সিপিডি, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও আসক আয়োজিত অভিজাতদের সভায় আত্মসমালোচনা ছিলো না


অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, ‘অভিজাত শ্রেণী ক্রমান্বয়ে গণসমাজ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এই অভিজাত শ্রেণী বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ও নীতিনির্ধারণী কাজে নিজেদের স্থায়ী করে নিচ্ছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের জনগণের উপর।’

লক্ষণীয় বিষয় হলো, অধ্যাপক রেহমান সোবহান নিজে এই অভিজাত শ্রেণীর সদস্য। এমনকি যাদের সামনে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন তারাও এই অভিজাত শ্রেণীর সদস্য। মঞ্চে যারা ছিলেন তারাও একই গোত্রের সদস্য। যারা বক্তৃতা দিয়েছেন যেমন, ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর মতিউর রহমান কিংবা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সুলতানা কামাল তারাও কিন্তু ওই শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

প্রথম আলোতে সকালবেলা খবরের শিরোণামটি দেখে মনে হলো জনগণের দিক থেকে দু’টি কথা বলা দরকার। প্রথমত, ধন্যবাদ দেওয়া দরকার অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিদের যারা কষ্ট করে গতকাল ‘একাত্তরের ভাবকল্প ও চার দশকের যাত্রা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। দ্বিতীয়ত, ধন্যবাদ জানাতে চাই অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে যিনি ‘বাংলাদেশ অ্যাট ফরটি: লুকিং ব্যাক এন্ড মুভিং ফরোয়ার্ড’ শিরোণামের প্রায় ৭ হাজার শব্দের মূল প্রবন্ধ লিখেছেন এবং এই বয়সে ১ ঘণ্টা কষ্ট করে সেই প্রবন্ধ পড়েছেন। তৃতীয়ত, ধন্যবাদ দিতে চাই অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার, মানবাধিকার সংগঠন (অধ্যাপক রেহমান সোবহানের প্রয়াত স্ত্রী সালমা সোবহানের প্রতিষ্ঠিত) আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং প্রথম আলো-কে এই ধরনের একটি মহতী সভা আয়োজনের জন্য। অনুষ্ঠানের বক্তারা আমার মতো দেশের সাধারণ নাগরিকদের ভবিষ্যত নিয়ে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন তার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

অধ্যাপক সোবহান বলেছেন, ‘রাজনৈতিক পদ্ধতির অন্যায্যতা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেও অন্যায্যতা তৈরি করছে।’ রাজনীতি ও অর্থনীতি দুটো বিষয়ের সঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মামা শ্বশুর হলেন হোসেন শহীদ সরওয়ার্দি। তাছাড়া উনার শাশুড়ি পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেম্বার ছিলেন। উনার শ্বশুর ছিলেন পাকিন্তানের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব। উনার চাচা শ্বশুর মোহাম্মদ হেদায়েতউল্লাহ ছিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি ও উপরাষ্ট্রপতি। তাঁর বাবা ছিলেন কেনিয়াতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। তার ভাই ফারুক সোবহান চীন, ভারত, মালয়েশিয়াতে রাষ্ট্রদূত থাকা ছাড়াও পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন এবং বর্তমানে সিপিডির মতো আরেকটি থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হলেন সালমান এফ. রহমান। অধ্যাপক রেহমান সোবহান দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুল থেকে লেখাপড়া শেষ করে ক্যামব্রিজ থেকে অর্থনীতিতে পাস করেছেন। সেসময়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন। তিনি গতকালকের অনুষ্ঠানে ছিলেন। রেহমান সোবহান নিজে ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। দুই পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সেটা তিনি তুলে ধরেছিলেন। যেমন, ১৯৬৮ সালে তার লেখা বই ‘Basic Democracies, Works Programme and Rural Development in East Pakistan’ প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরিতে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য নিযুক্ত করেন। ফলে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে গড়ে তোলার সুযোগ তিনি শুরুতেই পেয়েছেন। তাই তিনি যখন গতকালকে বলেন, ‘গত ৪০ বছরে উন্নয়ন কৌশলগুলো অন্যায্যতা ও তীব্র বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশে দু’টি সমাজ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সমসাময়িক এ চরিত্রের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির মিল আছে।’ তখন প্রশ্ন জাগে মনে, এরকম একটা পরিস্থিতিতে তিনি তার নিজের এবং সহকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলছেন না কেন? আত্মসমালোচনা কোথায়?

অধ্যাপক রেহমান সোবহান এরশাদের শাসনামলে দেশে ফিরে এসে বিআইডিএস-এ কাজ করেছেন। সেসময়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে এরশাদের সঙ্গে কাজ করছেন। ওই সময়ে একমাত্র বাংলাদেশী নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হযেছিল। গতকালের অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রেখেছেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন এবং পাকিস্তান সৃষ্টি আন্দোলনের নেতা ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদের পুত্র ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আবুল মনসুর আহমেদ হোসেন শহীদ সরওয়ার্দির মন্ত্রীসভায় ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন। মাহফুজ আনাম তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের রাজনীতি, ব্যবসায় ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুই বাংলাদেশের অস্তিত্বের কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান।

গতকাল অনেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। শুধু আত্মসমালোচনাটাই তারা কখনো করেন না। নিজেদের ব্যর্থতার কথা বলেন না। একে অন্যকে দোষারোপ করেন। জনগণের সামনে ভাবমূর্তি তুলে ধরেন। জনগণ তাদের জ্ঞানদীপ্ত কথা শুনে উদ্দীপ্ত হয়। কিন্তু অভিজাত শ্রেণী সবসময় জনগণ থেকে দূরে থাকে। এমনটা পাকিস্তানের সময়টায় ছিলো। যা রেহমান সোবহান বলেছেন। তাহলে ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশের জনগণ পেলোটা কি? ভিনদেশী শোষক হটিয়ে স্বজাতির শোষণ?

ঢাকা।
৩১ ডিসেম্বর ২০১১

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s