গরিবের ডাক্তার জেলে


বান্দরবানের দুর্গম রুমা উপজেলায় শাস্তি পাওয়া এক ইউএনওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০০১ সালে। আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, তাকে শাস্তিস্বরূপ এখানে বদলি করা হয়েছে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিজীবীদের শাস্তি দিতে দুর্গম বান্দরবান কিংবা রাঙামাটি বা খাগড়াছড়িতে ট্রান্সফার করার রেওয়াজ অনেক পুরনো। সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে কাজটি করেন। ইউএনও মি. মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেনের বেলাতেও তাই ঘটেছে। যদিও তিনি শাস্তিদাতাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো পরিবার নিয়েই বান্দরবানের রুমাতে চলে এসেছেন। তিনি ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে এখানেই আছেন। ইতিমধ্যে মেয়েদের একাধিকবার ম্যালেরিয়া হয়ে গেছে। তিনি ছাড়া প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের কেউ এখানে থাকেন না বললেই চলে। আমি তাকে একজন সাহসী ও জেদি মানুষ হিসেবে পেয়েছিলাম। সেসঙ্গে পজেটিভ মানুষ। তিনি বলেছিলেন, আমার মেয়েরা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লেখাপড়া করার কারণে ওরা ওদের ভাষাও শিখেছে। ওরা এখন বম ভাষায় কথা বলতে পারে। লিখতে পারে। অন্য ভাষাও শিখছে।

আমি রুমাতে গিয়েছিলাম উপজেলা স্বাস্হ্য বিভাগের সঙ্গে কাজ করতে। থাকি ইউএনওর বাড়ির পাশের বাংলোতে। তার কাছ থেকেই জানলাম হাসপাতালে কোনো ফুল টাইম ডাক্তার নেই। বেতনের সময় এসে বেতন তোলেন। হাজিরা খাতায় তখনই পুরো মাসের বকেয়া স্বাক্ষর করেন। উপজেলার স্বাস্হ্য ব্যবস্হা সম্পর্কে বোঝাতে গিয়ে তিনি সহজভাবে বলেছিলেন, ‘আমি যখন কোনো দূর গ্রামে যাই, সঙ্গে পকেটভর্তি রিবোফ্লোবিন নিয়ে যাই। এখানকার ছেলেমেয়েরা মুখের ঘা-তে খুব ভোগে। চিকিৎসা পায় না। আমার দেয়া রিবোফ্লোবিন এখন জাদুর মতো কাজ করছে। ওরা আমাকে নিজেদের লোক মনে করে। আমাকে আপন ভাবে। যখন কেউ উপজেলা সদরে আসে আমার জন্য হাতে করে বাড়ির কমলা কিংবা অন্য কোনো ফল নিয়ে আসে। শুরুতে আমি ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এমনও হয়েছে, আমার ঘর থেকে বের হয়ে চলে যাওয়ার সময় আস্তে করে বারান্দায় ফলটি রেখে গেছে।’

রুমা উপজেলার ইউএনও বিল্লাল হোসেন এর কাজ নয় চিকিৎসা দেওয়ার। কিন্তু মানবতাবোধ ও আন্তরিকতার কারণে তিনি এই কাজটি করছেন। তার সুফলও পাচ্ছেন। তিনি পুরো উপজেলায় জনপ্রিয় একজন মানুষ। আমি ভাবি, এই লোক কখনো নির্বাচনে দাঁড়ালে নিশ্চিত জিতবে।

রুমা উপজেলার আদিবাসী মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ইউএনও মি. বিল্লাল হোসেনকে শাস্তি পেতে হয়নি। কিন্তু ইন্ডিয়ার ছত্রিশগড় রাজ্যের গরিব রোগীদের জন্য, বিশেষ করে আদিবাসীদের স্বাস্হ্য অধিকার নিয়ে কাজ করার অপরাধে ডাক্তার বিনায়ক সেনকে জেলে আটক করা হয়েছে। চিকিৎসার অভাবে তিনি নিজেই এখন মরতে বসেছেন। তার অপরাধ তিনি গরিবদের স্বাস্হ্য সচেতন করছেন। তিনি তাদেরকে বুঝিয়েছেন, তাদেরও অধিকার আছে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার। তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তার এই ধরনের কর্মকাণ্ডে ইন্ডিয়ার ধনী ও ক্ষমতাশালী মানুষগুলো স্বস্তি পাচ্ছে না। কারণ, আমাদের মতোই ইন্ডিয়ান সমাজেও ধনীরা ইচ্ছা করেই একটি বিভেদরেখা তৈরি করে রেখেছে। বিনায়ন সেনের কর্মকাণ্ডে সেই বিভেদ তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তিনি স্বাস্থ্যর মতো মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রে ধনী ও গরিবের মধ্যে পাথর্ক্য ঘোচাতে চান। ইন্ডিয়া সেটাকে অন্যায় হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশের সমাজেও কিন্তু তাই।

