সাবিলার ৫টি কারণ জানতে চাওয়া এবং আমার উত্তর


ফেসবুকের ছোট বোন সাবিলা ইনুন একটি স্ট্যাটাস দিয়ে জানতে চেয়েছে ‘কেউ আমারে ৫টা কারন দেখাও যেইগুলির জন্য আমি বাংলাদেশে থাকবো?’ গতকালকে তার দেওয়া সেই স্ট্যাটাসে আমি মন্তব্য করেছিলাম, ‘তুমি বরং ৫টি কারণ দেখাও যেগুলোর জন্য আমি বাংলাদেশ ছাড়বো?’

কিন্তু ১২ ঘণ্টা পরেও সাবিলার কোন উত্তর পাইনি। আসলে প্রশ্নের উত্তর তো প্রশ্ন দিয়ে হয় না। সেকারণে বোধহয় সাবিলা জবাব দেয়নি। যদিও খানিকক্ষণ আগে আমি বলেছি- সাবিলা, প্রশ্ন করে কি তুমি হারিয়ে গেলে? তোমার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তুমি আমাকে ৫টি কারণ দেখাও যেগুলোর জন্য আমি বাংলাদেশ ছাড়বো। আমি কথা দিচ্ছি তুমি কারণগুলো বলার পরপরই আমি তোমাকে ৫টি কারণ বলে দেব যেকারণে তুমি বাংলাদেশে থাকবে। আমি নিশ্চিত যে তখন তুমি নিজেই আরো কারণ খুঁজে পাবে বাংলাদেশে থাকার। কি কখন সাড়া দেবে!

তবে আমি সাবিলা ইনুনের উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে বরং ওর করা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমি কয়েকটা বাস্তব ঘটনা বলব। বিতর্ক এড়ানোর জন্য আমি নাম ও পরিচয় উল্লেখ করব না। কিংবা ছদ্মনাম ব্যবহার করব।

১. সাবিলা তুমি একজন প্রযুক্তিবিদ। বাংলাদেশে দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের সঙ্কট রয়েছে। ফলে তাদের চাহিদা আছে। যেকারণে দেখা যায় বিদেশ থেকে প্রযুক্তিবিদদের কেউ কেউ দেশে ফেরত আসছেন। এখানে তারা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ভালো আয়ও করছেন। যারা একটু সুযোগ সন্ধানী এবং সুযোগ পাওয়ার জন্য ন্যায় ও নীতিবোধ বিসর্জন দিতে দেরি করে না তারা আবার অন্যদের চেয়ে ভালো করছে।

তুমি যদি খোঁজ নাও তাহলে জানতে পারবে এই দেশে ভিওআইপি করার মাধ্যমে অঢেল অর্থ আয় করার সুযোগ পেতে বিদেশ থেকে বেশ কিছু প্রযুক্তিবিদ বিভিন্ন সময়ে দেশে এসেছেন। তারা এখানকার ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিবার, প্রভাবশালী পরিবার কিংবা বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবার ও মিডিয়ার সহায়তায় নিজেদের প্রযুক্তি জ্ঞানকে কাজকে লাগিয়ে বৈধ ও অবৈধ পন্থার সমন্বয়ে প্রচুর অর্থ কামাই করছে। কেউ কেউ পিএসটিএন কোম্পানির আড়ালে এই কাজ করেছে।

এমন সহজ অর্থ আয় করার সুযোগ তুমি বিশ্বের অন্য কোথাও পাবে না। তারচেয়েও বড় কথা হলো এভাবে অবৈধ অর্থ আয় করার পরও তুমি সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবে। তোমার একটি বিশাল ভক্তকুল থাকবে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাবে। হাত তালি পাবে। বাহবা পাবে। আইন না মানার পরও বিত্ত, বৈভব, বিলাস, মানুষের প্রশংসা, রাষ্ট্রীয় সম্মান সব কিছু পাবার এমন মওকা পৃথিবীর আর কোথায় পাবে?

