গণতন্ত্র, শাসন ও জবাবদিহিতায় প্রযুক্তির ভূমিকা


(২০০৮ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে এই লেখাটি ছাপা হয়েছিল দৈনিক যায়যায় িদন পত্রিকায়৷ টেকনোলজি টক কলামে৷ যাদের পুরনো লেখা পড়তে আপত্তি নেই তাদের জন্য!)

কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভ বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্টের সঙ্গে যৌথভাবে গণতন্ত্র, শাসন ও জবাবদিহিতা: গণমাধ্যম ও যোগাযোগের অবদান শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সভার আয়োজন করেছিল সাম্প্রতিককালে ইংল্যান্ডে৷ সেখানে বিশ্বের শতাধিক মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যক্তিত্ব অংশ নেন৷ তারা সেখানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, গণমাধ্যম শুধুই একটি পাবলিক রিলেশন যন্ত্র নয় বরং গণমাধ্যম হলো পরিবর্তনের বরপুত্র৷

কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভের চেয়ারম্যান ও দক্ষিণ আফ্রিকার সোল সিটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক গার্থ জাফেট দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীন গণমাধ্যম সেই দেশে সরকারকে জবাবদিহি করার ব্যাপারে কতটা সাফল্য অর্জন করেছে সেকথা উদাহরণসহ সবাইকে জানান৷

এই প্রসঙ্গে কেনিয়ার উদাহরণ দিয়ে বিবিসি ফোকাস অন আফ্রিকার এডিটর জোসেফ ওয়ারানগু বলেন, কেনিয়াতে সেখানকার গণমাধ্যমগুলো ওয়াচডগ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হওয়ায় সেখানকার গণতন্ত্র সঠিকভাবে রক্ষিত হয়নি৷ সেখানকার মিডিয়া রাজনীতিকগণকে উপযুক্ত জবাব িদহি করতে ব্যর্থ হয়েছে, কোনো ঘটনার বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে য িদও সেই ঘটনার উপর রিপোর্ট করেছে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক খেলায় মিডিয়াও অংশ নিয়েছে৷ তার কথাকে সমর্থন করে কেনিয়ার কভেনট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ড. ফ্রেডরিক মুধাই বলেন, কেনিয়ার মিডিয়াগুলো নির্বাচনকে দেখে তাদের প্রোফিট মেকিং যন্ত্র হিসেবে৷ তিনি বলেন, মিডিয়ার পক্ষে একা কিছুই করা সম্ভব নয়৷ তবে আইন ও বিচার বিভাগের সক্রিয় সমর্থন পেলে মিডিয়া অনেক কিছুই করতে পারে৷ এই কথার সূত্র ধরে আরো অনেকেই সেখানে আলাপ করেছেন যেখান থেকে একথা বের হয়ে এসেছে যে কার্যকর ও শ িক্তশালী মিডিয়ার জন্যে একাডেমেশিয়ানদের সম্পৃক্ততার দরকার রয়েছে৷ কিন্তু শুরুতেই দরকার আমরা মিডিয়া বলতে কি বুঝবো তার একটি পরিধি ঠিক করে নেয়া দরকার৷ এখন মিডিয়া মানে শুধুই নিউজপেপার নয়৷ কিংবা মিডিয়া মানে শুধুই রেডিও এবং টেলিভিশন৷ ইন্টারনেটের কারণে মিডিয়ার বিস্তৃতি ও ধরণ অনেক ব্যাপক ও প্রসারিত হয়েছে৷ কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভ নিজেই একটি ইন্টারনেটভিত্তিক মিডিয়া গ্রুপ, যা ২৮টি দাতা ও উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হয়৷ সবমিলিয়ে ইন্টারনেট বর্তমান বিশ্বকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করছে৷

দুই.

