মায়ের দুধের তিন উপকারিতা


একটি শিশু ছয়মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। এসময়ে তার অন্য কোনো খাবার এমনকি পানিও খাওয়ার দরকার হয় না।  শিশুর বয়স ৭ মাসে পড়লে তাকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার খেতে দিতে হয়। তবে শিশুর বয়স ২ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে।  নবজাতক শিশুর খাবার হিসেবে মায়ের দুধ সবচেয়ে সেরা ও ভালো খাবার। মায়ের দুধ হলো শিশুর জন্য সুষম খাদ্য। যে শিশু তার ছয়মাস বয়স পরযন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খায় সেই শিশু বোতলে দুধ খাওয়া শিশুর তুলনায় কম অসুস্হতা ও অপুষ্টিতে ভোগে। পবিত্র কোরানের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে: মায়েরা তাদের সন্তানদের পুরো দুই বছর বুকের দুধ পান করাবে — (সুরা বাকারা, আয়াত-২৩৩)।

বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে ভুল ধারণা ও দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি

কোন কোন মা মনে করেন তারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন না। কেউ কেউ বলেন যে, তার বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না তাই বুকের দুধ না দিয়ে বাজারের দুধ খাওয়াচ্ছেন। মূলত মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করার ফলে এমনটা হয়ে থাকে। একারণে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কিভাবে কোলে নিতে হবে সেকথা মায়েদের জানা দরকার।

একজন মা যখন শিশুকে বুকের দুধ দেবেন তিনি সবসময় হয় আরাম করে বসবেন নতুবা কাত হয়ে শিশুর দিকে ঘুরে শোবেন। বসে খাওয়ানোর সময় শিশুকে এমনভাবে কোলে নেবেন যাতে শিশু ও শিশুর হাত ঝুলে না থাকে। এসময়ে, শিশুকে পুরোপুরি মায়ের দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে যাতে মায়ের বুক ও পেটের সাথে শিশুর বুক ও পেট লাগানো থাকে। এরপর শিশুর ঠোঁটে মায়ের বুক স্পর্শ করাতে হবে। এসময়ে শিশু যখন বড় করে হা করবে তখন স্তনের বোঁটার চারপাশের কালো অংশসহ শিশুর মুখে বোটা তুলে দিতে হবে।  বোটার চারদিকের কালো অংশের নিচে বুকের দুধ জমা থাকে। বুকের একটি স্তন পুরোপুরি খাওয়াবার পরে শিশু যখন নিজের থেকে বোটা ছেড়ে দেবে, তখন অন্য স্তন শিশুকে খাওয়াবার চেষ্টা করতে হবে। পরের বারে এই দ্বিতীয় স্তনটি আগে খাওয়াতে হবে।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হবে শাল দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে।

শাল দুধ:

সন্তান প্রসবের পর মায়ের বুকে প্রথমে যে দুধ আসে সেটিই হলো শালদুধ। এই দুধ হালকা হলুদ রংয়ের হয়ে থাকে। এটি ঘন ও আঠালো হয়। এবং পরিমাণে কম থাকে। শালদুধ পরিমাণে কম হলেও একটি শিশুর জন্য যথেষ্ট। শালদুধ শিশুর প্রথম খাবার এবং প্রথম টিকার কাজ করে।

শালদুধ শিশুর কালো পায়খানা শরীর থেকে বের হয়ে যেতে সাহায্য করে ফলে শিশুর জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে। এছাড়াও শালদুধে রয়েছে শ্বেতকণিকা নামের এক ধরনের জিনিস যা শিশুকে শরীরে রোগ জীবাণুর প্রবেশ ঠেকাতে সাহায্য করে। এখানেই শেষ নয়। শালদুধের ভিটামিন ‘এ’ শিশুকে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করে।

শিশুকে ছয়মাস বয়স পরযন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর তিন ধরনের উপকারিতা:

শিশুর উপকারিতা: শিশুর স্বাস্হ্য ভালো থাকে। শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। বুকের দুধ শিশুকে পেটের অসুখ, সর্দি কাশি ও পুষ্টিহীনতাসহ অন্যান্য যে কোনো রোগ থেকে রক্ষা করে। অর্থাৎ বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর ডায়রিয়া ও সর্দি কাশি কম হয়। শিশু বুদ্ধিমান হয়। শৈশবকালীন ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও কান পাকার ঝুঁকি কম হয়। মায়ের সাথে শিশুর মানসিক সর্স্পক বৃদ্ধি পায়, যা শিশুর বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকের স্তন চোষা বাচ্চার মাড়ি ও দাঁত বৃদ্ধির জন্য খুবই সহায়ক।

মায়ের  উপকারিতা: শিশুকে জন্মের পর থেকেই ২-৩ দিন ঘন ঘন মায়ের দুধ টানতে দিলে এবং শালদুধ খাওয়ালে মায়ের বুকে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক দুধ আসে। শিশুকে ঘন ঘন স্তন চুষতে দিলে স্তন ফুলে ভারি হয় না এবং স্তনের ব্যথা সেরে যায়। বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের অনেক সময় বাঁচে। এবং বাড়তি কোনো খাটুনি হয় না। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকেই মা তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। পুরো ছয়মাস বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের গর্ভধারণের সম্ভাবনা কম থাকে। বুকের দুধ খাওয়ালে শিশু কম অসুস্হ হয়, ফলে মায়ের মনে শান্তি থাকে এবং মা অন্যান্য কাজে বেশী মনোযোগ দিতে পারেন।

আর্থিক উপকারিতা: বুকের দুধ খাওয়াতে বাড়তি খরচ নেই।  বরং কৌটার দুধ কেনার খরচ বাচে।

মনে রাখুন, যে মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তিনি কোনো অবস্হাতেই জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য খাবার বড়ি খেতে পারবেন না।

এবার আসুন আমরা শিশুকে বিকল্প দুধ বা গরুর দুধ খাওয়ানোর অপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেই:

  • বোতল ব্যবহৃত বিকল্প দুধ সব সময়ই রোগজীবাণু বহন করে।
  • বিকল্প দুধের রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ফলে শিশুরা যে কোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং রোগ সারতে সময় লাগে।
  • গরুর দুধে পর্যাপ্ত ভিটামিন, বিশেষ করে ভিটামিন সি থাকে না। ফলে শিশুকে আলাদাভাবে ফলের রস খাওয়াতে হয়।
  • গরুর দুধে পর্যাপ্ত আয়রন থাকলেও মায়ের দুধের মতো শিশু অন্ত্রে তা কাজ করে না। ফলে শিশু রক্ত স্বল্পতায় ভোগে।
  • গরুর দুধে অতিরিক্ত লবণ থাকে, ফলে শিশুদের খিঁচুনি হতে পারে।
  • শিশুর বুদ্ধি বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান গরুর দুধে কম থাকে। কিন্তু মায়ের দুধে পর্যাপ্ত থাকে।
  • দুধ হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম গরুর দুধে অনুপস্হিত থাকে। ফলে শিশুর পক্ষে গরুর দুধ হজম করাও বেশ কষ্টকর।
  • ·গরুর দুধ বা বিকল্প দুধে অভ্যস্ত শিশুর সাধারণত ডাইরিয়া, নিউমোনিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ও একজিমা, কানপাকা, সর্দিকাশি ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়।

একটি সুস্হ ও সুন্দর আগামী প্রজন্ম পেতে মায়ের দুধের ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

(দৈনিক যায়যায়দিনের স্বাস্থ্য পাতায় ২৬ জুলাই ২০০৬ সালে প্রকাশিত। ইষৎ পরিবর্তিত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s