অচেনামানুষের প্রিয় গালি ও জীবনের ভাগা মিলানোর অক্লান্ত চেষ্টা


কমোডে বসে সামনের দেওয়াল জুড়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে অচেনামানুষ। দুনিয়াতে এতো নাম থাকতে তার নামটা কে বলেছিল “অচেনামানুষ” রাখতে। এনিয়ে তাকে কতো ঝামেলাতেই না পড়তে হয়েছে এই জীবনে। এখন অবশ্য সেই ঝামেলা মিটেছে। তার নাম এখন আর গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। সে নিজেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক অচেনামানুষ এই সব নাম নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবনাটা চালিযে যেতে পারল না। কারণ আজকে তার জন্য আরো একটি বিশেষ দিন।

অচেনামানুষের কাছে নিজের জীবনটাকে কৌতুকময় মনে হয়। সকালে তার দিনটা শুরু হয় খাটের বা পাশ দিয়ে নামার মধ্য দিয়ে। রাতে যে ভঙ্গিমাতেই ঘুমাক না কেন, ঘুম ভাঙ্গার পর বা দিকে কাত হয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকাটা অচেনামানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এসসময়টায় তার পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঘায়েল করার আজকের দিনের ছকটি মনে মনে সাজিয়ে নেয়। এরপর খাট থেকে নেমে আর্ম চেয়ারে বসে পাশের শ্বেত পাথরের টেবিলে থাকা ১০০ বছরের পুরনো চীনামাটির পাত্রে রাখা পানিটুকু ঢক ঢক করে গিলে ফেলে। আর মনে মনে ভাবে সকল প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুকে সে গিলে ফেলল। এতে তার অপার আনন্দ হয়। এরপর সে বারান্দায় এসে কিছু সময় পায়চারি করে। এটি হলো তার টয়লেট সারার প্রস্তুতি। অনেকদিনের অভ্যাস। চাপটা চলে আসি আসি করার সময় বারান্দা থেকে টয়লেটমুখী হয় অচেনামানুষ। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

টয়লেটের কমোডটা প্রশস্ত। দেশি কমোডের মতো খাড়া ও সরু নয়। একটু প্রশস্ত ও নিচু। লাগানো হয়েছে এমনভাবে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসলেও ক্লান্তি না আসে। কমোডে বসার পরের সময়গুলো সবসময় একরকম হয় না। তবে এসময়টায় নিজেকে সে টেনশন ফ্রি রাখতে চায়। প্রিয় ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছে খাওয়া ও টয়লেট সারার সময় কোন রকমের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা থাকা চলবে না। বাথরুমের দেওয়াল জুড়ে বড় বড় আয়না সে একারণেই লাগিয়েছে। নিজেকে দেখার জন্য। নিজের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য। ইদানীংকালে শরীরটা একটু ভারী হয়েছে তাও নিজেকে নিজের কাছে খুব একটা খারাপ লাগে না। এই বয়সে তো আর কোকাকোলোর বোতল হওয়া যাবে না! নিজের রসিকতায় নিজেরই হাসি পেল। পরক্ষণেই মনে হলো আজকাল খাটো ধরনের যে কোকাকোলার বোতল বের হয়েছে তারে সঙ্গে তাকে বেশ মানিয়ে যায়।

সকালে বাথরুমের কমোডের জন্য অচেনামানুষের বরাদ্দ আধাঘণ্টা। তবে সবসময় সেই সময় মেনে সবকিছু হয় না। তাতে অবশ্য অচেনামানুষ তেমন কিছু মনে করে না। আজকেও একটু দেরি হচ্ছে দেখে অচেনামানুষ কমোডের ডানপাশের দেওয়ালের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা মিনি ফ্রিজের স্লাইডিং দরজা ঢেলে ওখান থেকে একটা ছোট বোতল নিয়ে চুমুক দিতে শুরু করল। এটি কোন সাধারণ জুস নয়। বিশেষভাবে তৈরি এই জুস কিছু বিশেষ পরিবারের জন্য তৈরি করা হয়। রেসিপিটা স্পেনের। কিন্তু এর মূল গ্রাহক আরবের কয়েকটি শেখ পরিবার এবং বিশ্বের কয়েকটি স্বৈরশাসক পরিবার, যাদের অগাধ টাকা। এতো টাকা যে কতো টাকা আছে তারা নিজেরাও জানে না। বাংলাদেশের কাছাকাছি বার্মা এবং উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসকরা এটা পেয়ে থাকে। এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও লাওসের গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকরা পায়। এর বাইরে পৃথিবীতে যে অল্পকয়েকজন এই জুসের সরবরাহ পেয়ে থাকে অচেনামানুষ তাদের একজন। নিজের সৌভাগ্যকে অচেনামানুষের নিজেরই মাঝে মাঝে হিংসে হয়।

