জন্মদিনে কয়েক লাইন


বিভক্তির রাজনীতির প্রশ্নে আজকে দেশে যদি গণভোট হয় তাহলে আমি বাজি ধরে বলতে পারি মানুষ ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেবে। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি পছন্দ করে না। এই দেশের সাধারণ মানুষ কতোটা মানবতাবাদী, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

আমরা ৭০ এর প্রলংয়করী ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে সর্বশেষ সিডর আইলাতে দেখেছি মানুষের প্রয়োজনে মানুষকে পাশে দাঁড়াতে। এটি এমন একটি দেশ যেই দেশের মানুষ বিদেশে রক্ত ঘাম ঝরিয়ে অর্থ উপার্জন করে দেশে বাবা-মা এবং ভাইবোনদের ভরণপোষণ করে। তারা পশ্চিমা সমাজের মতো মুখ ফিরিয়ে নেয় না।

এটি এমন একটি দেশ যেই দেশের সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র নানানভাবে পদে পদে বাধা সৃষ্টির পরও ব্যক্তি মানুষ উদ্যোগী হয়ে নিজের, পরিবারের ও সমাজের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। এই দেশের মানুষ বিদেশেও নিজেদের সততা ও কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতাকে প্রমাণ করতে পেরেছে।

সকল ভালোর মধ্যে খারাপ থাকে। বাংলাদেশেও কিছু খারাপ ও দুষ্ট মানুষ আছে। এরা সকল পেশা ও কাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। এদেরকে দমন করা গেলে বাংলাদেশ সোনার বাংলাদেশ হতে পারে। কিন্তু মুশকিল হলো, এরা সংখ্যায় কম হলেও ক্ষমতার বিচারে এরাই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সকল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বসে আছে। তার উপর এরা একাধিক রক্ষাব্যুহ তৈরি করেছে। যারা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা দেখবেন বেশিরভাগ ক্যান্টনমেন্টের চারদিকে পরিখা খনন করা আছে। দুষ্ট চক্রের চারিদিকে একাধিক পরিখা আছে। তবে সেগুলো হলো মানববেষ্টনি। দুষ্টচক্রকে ঘিরে কয়েক প্রস্থ বেষ্টনি আছে যা ভেদ করে সত্য প্রতিষ্ঠা করা বেশ দুরূহ। কিন্তু অসম্ভব নয়।

এই দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় হলেও প্রয়োজনে লড়াই করার হিম্মত রাখে। সেই প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় বহুবার লেখা হয়েছে। ৭১ এ আমরা দেখেছি কিভাবে বাংলাদেশের মানুষ দেশকে স্বাধীন করেছে। এখন সেই স্বাধীন দেশে আবারো লড়াই করতে হবে, রক্তপাত হবে সেটা কোনমতেই কাম্য হতে পারে না। একাত্তরে আমরা পাকিস্তানীদের হটিয়েছে। একটি স্বাধীন ভূখন্ড পেয়েছি। যে ভূখন্ডকে সোনার বাংলাদেশ করার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সেই ডাকে আমরা সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে আমরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছি।

বিদেশী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার দিকে না গিয়ে আমরা লক্ষ্য করি পরবর্তীতে দেশ পরিচালকগণ বিদেশী শক্তির পুজারী হয়ে ‍উঠে। আমরা দেশ পুনর্গঠনে আত্মশক্তিতে বলীয়ান না হয়ে বরং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিদেশী দাতাগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের মাটিতে বিকশিত হতে দিয়েছি। আমরা কথায় কথায় বিদেশী দূতাবাসগুলোর কাছে ছুটে গিয়েছি। আমরা জনগণের শক্তিকে বিকশিত না করে বরং ব্রিটিশ উপনিবেশিক কায়দায় প্রশাসনকে জনপ্রতিনিধিদের উপরে ছড়ি ঘোরানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এদিকে প্রশাসনের সেই কর্তাব্যক্তিরা সামান্য বিদেশ ভ্রমণ, সন্তানদের বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করানোর খরচ আর দামী গাড়িতে চড়ার বিনিময়ে বিদেশীদের হুকুমকেই নিজেদের হুকুম হিসেবে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে লাগল। ধীরে ধীরে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠল এই স্বাধীন দেশে।

আমরা সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের নদীগুলোকে হত্যা করলাম। আমরা চলাচলের জন্য নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী খননের উপর জোর না দিয়ে সড়ক যোগাযোগের উপর বেশি জোর দিলাম। আমরা রেলওয়ের উপরও জোর কমিয়ে দিলাম। আমরা জনপ্রতিনিধিদের অকর্মণ্য প্রমাণ করতে দাতাগোষ্ঠীর উৎসাহে এনজিওদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতায়ন কর্মসূচি দেশে নিয়ে এলাম। আর এভাবে জনপ্রশাসন-জনপ্রতিনিধি-নাগরিক সমাজ-রাজনীতিবিদদের একে অন্যের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিলাম। এই প্রতিপক্ষ-প্রতিপক্ষ লড়াই যেন টিকে থাকে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতি জোরদার করা হলো দাতা গোষ্ঠীর মদদে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যাতে লেখাপড়া না করিয়ে বরং কনসালটেন্সি করে সময় কাটায় সেজন্য তাদেরকে দাতা গোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োগ করার ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এভাবে শিক্ষার প্রতিটি অংশে সুবিধাভোগী একটি দল তৈরির মাধ্যমে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পর সেটাকে পুনর্গঠনে দাতাগোষ্ঠী অর্থায়ন করতে লাগল। এটা গুরু মেরে জুতা দান হলেও এনিয়ে কেউ কথা বললো না। কারণ যারা কথা বলবে তাদেরকে বিভিন্নভাবে নিস্ক্রিয় করা হয়েছে। লোভের এক ফাঁদ থেকে বাম পন্থীরাও রেহাই পেলো না। ধ্বংসের মদের আসরে ডান আর বাম সবাই যেন একাকার। বুদ্ধি চর্চার কেন্দ্রগুলো যাদের দখলে তারাও নাম লেখালো সেই খাতায় যে খাতায় আগেই নাম  লিখিয়েছে জনপ্রশাসন-রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের অসৎ অংশটি।

