নিজে মানলে অন্যদের মানার সম্ভাবনা বাড়ে


ডার্ক চকোলেট কালারের বিশাল পাজেরো৷ টিনটেড গ্লাস৷ মিরপুর ১০ নাম্বার গোল চক্করের একটু সামনে মিনাবাজারের উল্টো িদকের রাস্তায় পার্কিং করা গাড়িটি রাস্তাতে একটি দ্বিতীয় সারি তৈরি করেছে৷ ফলে রাস্তায় চলাচলরত পিছনের গাড়িগুলোর চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ গাড়িটির সামনের গ্লাসে সংসদ সদস্যর গোল বড় সাইজের স্টিকার লাগানো৷ গাড়ির ভেতরে কেউ আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করলাম৷ কিন্তু টিনটেড গ্লাস হওয়ায় ভেতরে কেউ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না৷ আবছাভাবে ড্রাইভারকে দেখা যাচ্ছে৷ ড্রাইভারের বা দিকের সিটে কেউ নেই৷ সবগুলো কাচ উঠানো৷ ড্রাইভারের দরজার কাচে টোকা দিলাম৷ কাচ নামলো৷ এসির ঠাণ্ডা বাতাস নাকেচোখে মুখে লাগলো৷ তবে, মনে হলো ভেতরে কেউ নেই৷ হয়তো কাছেই কোথাও গিয়েছে; কে জানে? ড্রাইভারের মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন! মাঝারি বয়স৷ হলুদ স্ট্রাইপ টি শার্ট পরা৷ আমি আস্তে করে বললাম, আপনি এভাবে গাড়ি রেখেছেন এতে তো সংসদ সদস্যের অমর্যাদা হচ্ছে৷ তাকে সবাই গালি দিচ্ছে৷ তিনি কাচ উঠিয়ে গাড়ি নিয়ে সরে গেলেন৷ বেশ কিছুটা সামনে গিয়ে বা দিকের প্রথম সারিতে গাড়ি পার্ক করলেন৷ মনে হলো, সুন্দর করে বললে মানুষ শোনে৷ বললে কাজ হয়৷ আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো৷ একবার মনে হলো হেটে গিয়ে গাড়ির চালককে ধন্যবাদ জানিয়ে আসি৷ কিন্তু মনে পড়ে গেলো সেই ভারতীয় বাংলা সিনেমার কথা৷

সিনেমার নামটি এখন মনে নেই৷ সেখানের দৃশ্যটা ছিল এমন- নাতনি অনেক উত্তেজিত হয়ে দাদীকে বলছে কিভাবে এক ছেলে আজকে তাকে অনেকগুলো বদমাস ছেলের হাত থেকে রক্ষা করেছে৷ সে আরো জানালো যে, সে ওই ছেলেকে বাসায় দাওয়াত দিতে চায়৷ তাকে ধন্যবাদ জানাতে চায়৷ কৃতজ্ঞতা জানাতে চায়৷ সে এতো কথা বলছে কিন্তু দাদীর কোন প্রতিক্রিয়া নেই৷ সে নিবিষ্ট মনে উলের কাটা দিয়ে উলের জিনিস বুনছেন৷ মেয়েটির উচ্ছ্বাস যখন কিছুটা কমে এলো৷ অনেকক্ষণ পর দাদী বললেন, ওই ছেলেটি যা করেছে সেটা তো স্বাভাবিক এক ঘটনা এতে এতো উচ্ছ্বসিত হওয়ার কি আছে? আর ছেলেটিকে ধন্যবাদ দেওয়ারই বা কি আছে? সেতো তার দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র৷ রাস্তায় এমন ঘটনা দেখলে সেওতো একই কাজ করতেন৷ নাতনির চেহারা তখন দেখার মতো হয়েছে!

