আজকের সকালটা অন্যরকম ছিলো


আমি যখন গুলশান দুই নাম্বারে পৌঁছলাম তখন মাত্র সাড়ে সাতটা। তার সঙ্গে আমার দেখা করার কথা সাড়ে আটটায়। পুরো একটি ঘণ্টা আমার হাতে! তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমার প্রস্তুতি নেওয়ারও কিছু নেই। সময় কাটাবার জন্য পার্কটা বেছে নেওয়ার কথা ভাবলাম।

আজকে যে শার্টটা পড়েছি এটা আমার প্রিয় একটা শার্ট। প্রিয় বলেই প্রতিবছর শার্টটা কয়েকদিন পরে তুলে রেখে দেই। যদ্দুর মনে পড়ে ৬ বছর আগে শার্টটা প্রথম পড়েছি। শীত চলে যাওয়া আর গরম আসার আগের সকালগুলোর জন্য এই শার্টটা খুবই উপযোগী। শার্টের ডিজাইনটা এমনই যে কখনোই সেকেলে মনে হয়না। প্রতিবছরই আমাকে শার্টটা পরার পর শুনতে হয়েছে- বাহ আজকে তো তোমাকে ফ্রেশ লাগছে কিংবা ইউ লুক ভেরি স্মার্ট টুডে! আজকেও শুনতে হলো!! গত ছয়বছরে বয়স আরো বেড়েছে। চুলও কমেছে। প্রশংসা শুনতে তো ভালোই লাগে সবার! আমারও!! আজকে সকালে অবশ্য শার্টটা পরে মনে হয়েছে রংটা একটু ফ্যাকাশে হয়েছে। আগামী বছর হয়তো এই শার্টটা আর পড়া যাবে না।

মেয়ে আমাকে গুলশান মোড়ে নামিয়ে দিয়ে স্কুলে চলে গেলো। সকালে এদিকটায় রিকশা থাকে। কিন্তু নরম রোদ আর চমৎকার বাতাস আমাকে হাটতে বলল! গন্তব্য ৬৩ নাম্বার রোড। পথে পার্কে কিছুটা সময় কাটাব। ৭১ নাম্বার রোডের গেট দিয়ে না ঢুকে আমি প্রথমে ঘুরে ৬৩ নাম্বার রোডে চলে গেলাম। ওখান থেকে ঢুকতেই হাতের ডানে দেখি ২০/২৫ জন মহিলার একটি দল। চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। অদূরেই ১০/১২ জন পুরুষ বসা। মহিলাদের কাউকে না চিনলেও পুরুষদের কাউকে কাউকে চিনলাম। দু’জন টিভির পরিচিত মুখ। একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। অন্যজন সাংবাদিক নেতা। তবে তিনি বিএনপি নাকি আওয়ামী লীগ পন্থী সাংবাদিক নেতা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। তাদের পোশাক আষাক ও আড্ডা দেওয়ার ঢং দেখে মনে হলো তারা তাদের জগিং শেষ করেছেন। এখন যাবার আগের আলোচনা। বেশ উচ্চস্বরে কথা বলছেন। আলোচ্য বিষয়- বিরোধী দলীয় সমাবেশ ও সরকারি পদক্ষেপ। কেউ একজন বললেন, বিরোধী দলীয়দের ঢাকা সমাবেশ তো সফল হয়ে গেলো। সরকারই সফল করে দিলো। দেশের মানুষ অলরেডি ভাবতে শুরু করে দিয়েছে সরকার বাধা না দিলে ঢাকায় অন্তত ২০ লাখ লোক যেতো। এখন যদি ৫ হাজার লোকও হয় তাতে কোন ক্ষতি নেই। কারণ যেকারণে ঢাকায় চলো মার্চ করা সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শক্তির জবাব বিএনপি দিয়ে দিয়েছে। অন্য একজন বলল, আওয়ামী লীগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জামাত পন্থীরা এই স্যাবোটাজ করেছে। তারা লঞ্চ স্টিমার চলাচলে বাধা দেওয়া ও হোটেলগুলোতে মৌখিক নির্দেশ দেওয়ার কাজটি সরকারকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে। যেহেতু ঢাকায় লোক আনতে পারবে না তাই। কেউ কেউ মাথা নাড়ছেন। তাদের একজন বললেন, এটা মোটেই ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের মধ্যে জামাত আসবে কোথা থেকে। তার হয়তো আরো কিছু বলার ছিলো কিন্তু তার কথা কেড়ে নিয়ে আরেকজন বললেন, আওয়ামী লীগকে তো চালাচ্ছে জামাত আর সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন। আর আছে জাসদের লোকজন। আওয়ামী লীগ কয়জন আছে? আড্ডায় যারা তারা সবাই সবাইকে চেনে। কে কেন কি বলছে তাও তাদের জানা। আমার হঠাৎ মনে হলো কাছাকাছি আমার থাকাটা তাদেরকে অস্বস্তি দিচ্ছে। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করলাম যেন আমার যাবার সময় হয়েছে। আমি আরো একটু ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কালো রংয়ের গার্ডেন চেয়ারটা আমাকে টানছিলো। ওখানে গিয়ে বসলাম। তখনো অনেক নারী পুরুষ হাটছে পার্কের মধ্যে। বেশিরভাগই অবসর জীবনযাপনকারী। এই সমাজের হোমরা চোমরা। ধনী মানুষ। যাদের সবারই হয়তো এখানে বাড়ি আছে। কিংবা এখানে ভাড়া থাকেন। নিঃসন্দেহে এরা সমাজ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের সেই ভূমিকা সমাজের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে সেটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি! আমার মধ্যে হঠাৎ করেই প্রচন্ড একটি ইচ্ছে মাথা চাড়া দিলো। জনে জনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করল- আচ্ছা আপনি কি আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন? আপনি যা করেছেন তা কি আরো ভালোভাবে করার সুযোগ ছিলো?

লেকের পানি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ওয়াকওয়েটা নতুন বানানো হয়েছে। চেয়ারে বসেও বেশ আরাম পাচ্ছি। তবে গাছের সংখ্যা কম হওয়ায় রোদটা চোখে এসে পড়তে লাগল। ঘড়ির কাটা মনে করিয়ে দিলো উঠতে হবে। তার সঙ্গে আমার দেখা করার কথা সাড়ে আটটায়। আমি যখন তার ফ্লাটে পৌঁছলাম ঘড়ির কাটা তখন সাড়ে আটটায়!

 

 

Advertisements

4 thoughts on “আজকের সকালটা অন্যরকম ছিলো

  1. বাহ! ছোটগল্পে দেখি আপনি মেলা লোকের ভাত মেরে দিতেন দাদা… ওই হারামী মহিলাদের নিয়ে লেখাটা নিয়ে যে খেদ ছিলো, এটা পড়ে পুরোটা উসুল হয়ে গেলো! আজকের রোদ ঝলমলে দিনটায় আমিও আপনাকে মনে করে একটা পাটতোলা প্রিয় শার্ট পরে বেরুই… অনেক ধন্যবাদ! 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s