আরো মজার হলো, এই আয় দিয়ে তুমি চাইলেই যখন তখন বিদেশে যেতে পারবে। বিদেশে সম্পদ করতে পারবে। বিদেশী পাসপোর্ট নিতে পারবে। দেশে কামাই করবে আর বিদেশে খরচ করবে। আরো মজা হলো কোন এক বিদেশ থেকে মাঝে মাঝে দেশে আসা প্রযুক্তিবিদের মতো বন্ধুদের আড্ডায় বলতে পারবে, ‘প্লেনে সারাবছর এতো সময় ধরে বসে থাকতে হয় যে, নিতম্ব ব্যথা করে।’ পত্রিকায় কলাম লেখার সময় কিংবা বক্তৃতায় নিতম্ব না বলে তার মতো বলবে, ‘প্লেনে এতোবার উঠেছি যে এখন আর প্লেনে বসে থাকতে ভালো লাগে না।’

২. প্রায় ২০ বছর আগে কয়েক মিলিয়ন ডলার (সম্ভবত ২ মিলিয়ন) বিনিয়োগ করার বিনিময়ে কানাডায় স্থায়ী হয়েছিলেন এক দম্পতি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সেখানে গিয়ে তারা দেখলেন সকালে বিছানায় শুয়ে কাউকে ডাকা যায় না। গাড়িটা নিজেকেই বের করতে হয়। রান্নার কাজটাও কেউ করে দেয়া না। এমনকি বাজার করা, তরকারি কাটাকুটি করা সবই নিজেকে করতে হয়। কয়েকবছর পর তারা দেশে ফেরত চলে আসেন। এখানে নামী দামী লোকজনের সঙ্গে উঠাবসা করা। এলিট শ্রেণীর মরযাদা পাওয়ার যে আমেজ সেটা কিন্তু বিদেশে তিনি পাননি। সবচেয়ে বড় কথা ঘরে আট দশটা কাজের লোক, কয়েকটা গাড়ি ও ড্রাইভার এবং অফিসে ফুট ফরমায়েশ খাটার জন্য ব্যক্তিগত ডজনখানেক লোক রাখার যে অনাবিল আনন্দ সেটা কিন্তু বিদেশে পাননি। কানাডা থেকে চলে আসার কারণ হিসেবে সেকথাই বলেছিলেন।

৩. তুমি যখন বিদেশ যেতে চাচ্ছো তখন বিদেশী ডিগ্রীধারী কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী দেশে ফিরছেন। তারা সবাই যে মৌচাকের মধু খেতে ফেরত আসছেন তা নয়। কিন্তু সাবিলা তুমি তো জানো তাদের মধ্যে কতিপয় ওই কাজটি করতেই ফেরত আসছেন। তারা তাদের বিবাহ সূত্রে কিংবা জন্মসূত্রে মৌচাকে সহজেই হাত দিতে পারছেন। তোমার যদি বিবাহ কিংবা জন্মসূত্রে সেই ‍সুবিধা থাকে তবে বিদেশে কেন যাবে?

এবার দু’টো ভিন্ন কারণ বলব দেশে থাকার।

এক. তুমি এই দেশে জন্ম নিয়েছো। এখানকার স্কুলে, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছো। এই দেশের বাতাস সেবন করেছো। এখন এই দেশকে কিছুটা হলেও ফেরত দেওয়ার দায় বর্তেছে তোমার উপর। লক্ষ্য করো, তোমার মতো এই দেশের বাকি সবাই সুযোগ পায়নি। সেই অর্থে তুমি সৌভাগ্যবান। এখন তোমার দায়িত্ব হলো তাদেরকে দেওয়া।

দুই. যে মিথ্যার সংস্কৃতি ও ভন্ডামি গড়ে উঠেছে এই দেশে। সেই সংস্কৃতি ও ভন্ডামিকে দূর করে দেশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার এবং স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে এই দেশকে সকলের জন্য বাসযোগ্য করার দায়িত্ব তোমারও। যে সুবিধাভোগী মানুষের অপরাধচক্রে সম অধিকারসম্পন্ন অন্য মানুষেরা নিজেদের অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উদাহরণ তৈরির জন্যও এই দেশে সত্য ও সচেতন মানুষের থাকা প্রয়োজন।

আরো অনেক কিছুই বলতে পারি। পরে আরো বলব। ৫টি কারণ তো বলা শেষ!

সবশেষে বলব। দেশপ্রেম মানে কিছু লেখা, কবিতা, গল্প আর বক্তৃতা নয়। দেশপ্রেম হলো যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাওয়া। ভালো থেকো সাবিলা!

Advertisements

2 thoughts on “সাবিলার ৫টি কারণ জানতে চাওয়া এবং আমার উত্তর

  1. পিংব্যাকঃ কেন আমি বাংলাদেশে থাকব? « আজকের সেরা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s