অচেনামানুষ তার জীবনের সাফল্যগুলো দু’ভাবে উপভোগ করে। একটি ব্যক্তিগতভাবে। অন্যটি সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। আজকে অচেনামানুষের জন্য একটি বিশেষ দিন। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার রেটিংয়ে ‘ভোক্তা-বান্ধব’ কোম্পানি হিসেবে তার কোম্পানি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মধ্যে এক নাম্বারে এবং বিশ্বের মধ্যে ১০ নাম্বারে অবস্থান করছে। মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি তার পিছনে পড়েছে। দেশে তো কথাই নেই। সবই তার পিছনে। হোক সেটা মাল্টিন্যাশনাল গ্রামীণ ফোন, বাটা কিংবা নেসলে; কিংবা  হোক দেশি কোম্পানি প্রয়াত আমজাদ খান চৌধুরীর প্রাণ, স্যামসান এইচ চৌধুরীর স্কয়ার, বসুন্ধরা, যমুনা কিংবা লতিফুর রহমানের ট্রান্সকম। লতিফুর রহমানের কথা মনে পড়তেই অচেনামানুষের মেজাজটা খিচড়ে গেলো। পৃথিবীর সেরা জুসও তার মুখে বিস্বাদ ঠেকলো। মুখ থেকে বের হয়ে এলো তার প্রিয় গালি- ‘মাদারচোদ’।

অচেনামানুষ ভেবে পায় না, বাংলাদেশে কিভাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করা যায়? এই দেশে ব্যবসা করবে অথচ ট্যাক্স ফাঁকি দেবে না কিংবা কালো টাকা সাদা করবে না, তাহলে কীভাবে সে বড় ব্যবসায়ী হয়? ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ও সরকারি অফিসের পদে পদে যে দুনীতিগ্রস্ত মানুষেরা বসে আছে তাদেরকে টপকিয়ে ব্যবসা করার চিন্তা তো কেউই করতে পারার কথা না। তাহলে লতিফুর রহমান কি করে করল? কিংবা স্যামসান এইচ চৌধুরী? ভাবতে ভাবতেই অচেনামানুষ ফ্রিজের পাশের বাটনটি টিপে দিল। একটা গোপন ড্রয়ার বের এলো। সেখান থেকে লাল রংয়ের ছোট নোট খাতাটা নিয়ে প্রশ্নটা ‍টুকে রাখল। ভাবল স্যামসান এইচ চৌধুরী তো বেঁচে নেই, তাই লতিফুর রহমানকে একবার ডিনারে ডাকলে কেমন হয়। তার কাছ থেকে তখন জানতে হবে ব্যবসা সংক্রান্ত পদকটা লতিফুর রহমান কীভাবে পেলো। এমনটা ভাবতে ভাবতেই অচেনামানুষ ফোন নিয়ে একটা বিশেষ নাম্বারে ফোন করল। অপরপ্রান্তে ফোনটা যে ধরল সে তো মহাখুশি। কারণ জানে এই ক্লায়েন্টের কাজ করা মানে অঢেল অর্থ কামাইয়ের সুযোগ। ফোনালাপ শেষ হলো অপর প্রান্তের আশ্বাসের বাণীতে- আপনি চিন্তা করবেন না। লতিফুর রহমানের চেয়েও বড় কোন পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া লতিফুর রহমান তো শুধুমাত্র তার পত্রিকাগুলোতে কাভারেজ পাচ্ছে। আমরা প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় শুধু পত্রিকার নামটা রেখে পত্রিকার বাকিটুকুতে আপনার ছবি ছাপানোর ব্যবস্থা করব।…………..অচেনামানুষ বাকি কথাগুলো না শুনে ফোনটা পাশেই রেখে দিলো। লাইন কাটলো না। সে জানে অপর প্রান্ত থেকে আরো কিছুক্ষণ এই ধরনের আবোল তাবোল তোষামোদি কথা বলবে। এটা “পয়সা দিয়ে কেনা কুত্তাগুলোর একটা সমস্যা”। তবে একথা ঠিক যে এরা কুকুরের মতোই প্রভুভক্ত। অচেনামানুষ জানে তার লোকেরা পুরস্কারের ব্যবস্থা ঠিকই করবে কিন্তু প্রচার কিছুটা কম হবে। অচেনামানুষ প্রচারের জন্য কখনো আলাদা করে খরচ করতে রাজী নয়। এমনিতেই প্রতি মাসে তার কোম্পানিগুলো থেকে বিপুল টাকার বিজ্ঞাপন পত্রিকাগুলোতে দেওয়া হয়। সবগুলো মিডিয়ার কিছু সাংবাদিককে অচেনামানুষ মাসোহারা দেয়। এরপর আবার খবর ছাপতে আলাদা করে টাকা দিতে সে রাজী নয়। তার লোকজনও সে কথা জানে।