আমার বাবা যখন ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সেসময় সিসিইউতে তার পাশের বেডের এক রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে একদিন সিসিইউর ডিউটি ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন তারা সিসিইউর ভাড়া মেটাতে রাজি আছেন কি না? আত্মীয়-স্বজনরা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বললেন। রোগীর অবস্থার কথা জানতে চাইলেন। ডাক্তার জানালেন, রোগীর মারা যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। তখন আত্মীয়স্বজন সিদ্ধান্ত নিলো, তারা রোগীকে লাইফ সাপোর্ট দেবেন না। অক্সিজেনের মাস্ক খুলে ফেলা হলো। রোগী কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেল। আমি তখন ভাবছি আমি কতোদিন পারবো আমার বাবাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে? বাবার জন্য প্রতিদিন এ দেশের প্রায় ৩০০ গার্মেন্ট শ্রমিকের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ টাকার দরকার হচ্ছে। মনে হলো, আমি সৌভাগ্যবান এখনো বাবার চিকিৎসা করাতে পারছি। এদেশের একজন গার্মেন্ট শ্রমিকের অধিকার নেই তার বাবার চিকিৎসা করানোর।

বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়াটাই এদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের জন্য স্বাভাবিক ব্যবস্হা। তাহলে এই যে চিকিৎসা ব্যবস্হার এতো উন্নতি, এতো আধুনিক যন্ত্রপাতি, তার সুবিধা শুধুই কি ২০ ভাগ মানুষের জন্য?

নিশ্চয়ই নয়।

আমি ২০০৭ সালের কোনো একদিন পান্হপথের এক প্রাইভেট হাসপাতালের পাঁচতারা হোটেল মানের লবিতে বাকসো প্যাটরা নিয়ে এক দরিদ্র পরিবারকে বসে থাকতে দেখেছি। আলাপে জেনেছি তারা জমিজমা বিক্রি করে তাদের প্রিয়জনের শেষ চিকিৎসা করাতে এসেছেন।  জানি না তারা প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন নাকি তার লাশ নিয়ে ফিরেছেন। লাশ নিয়ে ফিরলে কি হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। তবুও আমার এক বন্ধুর পরিবারের কথা বলি। হাসপাতাল থেকে সে তার প্রিয়জনের লাশ নিয়ে যেতে ১৬ দিনে বিল গুনেছে ৮ লাখ টাকা। এখন আমার বন্ধুটি ধারের অর্থ শোধ করছে।

আমাদের এ দেশে আমরা যখন এভাবে চিকিৎসা নিতে হিমশিম খেয়ে যাই। তখন আমাদের রাজনীতিবিদরা কিংবা গরিবের ঘাম-রক্তে বেড়ে ওঠা শিল্পপতিরা নিজ দেশের মানুষের অবস্হা ভুলে গিয়ে সিঙ্গাপুর আর ব্যাংকক চলে যান সামান্য হাঁচি-কাশির চিকিৎসা করাতে।

এই যে অসম এক অবস্হা সেটি নিয়ে কথা বলার মতো দুঃসাহস আমি কিংবা আমার মতো অনেকেই দেখাতে পারি না।  কিন্তু ডাক্তার বিনায়ক সেন দেখিয়েছেন।  অবশ্য এখন তাকে এর জন্য মাশুল দিতে হচ্ছে। এভাবেই কি চলবে?

(এই লেখাটি দৈনিক যায়যায়দিনের স্বাস্থ্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৮ মে; ইষৎ পরিবর্তিত।)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s