সকলকে স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দিতে হলে ট্রাডিশনাল মেডিসিনের বিকল্প নেই


(দৈনিক যায়যায়দিন-এ আমি একটি কলাম লিখতাম ‘টেকনোলজি টক’ নামে৷ লেখাটি সেখানে প্রকাশিত হয়েছিল ১ মে ২০০৮ তারিখে৷)

ঘটনাটি গত মাসের৷ একটি চারদিনের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত ২২ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার বালিতে৷ একদম গ্রামের মানুষটিকেও কি করে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা যায় সেনিয়ে আলোচনা করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের লোকেরা একত্রিত হয়েছিলেন৷ প্রতিটি দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য সেবা কাঠামো নিয়ে সেখানে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল৷ বিদ্যমান কোন একটি কাঠামোকে পুরোপুরিভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি কারো, যার মাধ্যমে একটি দেশের সকল মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা যাবে৷

কিন্তু একটি উপায় তো খুঁজে পাওয়া দরকার৷ সেই চিন্তা থেকেই ট্রাডিশনাল মেডিসিন প্রসঙ্গটি তুললেন বাংলাদেশের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা৷ যিনি আগ্রহের জায়গা থেকে অনেক বছর ধরে ট্রাডিশনাল মেডিসনের ভালো মন্দ পর্যবেক্ষণ করছেন৷  তার তুলে ধরা প্রসঙ্গটি লুফে নিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন হেলথ সিস্টেম এডভাইজর৷ ঘানার নাগরিক ডক্টরেট ডিগ্রীধারী এডভাইজর ভদ্রমহিলা তার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বললেন৷

তিনি বললেন, তিনি তখন তরুণী ডাক্তার৷ কাজ করেন একজন প্রফেসরের অধীনে৷ একদিন ঘানার সর্বজনপরিচিত একজন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে এলেন৷ প্রফেসর সাহেব রোগী দেখে বললেন রোগীর পা গোড়ালির উপর থেকে কেটে ফেলতে হবে এবং সম্ভব হলে আজকেই৷ কিন্তু সে পা কাটতে রাজি না হয়ে ১০ দিন সময় চাইলো৷ প্রফেসর সতর্ক করে দিয়ে বললেন ১০ দিনে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে তখন হয়তো হাটু পর্যন্তই পা কেটে ফেলতে হবে৷ ভদ্রলোক সবশুনে তার স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেলেন৷ বলে গেলেন ১০ দিন পরে তিনি আবার আসবেন৷ ভদ্রলোকের শরীরে ভর করে কোনরকমে পা টেনে টেনে তার স্ত্রীও চলে গেলেন৷ তখন তরুণী ডাক্তার কিছুটা অবাক ও কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রফেসরকে বললেন এতো নামকরা লোক অথচ স্ত্রীর চিকিত্সা না করে ফিরে গেলো, কেমন মানুষ৷ প্রফেসর সাহেবই বা কি বলবেন৷ রোগী চিকিত্সা না করলেতো তিনি কিছু করতে পারেন না৷ তরুণী ডাক্তার তখন দিন গুনতে লাগলেন৷ তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন ঠিক ১০ দিন পরে সেই ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে এসেছেন৷ রোগী ভদ্রমহিলাকে দেখতে আগের চেয়ে চাঙা লাগছে৷ আগেরবার ভদ্রমহিলা নিজে হেটে আসতে পারেননি৷ আজকে স্বামীর সাহায্য ছাড়াই হেটে এলেন৷ ভদ্রমহিলাকে পরীক্ষা করে দেখা গেলো তার পায়ের অবস্থা অনেকটাই ভালো৷ কি করে এটি সম্ভব হলো৷ ভদ্রলোক জানালেন তিনি ট্রাডিশনাল হিলারের কাছে গিয়েছিলেন৷ সেই লোক তার স্ত্রীর পায়ের তিনটি আঙুল কেটে বাদ দিয়েছে কারণ ওই তিনটি আঙ্গুল নাকি একদমই পচে গিয়েছিল৷ পায়ের পাতার বাকি অংশে লতা-পাতা দিয়ে চিকিত্সা দিয়েছে৷ তাতেই তা পা ভালো হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বচক্ষে দেখে তরুণী ডাক্তার ডাক্তারি পেশাই ছেড়ে দিলেন৷ বিজ্ঞান নিয়ে আরো চর্চা করার জন্যে তিনি ডক্টরেট করলেন৷ বিজ্ঞানকে আরো ভালো করে তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন৷ ট্রাডিশনাল মেডিসিন তারও একটি প্রিয় বিষয়৷ তিনি বিশ্বাস করেন প্রকৃতির মাঝে মানুষের স্বাস্থ্য সেবার অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে৷

