অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১১


রাষ্ট্র প্রধান: জিল্লুর রহমান

সরকার প্রধান: শেখ হাসিনা

মৃত্যুদণ্ড: বহাল রাখার পক্ষে

জনসংখ্যা:        ১৬ কোটি ৪৪ লাখ (১৬৪.৪ মিলিয়ন)

প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল: ৬৬.৯ বছর

৫-বছরের কমবয়সী শিশু মৃত্যু (পুরুষ/নারী): ৫৮/৫৬ প্রতি হাজারে

বয়স্ক সাক্ষরতা: ৫৫ শতাংশ

র‌্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ন (RAB) এর সদস্য এবং অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাগণ ১,৫০০ এরও বেশি লোককে আটক করেছে; এদের অনেককে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে আটক করা হয়েছে। এসময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভ-সমাবেশে উপর ব্যাপক ও অত্যধিক বল প্রয়োগ করেছে এবং ঘটনাগুলোতে শত শত লোক জখম হয়েছে। ৠাব এবং পুলিশ বাহিনী বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বিনাবিচারে আটক অন্ততপক্ষে ছয়জন ব্যক্তি পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন মারা গিয়েছে; অভিযোগে প্রকাশ তারা নির্যাতনে মারা ‍গিয়েছে। নয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং কমপক্ষে ৩২ জন পুরুষকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। ছয়জনকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে। সরকার পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সেটেলারদের আক্রমণ থেকে জুম্মা আদিবাসী জনগণকে যথার্থ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

পটভূমি

ফেব্রুয়ারি মাসে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে বেআইনী উল্লেখ করে ইতোপূর্বে হাইকোর্টের দেওয়া রায়কে সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখে। তবে আদালত এই রায়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে দায়মুক্ত ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাবলী তদন্তের জন্য নতুন কোন সুযোগ রাখেনি।

মার্চ মাসে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুস্বাক্ষর করে।

নারী ও মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরের প্রথম ছয়মাসে থানায় লিপিবদ্ধ অপরাধের অভিযোগগুলোর শীর্ষে ছিল নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা। মোট ৭২৮৫টি অভিযোগের মধ্যে ১,৫৮৬টি ছিল ধর্ষণের ঘটনা। জাতীয় সংসদ অক্টোবর মাসে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন অনুমোদন করে।

বিচার-বহির্ভূত গ্রেফতার ও বিনাবিচারে ‍অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক

ৠাব এবং অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাগণ ছাত্রদের বিক্ষোভ-সমাবেশ কিংবা রাস্তার সহিংস হয়ে উঠা মিছিল থেকে ১,৫০০ এরও বেশি বিরোধী দলীয় সমর্থককে আটক করেছে; যাদের অনেককে বিধিবহির্ভূতভাবে আটক করা হয় এবং বিনাবিচারে এক সপ্তাহ থেকে দুই মাস পর্যন্ত আটক রাখা হয়। আটককৃত কয়েক ডজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংস ফৌজদারি অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ গঠন করা হয়। বাকিদের বিনা অভিযোগে ছেড়ে দেওয়া হয়।

  • ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সমর্থক প্রায় ৩০০ জনকে গ্রেফতার করে এবং তাদেরকে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহরগুলোতে দুই মাস পর্যন্ত বিনা বিচারে আটক রাখে। গ্রেফতারের এই ঘটনার সূত্র ধরে প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যেকার সংঘর্ষে চারজন শিক্ষার্থী মারা যায়। ঘটনাগুলোতে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাও ব্যাপকভাবে জড়িত হয়ে পড়েছিল। পুলিশ তাদের মধ্য থেকে প্রায় এক ডজনকে আটক করেছিল।
  • জুন মাসে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আহুত হরতাল চলাকালে এবং হরতালের পরপরই দলটির ২০ জন নেতৃস্থানীয় সদস্যসহ ২০০ এরও বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদেরকে এক থেকে পাঁচ সপ্তাহের বিভিন্ন মেয়াদকালে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়।

ব্যাপক ও অতিরিক্ত বল প্রয়োগ

  • জুন মাসের ২৭ তারিখে ৠাব (RAB) সদস্যরা বিএনপির নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাসের বাড়িতে ব্যাপক ও অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে। বিরোধী দলের ডাকা হরতাল চলাকালে বাড়ির অভ্যন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানকারীদের উপর তারা হামলা চালায় এবং পিটিয়ে অন্ততপক্ষে ২০ জনকে জখম করে যাদের বেশিরভাগ মহিলা।
  • বর্ধিত বেতনের দাবীতে হরতাল পালনরত কয়েকশত গার্মেন্টস কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে জুন ও আগস্ট মাসে কয়েক ডজন মানুষ জখম হয়। এই ধরনের আক্রমণের ঘটনায় ৠাব কিংবা পুলিশ সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়নি।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

সরকার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব মতে ৠাব ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা বছরের প্রথম ১০ মাসে ৬০টিরও বেশি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