আসলে আমাদের সমাজে (কোলকাতার সমাজও অনেকটা আমাদের কাছাকাছিই) স্বাভাবিক ঘটনাগুলো এখন আর স্বাভাবিকভাবে হয় না বলে আমরা স্বাভাবিক কিছু হতে দেখি তখন সেটাকে স্বাভাবিক মনে নিতে পারি না৷ অকারণেই খুশি হয়ে উঠি৷ কৃতজ্ঞ হয়ে যাই৷

সেদিন শাহবাগে বিআরটিসির লাইনটা এমনভাবে দাড়ানো যে রাস্তায় বেশ কিছুটা অংশ মানুষের দীর্ঘ লাইনের দখলে৷ সেই লাইনের পিছনে আমিও গিয়ে দাড়ালাম৷ তারপর একপর্যায়ে ওয়াকিটকি হাতের টিকেট চেকারকে হাতের ইশারায় ডেকে বললাম লাইনটা আরো পাশে সরিয়ে দিলে তো রাস্তায় চলাচলরত গাড়িগুলো সহজে যেতে পারে৷ তিনি শুনলেন৷ তার কথা লাইনের সবাই শুনলো৷

আমার মনে হলো, আমরা হয়তো নিয়ম মানতেই চাই৷ কিন্তু কখনো কখনো নিয়ম মানতে ভুলে যাই৷ আর ভুলে যাই যখন তখন কেউ য িদ স্বেচ্ছায় সেটা মনে করিয়ে দেয় তখন সেটা মানার সম্ভাবনা বেড়ে যায়৷ তবে মানার ঘটনাটি বেশি ঘটে যখন যিনি বলছেন তিনি নিজে সেই নিয়ম মানেন৷ আমাদের দেশে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত অনেক নির্দেশ দেন যে নির্দেশ বাস্তবায়ন হয় না৷ পত্রিকাতে এই ধরনের সংবাদ প্রায়ই পড়ি৷ কেন হয় না সেনিয়ে চিন্তা করে আমার মনে হয়েছে, একটি অন্যতম প্রধান কারণ বোধহয় এই যে, যারা নির্দেশ পালন করবেন তারা কোন না কোনভাবে বুঝতে পেরেছেন যে যারা নির্দেশ দিচ্ছেন তারা নিজেরা ওই কাজটি করছেন না৷ অর্থাত্ তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না৷ সেকারণে তাদের নির্দেশ পালনে অন্যদের এতো অনীহা৷

এই কলামে ‘অবৈধ আয়ে জনকল্যাণ’ শিরোণা েএকটি লেখা ছাপা হয়েছিল গতমাসে৷ মনে আছে সেখানে আমার এক বন্ধুর কারখানায় বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকার কথা লিখেছিলাম৷ গত শুক্রবার খেপুপাড়া কল্যাণ সমিতির সভায় তার সঙ্গে দেখা হয়েছে৷ আমার এই লেখাটাকে সে খুশি মনে নিতে পারেনি৷ আমি তাকে বুঝালাম, এখানে সে একটি প্রতীকমাত্র৷ আমি আসলে একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছি৷ সে উদাহরণমাত্র৷ তখন সে আমাকে বলল, তার কারখানার মোট জমির যে আয়তন সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতি বসাতে চাইলেও বসানোর মতো জায়গা নেই৷ মনে হলো, বন্ধু হিসেবে আমার এই উচ্চকিত কণ্ঠ তাকে শুধু যে বিব্রত করছে তা নয় সে বিষয়টি নিয়ে ভাবছে৷ তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুন্দর মনের মানুষটি বের হয়ে আসছে৷ আমার ভালো লাগলো৷ আমি তাকে বললাম, ‘তুই য িদ জায়গা না পাবি তাহলে কারখানাটাই ওখানে করতি না৷ তোকে তো কেউ জোর করেনি যে, এখানে কারখানা করো৷ তোর তো উচিত্ ছিলো একটি পরিবেশ বান্ধব, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হবে না, এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করে তবেই না কারখানা করা৷ সে নিজের পক্ষে যু িক্ত দিয়ে বলল, আমাকে তো সবাই অনুমতি দিয়েছে৷ তাছাড়া ওখানে কারখানা না করলে আমার তো বউ বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হতো৷ আমি তখন তাকে বললাম, আল্লাহ তোকে যা দিয়েছে তাতে এই কারখানা না হলেও তোর চলতো৷ তবে, হ্যা যারা তোকে অনুমতি দিয়েছে তারা অন্যায় করেছে৷ আর এই অন্যায়ের তুইও অংশ৷ তুই কিন্তু তাদেরকে অর্থ দিয়েছিস৷ যেটা তোর দেওয়ার কথা নয়৷ এরপর আমি আরো কিছু কথা বললাম৷ নিজের কথা বললাম৷ কারণ, তাকে এটা জানানো দরকার যে আমি তাকে যে বলছি সেটা আমি বলার অধিকার রাখি যেহেতু আমি নিজে চর্চা করি৷ তখন ঘটল মজার ঘটনা৷ ওখানে আরো কয়েকজন ছিলেন৷ তাদের একজন বললেন, ‘আপনি যা করছেন সেটা নরমাল না এক্সসেপশনাল৷ আর এক্সসেপশনাল কখনো উদাহরণ হতে পারে না৷’

