মদের দুনিয়া ও পরযটন


এক.

মদ খাবো, জম্পেশ আড্ডা দেব আর ঘুরে বেড়াব। নেপালে ঘুরতে যাওয়ার আগে কথাগুলো বলছিলেন একজন পরযটক। নেপালে পান সিগারেটের দোকানে, অলিতে গলিতে সব জায়গায় স্বল্পমূল্যে নানান জাতের মদ পাওয়া যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানুষেরা কখনো একাকী, কখনো দলবদ্ধ হয়ে নেপালের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মদ খাওয়া উপভোগ করে। নেপালের হোটেলগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আড্ডা। আগুন বা হিটার ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলো মদের গ্লাসে বা বোতলে চুমুক দিতে দিতে পরিচিত হয়। নেপালের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো এই পরযটন। তাদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের একটি বড় ক্ষেত্রও পরযটন। তবে একথা ভাবার দরকার নেই যে, নেপালে যারা যায় তারা শুধু মদ খেতেই যায়। নেপালে দেখা ও করার অনেক কিছু আছে। কিন্তু চাইলেই মদ খাওয়া যায় সেটা বিদেশী পরযটকদের বাড়তি স্বস্তির কারণ। বাংলাদেশসহ এশিয়ার পরযটকদের জন্য এটি একটি বাড়তি আকর্ষণ। নেপালে বছরে প্রায় ৬ লাখ পরযটক যায় এবং তারা গড়ে ১১ দিন অবস্থান করে। এদের মধ্যে অর্ধেক হলো এশিয়ার পরযটক।

দুই.

মদ খাওয়া পরযটনের সঙ্গে কতোটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সেটা বোঝা যায় ‘ওয়াইন টুরিজম’ শব্দটার দিকে তাকালে! মদ উৎপাদনকারী দেশগুলো মদপ্রিয় মানুষদের প্রতি লক্ষ্য রেখে মদকে ঘিরে বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। একসময় স্পেন, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স ও ইটালি ওয়াইন টুরিজমে নেতৃত্ব দিলেও এখন অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, চিলি, আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা এগিয়ে গিয়েছে।

তিন.

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় পৌনে তিন কোটি টন মদ তৈরি হচ্ছে। মদ উৎপাদনের দিক থেকে এক নাম্বার দেশ হলো ইটালি। মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ তারা উৎপাদন করে। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, স্পেন ও আমেরিকা। বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন মদ উৎপাদন করে পাঁচ নাম্বারে রয়েছে চীন। তালিকার ৬ থেকে ১০ নাম্বারে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি ও জার্মানী। তবে মদ খাওয়ার দিক থেকে এরা কেউ নয় এক নাম্বারে রয়েছে মলদোভার নাগরিক। দেশটিতে মাথাপিছু বছরে মদ খাওয়ার পরিমাণ ১৮.২২ লিটার। যা বিশ্ব গড় ৬.১ লিটারের তিন গুণ।

চার.

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও মদের বাজার নেহায়েত ছোট নয়। এই অঞ্চলের যে দেশগুলোতে পরযটকদের আনাগোনা আছে সেখানে মদের উপস্থিতিও আছে। ইন্দোনেশিয়া, মালযেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে মদের সরবরাহ সমান নয়। পরযটকদের সংখ্যা ও তাদের অবস্থানের মেয়াদকালও সমান নয়। এই দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াতে প্রকাশ্যে মদ পানের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

পাঁচ.

এই তালিকায় দেশী মদের কথা ধরা হয়নি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মদের কথাই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সবদেশেই বাড়িতে ব্যক্তি উদ্যোগে সীমিত আকারে এবং সীমিত এলাকায় বিক্রির জন্য মদ উৎপাদন ও বিক্রি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে এবং পার্বত্য এলাকায় দেশী মদের উৎপাদন ও ব্যবহার আছে। প্রতিবছর ভেজাল মদ খেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে থাকে। গত কয়েকবছর ধরে হেলথ ড্রিংকের নামে স্বল্পমাত্রার মদ ও বিয়ারের প্রচলন বাংলাদেশে বেড়েছে। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে হোটেলে ও পরযটন কেন্দ্রগুলোতে অবৈধভাবে মদ কেনাবেচা চললে। অথচ এই দেশে বিদেশী পরযটকগণ শস্তায় মদ খাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ!

দেশের সংস্কৃতি এবং মানুষের সামাজিক মূল্যবোধে আঘাত না করেও কিভাবে মদকে পরযটকদের কাছে স্বল্পমূল্যে পৌঁছে দেওয়া যায় সেব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকেই। সেসঙ্গে সমাজে হেলথ ড্রিংকের নামে অবাধে মদ ও মাদক জাতীয় পণ্যের যে বাণিজ্য তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যারা দায়িত্ব নিয়েছেন সমাজ চালানোর এই দায়িত্ব তাদেরই।

Advertisements

One thought on “মদের দুনিয়া ও পরযটন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s