  • মে মাসের ৩ তারিখে কুষ্টিয়া জেলার কোলাবাড়ির গ্রামের অনেকে দেখেছে যে, পুলিশের কর্মকর্তাগণ ওই গ্রামের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী আবদুল আলিমকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছে। পরেরদিন তার পরিবারের সদস্যরা তাকে মৃত অবস্থায় পায়। পুলিশের একজন কর্মকর্তা দাবী করেন যে, গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টাকালে আবদুল আলিম মারা গিয়েছেন। জুলাই মাসে আবদুল আলিমের পরিবার কুষ্টিয়ার আদালতে আবদুল আলিমকে বেআইনীভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করে। কুষ্টিয়ার পুলিশ বিভাগ ঘটনার তদন্ত করে এবং আগস্ট মাসে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে আবদুল আলিমের মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশের দেওয়া আগের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে এই প্রতিবেদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রীট করা হয়েছে যার রায় এখনো হয়নি।

নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার

পুলিশ বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের উপর নির্যাতনের কারণে কমপক্ষে ছয়জন ব্যক্তি মারা গিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হলেও তাদের কাউকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি। নির্যাতনকে ফৌজদারি অপরাধ বলে গন্য করা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের আনা বিল এখনো সংসদে পাস হয়নি।

  • বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দৈনিক সংবাদপত্র চালানোর অভিযোগে ২ জুন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করা হয়। মেজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে তিনি বলেছেন যে, হাজতে থাকাকালীন তাকে পুলিশ কর্মকর্তারা মারাত্মকভাবে মারধোর করেছে।
  • আগস্ট মাসের শুরুর দিকে অন্ততপক্ষে ছয়জন গার্মেন্টস কর্মীকে বিনা বিচারে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী। জিজ্ঞাসাবাদকালে পুলিশ কর্মকর্তারা তাদেরকে পেটায়। বর্ধিত বেতনের দাবীতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করার ঘটনার সূত্রে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড

বাংলাদেশের স্থপতি নেতা শেখ মুজিবর রহমানকে ১৯৭৫ সালে হত্যার ঘটনায় পাঁচজন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের মৃত্যুদণ্ড জানুয়ারি মাসে কার্যকর করা হয়। তাদের মৃত্যুদণ্ড নজিরবিহীনভাবে দ্রুতগতিতে কার্যকর করা হয়। চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আদালতের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে তাদের তিনজন রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রাণভিক্ষার আবেদন জানালে রাষ্ট্রপতি তাদের সেই আবেদন নামঞ্জুর করেন, যা সচরাচর ঘটে না। এছাড়াও তিনটি পৃথক কারাগারে ১৫ সেপ্টেম্বর আরো চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দায়মুক্তি/শাস্তির ঊর্ধ্বে থাকা

মার্চ মাসে সরকার “স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে যারা ফৌজদারি অপরাধ করেছে, অপরাধীদের সহায়তা করেছে এবং গণহত্যার অংশ নিয়েছে” তাদের বিচার করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল স্থাপন করে। ট্রাইবুনাল আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন নেতাকে গ্রেফতারের আদেশ দেয়। তারা হলেন মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং দেলোয়ার হোসেন সাইদী। মধ্য ডিসেম্বর থেকে বিনা বিচারে আটক বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে পরবর্তীতে জানানো হয় যে তিনিও সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধী।

শুরুতে তাদেরকে কোন ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটক করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ এবং এর ২০০৯ সালের সংশোধন, যার অধীনে বিচার পরিচালিতি হচ্ছে, ন্যায্য বিচারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সেখানে নেই। আরো অনেক কিছুর সঙ্গে এতে ট্রাইবুনালের রায়কে চ্যালেঞ্জ করার অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। এছাড়াও এতে জামিন পাওয়ার অধিকার এবং বিচারকদের নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে।

আদিবাসীদের অধিকার

পাবর্ত্য চট্টগ্রামের জুম্মা অধিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার কারণে তারা সেখানকার বাঙালি সেটেলারদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। ২০ ফেব্রুয়ারি শত শত জুম্মা আদিবাসী বিক্ষোভকারীদের উপর সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করলে অন্ততপক্ষে দুইজন জুম্মা আদিবাসী মারা যায়। পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। আগেরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে বাঙালি সেটেলারগণ রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি এলাকায় আদিবাসীদের অন্তত ৪০টি ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর তারা তাদের নিরাপত্তার দাবীতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল। আদিবাসীদের উপর আক্রমণ কিংবা হত্যার ঘটনার তদন্ত হওয়া কিংবা এই ঘটনায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কোন সংবাদ জানা যায় না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সফরসমূহ/প্রতিবেদনসমূহ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিগণ জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সফর করেন।

বাংলাদেশ: দ্রুতগতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে (এএসএ ১৩/০০৩/২০১০)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s