অঙ্গীকার রাখেনি আওয়ামী লীগ


বাংলাদেশে  ঘুরে গেলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং৷ সেসময়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ওয়েবসাইট (http://pmindia.nic.in/) দেখছিলাম৷ সেখানে বা দিকের প্যানেলে ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ শিরোণামে একটি বোতাম আছে৷ ওই বোতাম চেপে এমন এক পাতায় গেলাম যেখানে জনগণের তথ্য অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে একসময় গোপনীয় ভাবা হতো এমন সব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ এখানেই পেলাম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের সম্পদের হিসাব৷

সহজ নিচ্ছিদ্র ফরমেট

মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের জন্য একটি সহজ সরল ফরমেট তারা ব্যবহার করেছে৷ এক নজরেই সবকিছু জানা যায়৷ সম্পদকে তারা দুই ভাগে ভাগ করেছে- স্থাবর  ও অস্থাবর সম্পত্তি৷ প্রতিটি ভাগকে তারা এমনভাবে সাজিয়েছে যে ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই৷ যেমন: স্থাবর সম্পত্তির হিসেবের মধ্যে চার ধরনের সম্পত্তির হিসেবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ কৃষি জমি, অকৃষি জমি, দালানকোঠা (বাণিজ্যিক ও আবাসিক) এবং ঘরবাড়ি/এপার্টমেন্ট৷ প্রতিটি স্থাবর সম্পত্তি সম্পর্কে কতগুলো তথ্য দেওয়া হয়েছে যেমন, কোন এলাকায় অবস্থিত, সরকারি নথিপত্রে কি ধরনের তথ্য উল্লেখ আছে৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্পদের মূল্য লেখার সময় অর্জনের বছর, ক্রয়কালীন মূল্য ও বর্তমান বাজারদর উল্লেখের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷ ফলে ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ থাকছে না৷ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে৷

প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের  ৩১ মার্চ ২০১১ তারিখের সম্পদের হিসাব থেকে দেখা যায় চন্ডিগড়ে তার একটি আবাসিক বাড়ি রয়েছে৷ সরকারি ন িথতে যার উল্লেখ আছে- বাড়ি নং ৭২৭, প্লট নং, পি-১, সেক্টর ১১-বি, চন্ডিগড়৷ প্লটের আয়তন হলো ৪,৪৯৮.৫ বর্গফুট৷ যেখানে একটি দোতলা ভবন আছে যার মোট মেঝের পরিমাণ ২,৯০৯.৯৬ বর্গফুট৷ প্লটটি কেনার সময় জমিতে একতলা ভবন ছিল৷ একতলা ভবনসহ প্লটটি ১৯৮৭ সালে ৮,৬২,০০০ রুপিতে কেনা হয়েছিল৷ পরবর্তীতে ১৯৯৭-৯৮ সালে ৮,৪৫,০০০ রুপি খরচ করে দোতলা নির্মাণ করা হয়েছিল৷ তাহলে বাড়ি অর্জনের মোট মূল্য হয় ১৭,০৭,০০০ রুপি৷ বর্তমানে এই প্লটের বাজারদর হলো আনুমানিক ৯০,০০,০০০ রুপি৷

একইভাবে তার আবাসিক এপার্টমেন্টের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে৷ নয়া িদল্লী-১১০০৭০-র বসন্তকুঞ্জে অবস্থিত ফ্লাটটি সম্পর্কে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে নং ৫০৮৬, ২য় তলা, পকেট- বি৭, বসন্তকুঞ্জ৷ আয়তন- ১১৩.৬২ বর্গমিটার৷ কেনা হয়েছে ১৯৯১ সালে৷ মূল্য ৪,১৮,১০০ রুপি৷ ১৯৯৩ সালে দিল্লী ডেভেলপমেন্ট অথরিটিকে ৩০ হাজার রুপি ফি প্রদান সাপেক্ষে এটাকে লিজহোল্ড ক্যাটাগরি থেকে ফ্রিহোল্ড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়৷ এরপরপর বাড়িতে কাঠের কাজের জন্য ৫০,০০০ রুপি খরচ করা হয়৷ তাহলে বাড়ি অর্জনে মোট খরচ হলো ৪,৯৮,১০০ রুপি৷ বর্তমানে এর আনুমানিক মূল্য  ৮৮,৬৭,০০০ রুপি৷

অস্থাবর সম্পদের হিসাবও পূর্ণাঙ্গ

অস্থাবর সম্পদের হিসাব প্রদানের ফরমেটের শুরুতেই রয়েছে নগদ অর্থ৷ যেমন মনমোহন সিংয়ের নগদ অর্থের পরিমাণ ১৫,০০০ রুপি৷ তারপর রয়েছে ব্যাংক, আ ির্থক প্রতিষ্ঠান কিংবা নন-ব্যাংকিং ফিনানসিয়াল কোম্পানিতে ডিপোজিট৷ এক্ষেত্রেও বিস্তারিত উল্লেখ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷ যেমন- মনমোহন সিংয়ের স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটে দুটি সঞ্চয়ী হিসেবে যথাক্রমে ১১,৩৯,৮৮৯.১৪ ও ৬,৪৬,২৯৩.১৬ রুপি জমা রয়েছে৷ এছাড়াও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার পার্লামেন্ট হাউজ শাখার একটি সঞ্চয়ী হিসেবে জমা আছে ৮,৩৮,৮৬৮.৫০ রুপি৷ এছাড়াও তার স্ত্রীর নামে চন্ডিগড়ের স্টেট ব্যাংক অফ পাতিয়ালাতে জমা আছে ১১,০৭,০৫৭.২৩ রুপি৷ নিজের নামে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার  গুয়াটির দিশপুর শাখায় নিজ নামে জমা আছে ৬,৫১৫.৭৮ রুপি৷