নাগরিকগণ এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছোট বড় গ্রুপ তৈরি করে নতুন ধরনের মিডিয়ার প্রচলন ঘটিয়েছে৷ যাকে সিটিজেন মিডিয়া বলা হচ্ছে৷ বর্তমানে বিশ্বে ইন্টারনেটভিত্তিক লক্ষ লক্ষ সিটিজেনমিডিয়াভিত্তিক নিউজপেপার ও ভিডিও চ্যানেল চালু রয়েছে৷ এই ধরনের মিডিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদেরকে বলা হচ্ছে সাইবার জার্নালিস্ট৷ ইন্টারনেটে সিটিজেনমিডিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো যে শুধুই আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিতে লেখা থাকছে তা নয়৷ নিজ নিজ দেশের, এমনকি ইন্টারনেটে এক্সেস রয়েছে এমন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর স্বদেশী ভাষায়ও এই ধরনের সাইটগুলো পরিচালিত হচ্ছে৷ ফলে এই ধরনের সাংবা িদকতার প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে৷ এমনকি শুধুই শিশুদের জন্যে শিশুদের সম্পাদনায় ইন্টারনেটভিত্তিক গ্রুপ রয়েছে৷ ফলে গণতন্ত্র চর্চার জায়গাটি নিউজপেপার, রেডিও এবং টেলিভিশনের মতো প্রচলিত মিডিয়াকে ছাড়িয়ে ব্য িক্তর কাছে নানানভাবে পৌঁ ছে গিয়েছে৷ যেখানে মোবাইল ফোনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়েছে৷ সবমিলিয়ে গণতন্ত্র এখন যেমন একটি স্থানীয় বিষয় তেমনি প্রযু িক্তর কল্যাণে এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷ ব্লগ (ইন্টারনেটে ডায়রি লেখা), পডকাস্ট, ইমেইল গ্রুপ ইত্যা িদ নানান পন্থায় সিটিজেন জার্নালিজম তার শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দিচ্ছে৷

তিন.

আমরা দেখতে পাই ইন্টারনেটের এই সর্বব্যাপকতা থেকে চায়না কিংবা একদার পূর্ব ইওরোপের দেশগুলোও মুক্ত থাকতে পারেনি৷ এটিই বাস্তবতা৷ এই অবস্থায় ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তিকে কিভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যেতে পারে সেই বিষয় নিয়ে সকল পক্ষের চেষ্টা থাকা দরকার৷ প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুবই উর্বর জায়গা৷ আমাদের মতো একটি সর্বমতের প্রতি সহনশীল মডারেট দেশে গণতন্ত্র, শাসন ও জবাবদিহিতায় প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটানো সহজ৷ আমাদের দেশ আইন প্রণয়ন ও নীতিমালা তৈরির ব্যাপারে অন্য অনেক দেশের চেয়ে উদার৷ আমাদের জন্যে এই সপ্তাহে একটি সুখবর দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়৷ কমিউনিটি রেডিও আইন পাস করা হয়েছে৷ বাংলাদেশে মোট মোবাইল ফোনের ইউজারও সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়েছে৷ এখন যেখানেই মোবাইল ফোন সেখানেই ইন্টারনেট৷ গণতন্ত্রের চর্চায় এই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখলে আগামীতে আমাদের দেশের রাজনীতিকগণ অনেক ধরনের সুবিধা আদায় করতে পারবেন৷

চার.

যারা বলে বিশ্বায়নের এই সময়ের ধারায় আগামীতে গণতন্ত্রের পরিচিত চেহারার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না৷ তারা সতর্কতার সঙ্গে করপোরেট স্বার্থচালিত মিডিয়াগুলোর বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসেন৷ করপোরেট স্বার্থচালিত মিডিয়াগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনকে যেমন প্রভাবিত করে চলেছে তেমনি একটি দেশের সার্বিক গণতান্ত্রয়নে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে৷ এই মতামতের সঙ্গে যারা একমত নন তারাও মনে করেন বিশ্বায়ন ও কমপিউটারাইজেশনের মিলনে গণতন্ত্র আরো বেশি তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে৷ উভয়পক্ষের মধ্যে একটি মিল রয়েছে তারা সকলেই মনে করেন ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির একটি বড় ভূমিকা আগামীর বিশ্বে থাকবে৷ এই অবস্থায় আমরা যদি আমাদের দেশের একদমই গ্রামের মানুষদের জন্যে কিছু একটা এখনই শুরু করে দিতে না পারি তবে শেষ বিচারে আমরা হেরে যাবো।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s