শ্যাওলা জমতে জমতে পাথর হয়েছে। এখন পাথর না সরালে একসময় পাহাড় হবে।

আজকে আমার জন্মদিন। জন্মদিনে আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব আমার বাবা আবদুল হামিদ মুন্সীকে। তিনি আমাকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বলেছিলেন, সত্য কথা বলবে (জীবনের ঝুঁকি ছাড়া); কথা দিলে কথা রাখবে (না রাখতে পারলে জানিয়ে দেবে); আইন মেনে চলবে (আইন পরিবর্তন না করতে পারা পর্যন্ত)। তারপর তিনি বেঁচে ছিলেন যতোদিন আমি দেখেছি তিনি নিজের জীবনে এই নীতি মেনে চলেছেন। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঠিকাদারী ব্যবসায় সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যবসা করে এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও যে সত্য কথা বলা যায়, কথা দিলে কথা রাখা যায় এবং আইন মেনে চলা যায় আমার বাবা সেকথা নিজের জীবনে প্রমাণ করেছেন। ২০০৭ সালের ১০ আগষ্ট মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রমাণ করেছেন যে, অন্যকে যা বলা যায় তা নিজে পালন করা যায়। সমাজে সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলেমিশে বসবাস করা যায়। তাই তাঁর মৃত্যুর পর খেপুপাড়ার সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা জানাজায় আসতে দ্বিধা করেনি। অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও চোখের পানি ফেলেছে। তিনি নিজের জীবনাচরণ থেকে আমাকে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই দেশের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নেতারা অন্যকে যা বলে তা নিজেরা পালন করে না। যদিও তারা মানুষের সামনে আদর্শ নন, তারপরও মানুষ তাদেরকে দেখতে দেখতে ধরেই নিয়েছে এটাই স্বাভাবিক, এটাই যেন হবে!

আমি আমার বাবার জীবনাচরণ থেকে শিখেছি যে, পেশা কিংবা পোশাক নয় ভেতরের মানুষটাই আসল। মানুষ সৎ থাকতে চাইলে যেকোন অবস্থান থেকেই সম্ভব। আর মানুষের কল্যাণ প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধে নয়। ভালোবাসায়। ধর্ম ও ভিন্ন মতের প্রতি অবজ্ঞা কল্যাণকর নয়। বরং তাদেরকে আলিঙ্গন করার মধ্যেই সমাজের শান্তি। ভোগে যতোটা আনন্দ ত্যাগে তারচেয়ে বেশি।

আমাদের দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আমার বলা উপরের কথাগুলো মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছে! দেশে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতি দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় এই দেশের মানুষও তাই। তারা দেশটাকে বিভক্ত রাখতে চায় সেই ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের মতো, ডিভাইড এন্ড রুল অর্থাৎ ভাগ করো আর শাসন করো নীতি অনুসারে। দেশের মানুষকে নানান ইস্যুতে বিভক্ত রাখতে তারা সদা তৎপর। একদল ভারত দেশ নিয়ে যাবে বলে ভয় দেখায়, অন্যদল ভয় দেখায় পাকিস্তানের। একদল বলে দেশ হিন্দুদের দখলে চলে গেলো, অন্যদল বলে ইসলামী জঙ্গিতে দেশ ভরে গেলো। একদল বলে দেশের জন্য তারাই করছে। অন্যদলটি বলে দেশের জন্য তারাই করছে। একদল দাবী করে দেশ তারাই স্বাধীন করেছে, অন্যদলের মুক্তিযোদ্ধারা পর্যন্ত তাদের চোখে পাকিস্তানী গুপ্তচর। অন্যদলটি দাবী করে তারা ছিলো বলে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম হতে পারেনি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের তারাই কান্ডারি। এভাবে জনগণের মধ্যে বিভেদ রেখা তৈরি করলেও পর্দার অন্তরালে তারা পরস্পরের কাছাকাছি থাকে মানসিকতার বিচারে! দীর্ঘদিনের চর্চায় তারা ঠিকই জনগণকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করতে পেরেছে। আর যেকারণে আজকে দুটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম দ্বিধান্বিত! তার‍া দ্বিখন্ডিত হওয়ার আগেই আমাদেরকে যা করার করতে হবে!!!

এই অবস্থায় গ্রামেগঞ্জে সচেতন মানুষদের অনেক কাজ। আসুন একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আরো বেশি কাজ করি।

পল্লবী। ঢাকা।

১১ অক্টোবর ২০১১; রাত ২:৪১ মিনিট।

Advertisements

One thought on “জন্মদিনে কয়েক লাইন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s