তার বেশ কয়েকটি টার্ম ডিপোজিট রয়েছে৷ টার্ম ডিপোজিটের ক্ষেত্রে কবে সেগুলোর মেয়াদ পূর্তি হবে এবং মেয়াদ পূর্তিতে কতো রুপি পাওয়া যাবে সেকথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ যেমন: নয়া িদল্লীর স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটে ৪৯,৫৪,৮৪৯ রুপির টার্ম ডিপোজিটের মেয়াদ পূর্তি হবে ৯.১২.২০১৩ সালে৷ তখন তিনি পাবেন ৬৪,৪৭,১৯৪ রুপি৷ আরেকটি ৩০ লাখ রুপির টার্ম ডিপোজিট ২০১১ সালের ১৭ নভেম্বর মেয়াদ পূর্তিতে পাবেন ৩৮,৮১,৫৫৬ রুপি৷ ৮০ লাখ রুপির অন্য আরেকটি টার্ম ডিপোজিটের মেয়াদ পূর্তি হবে ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে৷ তিনি পাবেন ৯৮,৫১,৫১৫ রুপি৷ একই তারিখে তিনি আরেকটি ৯০ লাখ রুপির টার্ম ডিপোজিটের বিপরীতে পাবেন ১ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ রুপি৷ ৩৫ লাখ রুপির অন্য আরেকটি টার্ম ডিপোজিট থেকে ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ পাবেন ৪৩,১০,০৩৮ রুপি৷ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কোন বন্ড, ডিবেঞ্চার বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ নেই৷ পোস্ট অফিসে একটি একাউন্ট আছে যেখানে তার জমা আছে ৭,১৫,৫৬৩ রুপি৷

অস্থাবর সম্পত্তির ফরমেটে ৫ নাম্বারে গাড়ির কথা উল্লেখ করতে বলা হয়েছে৷ সেখানে গাড়ির বিস্তারিত বর্ণনা, ক্রয়কালীন মূল্য এবং বর্তমান মূল্য উল্লেখ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷ মনমোহন সিং ১৯৯৬ সালে একটি মারুতি ৮০০ গাড়ি কিনেছেন যার প্রস্তুতকাল ১৯৯৬৷ ক্রয়কালীন এর মূল্য ছিল ২,৪০,৭৮৭ রুপি৷ ব্যবহারের ফলে অবচয়জনিতকারণে বর্তমানে যার বাজারদর আনুমানিক ২৪,৭৪৫ রুপি৷ এরপর জুয়েলারির হিসেব থেকে জানা যায় মনমোহন সিং ১৫০.৮ গ্রাম স্বর্ণালংকারের মালিক যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২,৭৫ হাজার রুপি৷ অস্থাবর সম্পত্তি হিসেব প্রদানের ফরমেটে সর্বশেষে রয়েছে অন্যান্য সম্পদ৷ এখানে মনমোহনের কিছুই নেই৷

আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার রাখেনি

অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন যে, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে পেশ করা হয়েছিল সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্যগণ শুধু নন, সংসদ সদস্যসহ ক্ষমতাধর সকলের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ প্রকাশের অঙ্গীকার করা হয়েছিল৷ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ এর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাঁচটি বিষরে মধ্যে দু’ িট েসম্পদের বিবরণী প্রকাশের অঙ্গীকার করা হয়েছিল৷ যার একটি হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে এবং অন্যটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে৷ নিচে লক্ষ্য করুন:

. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা : দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শ িক্তশালী করা হবে৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে৷ মতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে৷ রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁ দাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশীশ িক্ত প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে৷ প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে৷ সরকারি কর্মকান্ডের ব্যাপকভাবে ক িম্পউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে৷”

. সুশাসন প্রতিষ্ঠা :

৫.৩ নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে৷ জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাব িদহিতা নিশ্চিত করা হবে৷ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব আয়ের উত্স প্রতিবছর জনসম প্রকাশ করা হবে৷ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার দেয়া হবে৷”

কিন্তু সেই অঙ্গীকার বিগত প্রায় তিন বছরে আওয়ামী লীগ থেকে পালন করার কোন উদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করছি না৷ একথা কে না জানে যে, বিএনপি সরকারের কতিপয় নেতানেত্রীর সীমাহীন দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থ আয়ের মহড়ায় জনগণ ঘৃণাভরে তাদেরকে প্রত্যাখান করেছিল এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছিল৷ সেসময়ে জনগণ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি আস্থা রেখেছিল৷ এখন আমরা দেখছি যে, আওয়ামী লীগ তাদের বড় দুই অঙ্গীকার ‘দুর্নীতিরবিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা’ থেকে সরে আসছে৷ জনগণের দুভার্গ্য হলো তারা শুধুমাত্র প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একবার করে মতামত জানানোর সুযোগ পায়৷ তারা এই সুযোগ যদি প্রতিবছর পেতো তাহলে হয়তো আওয়ামী লীগকে আজই বিদায় নিতে হতো৷ কারণ অঙ্গীকার ভঙ্গকারীদের ক্ষমার ইতিহাস এই জাতির নেই৷

পল্লবী৷ ঢাকা৷ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১

Advertisements

One thought on “অঙ্গীকার রাখেনি আওয়ামী লীগ

  1. সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার দেয়া হয়েছিলো, তার বাজারমূল্য বোধহয় এখন শূণ্য, অথবা মাইনাস… তাই আর কি … 😦

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s