গেরিলা ফাইটার রুমীর বুয়েট এখন নষ্টদের দখলে!


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানেন কিন্তু রুমীকে চেনেন না এমন কেউ নেই। তাঁর মা জাহানারা ইমামের লেখা স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত সম্ভবত একমাত্র অবিতর্কিত বই ‘একাত্তরের দিনগুলো’-তে শহীদ রুমীর বীরত্বের কথা আছে। একাত্তরের ক্র্যাক প্লাটুনের শহীদ রুমী ছিলেন বুয়েটের ছাত্র। যুদ্ধে যোগ দেবেন বলে তিনি আমেরিকার ইলিয়নস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হলেও পড়তে যাননি। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অস্ত্র হাতে শত্রু নিধনে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। ঢাকায় পাকিস্তান আর্মিদের মধ্যে তিনি ত্রাস তৈরি করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারের নিরাপদ আবাস থেকে স্বাধীন দেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছিলেন কিন্তু রুমী স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। বুয়েটিয়ান রুমীরা রক্ত দিয়েছিলেন বলেই দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।

রুমীদের রক্তে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই দেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে রুমীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক ছাত্রকে পিটিয়ে জখম করেছে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনজন ছাত্র। বুয়েট মানেই মেধাবী ছাত্র। দেশের সবগুলো বোর্ডের মেধাবীরা এখানে পড়তে আসে। কিন্তু মেধাবী হওয়াটাই যে যথেষ্ট নয় সেকথা গতকাল প্রমাণিত হলো।

ভালো ছেলে আর ভালো ছাত্রের তফাতটা আমি শিখেছিলাম নটরডেম কলেজের প্রিন্সিপাল ফাদার পিশাতোর কাছ থেকে। আমাদের প্রথম ক্লাসে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা এখানে ভালো ফলাফল করে ভর্তি হয়েছো। আমি চাই তোমরা এসএসসিতে যে যা রেজাল্ট করে এসেছো তারচেয়ে ভালো করো। এটা তোমাদের চেষ্টা থাকবে। কিন্তু যেটা আমি অবশ্যই চাই তোমরা ভালো ছেলে থাকবে। ভালো মানুষ হবে। একটু লেখাপড়া করলে ভালো ছাত্র হওয়া যায় কিন্তু ভালো ছেলে হওয়াটা সারাজীবনের পরিশ্রমের ফল। তোমাদেরকে দেখে যেন সবাই বোঝে তোমরা নটরডেমিয়ান।’

মানুষ হওয়ার শিক্ষা আসতে হয় পরিবার থেকে। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি আমার বাবা শিখিয়েছিলেন তিনটি কথা- ১. সত্য কথা বলবে। ২. কথা দিলে কথা রাখবে। আর যদি কখনো না রাখতে পারো তাহলে যাকে কথা দিয়েছো তাকে আগেভাগে জানাবে। ৩. দেশের আইন মেনে চলবে, যতোক্ষণ পরযন্ত না আইনকে বদলাতে পারো। ২০০৭ সালের ১০ আগস্ট আমার বাবা মারা যাওয়ার আগ পরয্ন্ত আমি দেখেছি আমার বাবা নিজের জীবনে এই কথাগুলো পালন করেছেন। আমি এদেশের ৩০০ ইউনিয়নে সাড়ে চার বছর ধরে কাজ করার সুবাদে এবং সরকারি ও বেসরকারি পরযায়ে গত ২১ বছর ধরে কাজের সুবাদে দেখেছি এই দেশের জাতীয় পরযায় থেকে গ্রাম পরয্ন্ত নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গলদ হলো নেতারা অন্যকে যা করতে বলেন তারা নিজেরা সেটা চর্চা করেন না।

যে কারণে এই দেশে মেধাবী ছেলেমেয়ে তৈরি হয় কিন্তু ভালো ছেলেমেয়ে তৈরি হয় না। ফলে দেশের জন্য শহীদ হওয়া রুমীর বুয়েট আজ মেধাবী নষ্টদের দখলে। লক্ষ্য করুন মেধাবী কিন্তু নষ্ট। যারা ক্ষমতাসীন দলের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করে না। প্রশ্ন হলো একারণেই কি শহীদ রুমী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে যুদ্ধে গিয়েছিলেন? আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব কি জবাব দেবে?

এই লেখাটা আমি শেষ করব এভাবে। অনেক বছর আগে একদিন আমি জানতে পারলাম বিএনপির ছাত্রদলের ব্যানারে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হয়েছে আমার স্কুলের ব্যাক বেঞ্চার দুষ্ট সহপাঠী। সেদিন আমার মনে হয়েছিল মেধাবী ছাত্রদের নেতৃত্ব কিভাবে দেবে আমার সেই দুষ্ট সহপাঠী? সেই প্রশ্নের উত্তর আমি আজো খুঁজে ফিরি। তৃতীয় শ্রেণীর নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম শ্রেণীর দেশ শাসন হয় কি? কে জানে?

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s