অচেনামানুষ এখন উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়। এজন্য তার কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার দরকার। তেমনই একটি পুরস্কার জোগাড় করা হয়েছে। ফরচুন ৫০০ কিংবা ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনীদের তালিকায় তার নাম না থাকলেও উভয় পত্রিকায় লজ্জায় ফেলে দিতে পেরেছে তার সর্বশেষ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ভোক্তার প্রতি কমিটমেন্টের দিক থেকে তার কোম্পানির পণ্য ব্যবহারকারীদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গিয়েছে যে তার কোম্পানির প্রতি জনগণের আস্থা বিশ্বের নামী দামী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১০ নাম্বারে। বাংলাদেশের মধ্যে এক নাম্বারে। তার প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৮১.৩ শতাংশ। যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রামীণ ফোন পেয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ ভোট। যদিও বিষ্ময়করভাবে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আড়ং পেয়েছে ৫ শতাংশ ভোট। প্রাণ গ্রুপের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৩ শতাংশ। আর লতিফুর রহমানের ট্রান্সকমের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম। ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানিও আন্তর্জাতিকভাবে তার কোম্পানির পেছনে রয়েছে। অবশ্য জরিপটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য টেসকো কোম্পানিকেও ওয়ালমার্টের আগে দেওয়া হয়েছে। দুনিয়াটা এমনই। সবকিছুতেই কেউ না কেউ প্রশ্ন তোলে। এতে কান দেওয়ার কিছু নেই। এই তো সেদিন নোবেল কমিটির পুরস্কার দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাতে কি হয়েছে? নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত বদলে গিয়েছে? প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াটাও আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার অংশ। এতে বিষয়গুলো আরো বেশি সময় ধরে মিডিয়াতে থাকে। সেখান থেকে কেউ কেউ লাভবানও হয়। অচেনামানুষ নিজেও কতোবার লাভবান হয়েছে।  সে যখন তার কোম্পানিগুলোর মোট কর্মীর মধ্যে ৭৮ শতাংশ নারীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেল তখন গার্মেন্টস মালিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলল তাদের কোম্পানিতে প্রায় শতভাগ নারীরা কাজ করে অথচ পুরস্কার পেল অচেনামানুষ? এই ধরনের প্রশ্ন থাকবেই।

এই তো গতবার তার পরিচালিত একটি প্রাইভেট স্কুলে সবাই ল্যাপটপ ব্যবহার করায় তাকে ডিজিটাল স্কুল ইন ডেভেলপিং কান্ট্রি পুরস্কার দেওয়া হলো তখন কেউ কেউ প্রশ্ন তুলল সেই পুরস্কার নিয়ে। ফলে, তার ভোক্তা বান্ধব কোম্পানির মর্যাদা পাওয়ায় অনেকেরই পিত্তি জ্বলবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তারা কি কখনো ভেবে দেখেছে অচেনামানুষ কেন এই কাজটি করছে। সে তো এটা নিজের জন্য করছে না। সে করছে দেশের স্বার্থের জন্য। আফ্রিকা ও উত্তর আমিরকায় তার ব্যবসা সম্প্রসারণ হলে শেষ পরযন্ত কে লাভবান হবে? বাংলাদেশ লাভবান হবে। তার ব্যক্তিগত লাভ কি হবে? ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট কিংবা এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি পদের লড়াইতে আগামীতে সে জিততে পারবে, এটুকুই তো। এমন পদগুলোতে সে যে থাকতে চায় সেটা তো দেশের ব্যবসার স্বার্থেই নাকি নিজের স্বার্থে। “ব্লাডি বাস্টার্ড বাঙ্গালী কখনোই বুঝলো না।” অমৃতরসে শেষ চুমুকটি দিয়ে টয়লেট পর্ব শেষ করার দিকে মনোযোগী হলো অচেনামানুষ, কারণ তাকে আরেকটি দিন শুরু করতে হবে………………….যেখানে তার জীবনের এই গোপন ভাগটুকুর প্রকাশ থাকা চলবে না………………দূরে কোথাও বোধহয় একটি কাক ডেকে উঠল…………..

(মাসুদ রানা বইয়ের মতো এই গল্পের কাঠামো ও চরিত্রগুলো কাল্পনিক। এর সঙ্গে কেউ নিজের মিল খুঁজে পেলে সেটা কাকতালীয়মাত্র।)

 

2 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s