অথচ আমি আমার জীব েযা কিছু করছি সেটা এক্সসেপশনাল হওয়ার জন্য করছি না৷ সেটা করছি সাধারণ ঘটনা হিসেবে৷ সকল ধর্ম এই শিক্ষা দিয়েছে৷ ছোটবেলা যে আদর্শলিপি পড়েছি সেখানেও এই শিক্ষার কথা বলা হয়েছে৷ আমার বাবাকে ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত এভাবেই জীবনযাপন করতে দেখেছি৷ দেশের আইনও এই শিক্ষার পক্ষে৷ তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কেন কিভাবে সাধারণ ঘটনাগুলো ব্যতিক্রম ঘটনায় পরিণত হলো আর যা হওয়ার কথা ব্যতিক্রম সেটাই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হলো সেটা আমাদের জানা দরকার? এজন্য কে বা কারা দায়ী সেটা নিয়ে আমাদের এখন ভাবতে হবে৷

ঢাকার ফার্মগেট এলাকা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করেন৷ কিন্তু তিনি কি জাতির উদ্দেশ্যে যে কথা বলেন সেটা ব্য িক্ত জীবনে পালন করেন? সন্দেহ প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে৷ তিনি যে বাড়িতে থাকেন সেই ফ্লাট বাড়ির তিনি হলেন মালিক সমিতির সভাপতি৷ গত দুই বছর ধরে তিনি নাকি একটি মিটিং ডাকতে পারেননি৷ অথচ ওই ফ্লাট বাড়িতে কিছু না কিছু বিষয় থাকে যেগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার৷ তাকে বলেও মিটিং ডাকানো যাচ্ছে না৷ ঈদের পরের িদন তার সমিতির একজন সদস্য আমার বাড়িতে বেড়াতে এসে এভাবেই বললেন৷ তিনি কথা শেষ করলেন এভাবে, ‘তিনি য িদ সভাপতির দায়িত্ব পালন না করতে পারেন দায়িত্বটি ছেড়ে দিলেই পারেন৷’ খুবই ন্যায্য কথা৷ কিন্তু  এই ন্যায্য কথাটি জাতির বিবেক না েপরিচিত ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদককে কে বোঝাবে?

তবে আমরা নিশ্চয়ই হতাশ হবো না৷ কারণ পরিবর্তন এক িদন আসবেই৷ আর সেই পরিবর্তনের কান্ডারি হবেন যারা শুধু অন্যকে বলেন না নিজেরাও চর্চা করেন৷

গুলশান-২৷ ঢাকা৷ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s