প্রসঙ্গের অবতারণাকারী বাংলাদেশী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা তখন জানালেন সকলকে যদি স্বাস্থ্যসেবা দিতে হয় তবে ট্রাডিশনাল মেডিসিন বিষয়টি মূলধারায় স্বাস্থ্যসেবার অন্তভুক্ত করতে হবে এবং এনিয়ে দেশের মধ্যে যারা কাজ করে তাদেরকে যেমন জায়গা করে দিতে হবে তেমনি যারা একে অপব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাও নিতে হবে৷ প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানালেন তার অফিসের একজন ক্যান্সার আক্রান্ত পিয়নের জীবনের ব্যাপারে এলোপ্যাথিক চিকিত্সদের আশা ছেড়ে দেয়া এবং সেই একই রোগী হোমিওপ্যাখিক চিকিত্সার মাধ্যমে এখনো বহাল তবিয়তে বেচে আছে৷ একথা বলে তিনি বললেন, এমন অনেক রোগ আছে যেগুলোর চিকিত্সা ট্রাডিশনাল মেডিসিন কিংবা অলটারনেটিভ চিকিত্সায় বেশি ভালো ফলাফল পাওয়া যায় কিংবা সাইড এফেক্টও কম থাকে৷ সেদিন সেখানে উপস্থিত অনেকেই তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন৷ দ্বিমত পোষন করেননি কেউই৷

তবে ট্রাডিশনাল মেডিসনের এমনসব চমকপ্রদ ফলাফল জানা ও স্বচক্ষে দেখার পরও চাইলেই এর স্বপক্ষে বড় ধরনের প্রচারণা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না বাস্তব কিছু কারণে৷ আমাদেরকে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে আগাতে হবে৷ কারণ দেশের ১৫ কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই৷ একটি কথা সত্যি যে, ট্রাডিশনাল মেডিসনের বিপক্ষে আপনি যত লোক পাবেন৷ পক্ষে ততো পাবেন না৷ এই সত্যি কথাটির মতোই আরেকটি সত্যি হলো দুনিয়াজুড়ে ট্রাডিশনাল মেডিসনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে৷ ইন্টারনেটে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করলেই আপনি এর সত্যতা জানতে পারবেন৷ আপনার সুবিধার্থে এখানে ১০টি ঠিকানা দেয়া হলো যেখানে ট্রাডিশনাল মেডিসিন নিয়ে বিস্তারিত জানা যাবে৷

  1. http://www.who.int/mediacentre/factsheets/fs134/en/
  2. http://www.nccam.nih.gov
  3. http://www.sudan-health.net
  4. http://www.herbal.gov.ae
  5. http://www.naturmed.unimi.it
  6. http://uit.no/nafkam/omnafkam/
  7. http://www.rmit.edu.au/chinese-med/whocc-trm
  8. http://www.kitasato.or.jp/toui-ken
  9. http://plaza.snu.ac.kr/~napri/eng/history.htm
  10. http://www.yhcotruyentw.org.vn

সবশেষে ট্রাডিশনাল মেডিসিন নিয়ে কিছু তথ্য আপনাদের জানাচ্ছি৷ আফ্রিকার ৮০ ভাগ মানুষ তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার জন্যে ট্রাডিশনাল মেডিসনের উপর আস্থা রাখে৷ চায়নাতে ৩০ ভাগ লোক ট্রাডিশনাল মেডিসনের উপর নির্ভরশীল৷ ঘানা, মালি, নাইজেরিয়া ও জাম্বিয়াতে ৬০ ভাগ শিশুর ম্যালেরিয়া জ্বরের চিকিত্সার ক্ষেত্রে বাড়িতে বানানো হারবাল মেডিসিন ব্যবহার করা হয়৷ ইওরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো দেশের অন্তত ৫০ ভাগ মানুষ জীবনে অন্তত একবার ট্রাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেছেন৷ কানাডার ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ৭০ ভাগ৷ সানফ্রান্সিসকো, লন্ডন ও দক্ষিণ আফ্রিকার এইডস রোগীদের ৭৫ ভাগ ট্রাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন৷ জার্মানীর শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ জীবনের কোনো না পর্যায়ে ট্রাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন বলে এখন জার্মানীতে নেচারাল চিকিত্সা বিষয়ে ডাক্তাররা বিশেষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন৷ আমেরিকায় ২০০০ সালে ট্রাডিশনাল মেডিসনের বাজার ছিলো বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা৷ বর্তমানে বিশ্বে ট্রাডিশনাল মেডিসনের মোট বাজার বছরে ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি৷ এবং যত দিন যাচ্ছে এই বাজার বড় হচ্ছে৷

ট্রাডিশনাল মেডিসনের ক্ষতিকর দিকগুলো যেমন আমাদের জানা দরকার তেমনি এর ভালো দিকগুলোও জানা দরকার৷ মোদ্দা কথা এর সঠিক প্রচার ও প্রসার হওয়া দরকার৷ মিডিয়া এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে৷ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দিতে এর কোনো বিকল্প নেই৷ এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নিপোর্ট, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড, হোমিওপ্যাথিক বোর্ডসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করে বিষয়টি নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা দরকার৷

(মোহাম্মদ গোলাম নবী, টেকনোলজি টক, যায়যায়দিন, ১ মে ২০০৮)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s