এনাম মিয়া সংসদে, সিনেটে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, দূতাবাসে, সচিবালয়ে এবং……


মি. এনাম মিয়া এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ। সাবেক অটোরিকশাচালক এনাম মিয়া এখন একজন পেশাদার বক্তা। কোর্স করাচ্ছেন ‘চরিত্র গঠনের উপর।’ অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছিল বক্তৃতার জন্য বিল ক্লিনটনের মতো একটি বড় সড় অঙ্কের অর্থ নিতে। তিনি রাজী হননি। তার মনে হয়েছে তার অনেক টাকা দরকার নেই। বরং তিনি চান সবাই তার মতো হোক। সততা দিয়ে সমাজকে সুন্দর করুক।

তিনি কখনো নিজেকে লোভী ভূমি দস্যু হিসেবে দেখতে চান না। যেখানে শর্ত ছিলো দৌড়ে সন্ধ্যার আগে যতোটা জমি ঘুরে আসতে পারবে সবটা তার হবে জেনে লোভের বশবর্তী হয়ে এতোটাই বেশি দৌডেছিল যে শেষ পরযন্ত ফিরে এসে মৃত্যুর কোলে  ঢলে পড়েছিল। আর জায়গা হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন জমিতে।

নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে এনাম মিয়া এই গল্পটিও বলে থাকেন। তার জীবনের গল্পটা খুবই সহজ একটি গল্প। সেই সহজ গল্পটিই একদার অটোরিকশাচালক এনাম মিয়াকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছিল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে।

২০১২ সালের ৩ মে তার অটোরিকশায় যাত্রী হয়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজ শ্রাবণী শর্মা। অটোরিকশা থেকে নামার সময় ভুলে তিনি তার ব্যাগটি ফেলে যান। ওই ব্যাগে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে একটা মোবাইল ফোন, স্বর্ণের চেইন এবং নগদ ১৩ হাজার টাকা ছিলো। এনাম মিয়া সেগুলো ব্যাগের মালিককে খুঁজে বের করে ফেরত দিয়েছেন। ব্যাগ ফেরত পেয়ে খুশি আর বিষ্ময়ে হতবাক শ্রাবণী শর্মা যখন এনাম মিয়াকে ইনাম বা বখশিশ দিতে চাইলেন তখন এনাম মিয়া সেটা নিতে অস্বীকার করে বললেন, ‘ছোটবেলায় পরিবার থেকে শিক্ষা পেয়েছি, অন্যের জিনিসের প্রতি কখনো লোভ করতে নেই।’

এনাম মিয়ার এই বক্তব্যটি এমন একটি দেশে বসে শুনতে হয়েছে যেখানে ব্যতিক্রম ছাড়া সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট ও শিক্ষকদের পরিবার, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিবার, সচিবালয়ের আমলাদের পরিবারসহ দেশের নেতৃস্থানীয় পরিবারগুলোতে শেখানো হয় কি করে অন্যের জিনিস হাপিস করে দেয়া যাবে। অন্যের অধিকারকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে হবে। কিভাবে অন্যের জমি দখল করতে হবে।

শ্রাবণী শর্মার মতো আমিও অবাক হয়েছি। কিন্তু এনাম মিয়ার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আমি করব না। আমি তাকে শুধু ধন্যবাদ দেব ব্যাগটি কষ্ট করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এর বেশি কিছু নয়। কারণ, তিনি যা করেছেন সেটাই এই দেশের প্রতিটি পরিবারের সকল সন্তানের করার কথা। তিনি একটি স্বাভাবিক কাজ করেছেন। অন্যরা অস্বাভাবিক কাজ করছে বলে তাদেরকে নিন্দা জানাই। আর আহ্বান জানাই এই দেশের আমলা, বিচারপতি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মিডিয়া কর্মী, সম্পাদক, লেখক, পেশাজীবি সকলে এনাম মিয়ার সততা থেকে শিখুন। বিশেষ করে একটি কথা জেনে নিন- ‘অন্যের জিনিসের প্রতি কখনো লোভ করতে নেই।’ আসুন আমরা এনাম মিয়াদের সংসদে, সিনেটে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসে, সচিবালয়ে, মিডিয়াতে, সব জায়গায় জায়গা করে দেই। তাদেরকে আমন্ত্রণ জানাই বক্তব্য দেওয়ার জন্য। সততার কথা বলার জন্য। সবশেষে ধন্যবাদ জানাই এনাম মিয়ার পরিবারকে, সন্তানকে সততা শেখানোর জন্য। এনাম মিয়ার বর্তমান কাজটি আমার কল্পনা হলেও। এটাই এখন বেশি দরকার।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s