েছে। এটি প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত করা হয়নি এবং এটি প্রত্যাহার করা হলো।

কিন্তু ততোক্ষণে এটি ব্ল‍ুমবার্গের গ্রাহক মারফত নেটে নেটে আরো অনেকের কাছে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যার মৃত্যু সংবাদ সেই স্টিভ জবসও এটি তার কমপিউটারে পড়েছেন। তিনিই প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অন্যতম সেরা করপোরেট ব্যক্তিত্ব যে কিনা নিজের মৃত্যুসংবাদ পড়তে পেরেছেন। তাও আবার এক দুই পৃষ্ঠার মৃত্যুসংবাদ নয়। রীতিমতো ১৭ পৃষ্ঠার। তাতে ২৫০০ শব্দ ছিলো। তাও আবার সম্পূর্ণ নয়। সেখানে অনেকের ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। আর শিরোণামের ঠিক নিচেই লেখা ছিল, ‘হোল্ড ফর রিলিজ’- ‘ডু নট ইউজ’। কিন্তু তা কেউ মানেনি। অন্যরা ইন্টারনেট থেকে স্টিভ জবসের মৃত্যুর তাজা খবরটি পরিচিতজনকে পাঠাতে শুরু করে। ঘটনা সত্যি কিনা সেকথা জানতে অনেক পাঠক আবার ব্ল‍ুমবার্গ নিউজ এজেন্সিতে ফোন করেছিল। প্রথমেই যারা ফোন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্টিভ জবসের প্রাক্তন বান্ধবী হেইডি রোজেন। স্টিভ জবসের চেয়ে তিন বছরের ছোট রোজেন নানানভাবে এপলের সঙ্গে বিভিন্নসময়ে যুক্ত ছিলেন। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রী এবং পরবর্তীতে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট স্কুল অব বিজনেস থেকে এমবিএ করেন। আর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্টিভ জবসের দেওয়া বক্তৃতাটি খুবই বিখ্যাত। (এবিষয়ে বিস্তারিত অন্য পর্বে লেখা হবে)।

এদিকে স্টিভের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ামাত্র এপলের শেয়ার বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করে। প্রশ্ন হলো মানুষ কেন বিশ্বাস করেছিল যে তিনি মারা গেছেন? তার কারণ অনেকেই জানেন যে, ২০০৪ সাল থেকে স্টিভ জবস অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগছেন।

এবার ছয় সপ্তাহ পরে মারা যাওয়ার ভবিষ্যতবাণী

ভুলক্রমে মৃত্যুসংবাদ প্রচারের ৩ বছর পর ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডাক্তাররা বলে দিলো তিনি মাত্র ছয় সপ্তাহ বাঁচবেন। এই সংবাদও তার মৃত্যু সংবাদের মতোই ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেটে। খবরটা পড়ার পর আমার মনে পড়ে গিয়েছিল আমার দাদীর কথা। যিনি বড় জোর একবছর বাঁচবেন বলেছিলেন আমাদের এক জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার। দাদীকে তখন ঢাকা থেকে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাতলা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, দাদা বাড়িতে। ওখানে তিনি বেঁচে ছিলেন সম্ভবত আরো ৮ বছর। বাংলাদেশের শুধু নয়, ভুল করেন মার্কিন ডাক্তাররাও। তাইতো সকল শঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করে স্টিভ জবস আজও বেঁচে আছেন।

কিন্তু তিনি ভালো নেই। তার শরীর গত কয়েকবছর ধরেই ভালো যাচ্ছে না। আর তাইতো গত ২৪ আগস্ট তিনি এপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আর এটাই এখন টেক বিশ্বে সবচেয়ে বড় খবর।

পল্লবী। ঢাকা। ৩০ আগস্ট ২০১১।

পরের পর্বে- ভারতে স্টিভ জবস

(এই লেখাটি সেই ১৭ জনের উদ্দেশ্যে উসর্গ করছি যারা ২৫ আগস্ট ফেসবুকে আমার স্ট্যাটাস পড়ে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তারা হলেন (আগ্রহ প্রকাশের ক্রমানুসারে): আহমেদ নকিবুল আরেফিন; মাহে আলম খান; ফারজানা মিতু; মীর শাহেদ আলী; মোঃ শামিউল ইসলাম; মিজান করিম; মাজাদুল মুর্শেদ; ‍মাহিব করিম; সৈকত কুমার পোদ্দার, মুশতাক আহমেদ; মোঃ তাহজিব উল আরিফ; সাজ্জাদ হুসেইন; তাসনীম হোসেন; রিমঝিম বৃষ্টি; মোঃ মফিজুল ইসলাম; আবদুল্লাহ আল শাফি; এবং এনকোডেড সাইলেন্স।

কারো নামের বাংলা বানান ভুল লিখলে অনুগ্রহপূর্বক সংশোধনী জানাবেন।

আমি স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম- ‘স্টিভ জবসকে নিয়ে নব্বইয়ের দশকে কয়েকটা পত্রিকায় লিখেছিলাম। এখন খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে নিয়ে এখন আরেকটা লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি। পাঠক আছে কিনা জানা দরকার! হাত তুলুন!! যারা স্টিভ জবসকে চেনেন না, তাদের জন্য বলছি এপল, ম্যাকবুক, ম্যাক এয়ার, আইপড, আইপ্যাড, আইফোন এসবই তার ক্রিয়েশন! আর এনিমেশন মুভির জনকও তিনি। এবার হাত তুলুন!!’)

Advertisements

3 thoughts on “কিংবদন্তী স্টিভ জবস: জানা অজানা কথা——পর্ব-১

  1. একসময় iPhone এর এপ্লিকেশন বানাতাম, তাই হয়তো এই মানুষটাকে আরো বেশী ভালো লাগে। লেখা ভালো হয়েছে। দয়া করে আপনার কাছে যা তথ্য আছে, সব শেয়ার করেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s