পরকীয়ার রকমফের-৩


সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সীরা সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বস্ত বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া বিয়ের আগে প্রেমের সময়টায় কেউ কেউ একাধিক সম্পর্কে জড়ায়। তাদের যুক্তি হলো বিয়ের পর তো আর এসব করা যাবে না। গবেষণায় দেখা যায়, এই ধরনের চরিত্রগুলো বিয়ের পরও নিজেদের আচরণ সামলাতে পারেন না। তাছাড়া প্রেমের সময় সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বস্ততাও কিন্তু এক ধরনের পরকীয়া।

অনেকেই জানতে চেয়েছেন, তিনি কি করে বুঝবেন যে সঙ্গী তাকে তাকে ঠকাচ্ছে? সেটা কিন্তু বোঝা যায়। এনিয়ে আগামী কোন এক পর্বে লিখব। আজকে বরং পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার কিছু কারণের দিকে চোখ ফেরাব।

বিবাহিতদের পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার মূল কারণ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন। যদিও সেকথা তারা নিজেদের মধ্যেও প্রকাশ্যে প্রকাশ করেন না। ভদ্রতার খাতিরে এবং নিজেদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ থেকেই হয়তো তারা সেটা করেন না। তবে সম্পর্ক তৈরির পর মূল উদ্দেশ্যের দিকে তারা দ্রুত এগিয়ে যান। এই ধরনের পরকীয়ার সম্পর্কগুলো খুব বেশি স্থায়ী হয় না। গত পর্বে জানিয়েছিলাম, পরকীয়ায় লিপ্ত নারী ও পুরুষ সাধারণত গড়ে দুই বছরের মধ্যে এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসে। মূলত সেক্সকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই পরকীয়া সম্পর্কগুলোর স্থায়িত্ব কম হয়।

বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা যায় ১৯৫০ এর দশকের পর থেকে পরকীয়ার সংখ্যা বাড়ছে। যেমন আমেরিকাতে ১৯৫০ এর দশকে ২৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত আমেরিকানদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হতো ১৯৮৩ সালের জরিপে দেখা যায় সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে ২৯ শতাংশ। যারা সেক্সের কারণে পরকীয়ায় জড়ান তাদের পরকীয়া চলাকালীন সময়টায় যে আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশিত হয় সেটা মূলত সম্পর্কটাকে সেক্স পরযন্ত নিয়ে যাওয়ার উছিলামাত্র।

ছেলে ও মেয়েরা কিন্তু একই কারণে পরকীয়ায় জড়ায় না। মেয়েরা মূলত পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগীয় ও অর্থ সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং শারীরিক চাহিদা থেকে পরকীয়ায় জড়ায়। অন্যদিকে পুরুষরা সাধারণত বহুগামী মানসিকতা থেকে পরকীয়ায় জড়িয়ে থাকে। আপনার বন্ধুবান্ধব পুরুষরা কেউ যদি পরকীয়া করে থাকে দেখবেন তাদের পরকীয়ার গল্পে যৌন কর্মকাণ্ডের কথাই বেশি থাকে। অন্যদিকে নারীরা তাদের প্রেমিকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় কর্মকাণ্ড বলতে বেশি পছন্দ করে।

মজার ব্যাপার হলো বিভিন্ন দেশের পরকীয়ায় লিপ্ত মানুষেরা তাদের পরকীয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে তাদের নিঃসঙ্গতাকে উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু জরিপে দেখা যায় পরকীয়াতে জড়ানো মেয়েদের মধ্যে কর্মজীবী মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। অর্থাৎ তারা কিন্তু নিঃসঙ্গ নয়। আমেরিকার ক্ষেত্রে ৪৭ শতাংশ চাকরিজীবী মহিলা পরকীয়ায় জড়িয়ে থাকে অন্যদিকে যারা চাকরি করে না এমন মাত্র ২৭ শতাংশ মহিলা পরকীয়ায় লিপ্ত। তাহলে যারা পরকীয়াতে জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বলেন যে, নিঃসঙ্গতাই তাদের পরকীয়ার কারণ সেটা মূলত নিজেদের ভালো মানুষি প্রতিষ্ঠার একটি চেষ্টা মাত্র। মানুষ সবসময় সমাজে নিজেকে নির্দোষ ও ভালো মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

মানুষ যেভাবে পিয়ার প্রেশার কিংবা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিগারেট ও মদে আসক্ত হয় পরকীয়ার বেলায় কি তেমনটা ঘটে থাকে? গবেষণায় জানা যায় যে, ঘটে। অফিস সহকর্মী কিংবা বন্ধুবান্ধবদের পরকীয়ার গল্প শুনতে শুনতেই অনেকে নিজের জীবনেও সেই উত্তেজনা খুঁজতে গিয়ে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। আমেরিকার নিউ ওমেন ম্যাগাজিনের জরিপে জানা যায় চাকরিজীবী বিবাহিত নারীরা তাদের কর্মস্থলেই ‘লাভার’-দের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করে থাকেন। আমেরিকান সমাজে অবিশ্বস্ততার হার দিনে দিনে বাড়ছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে জানা যায় যে, ২৫ শতাংশ পুরুষ পরকীয়া করছে এবং ১৭ শতাংশ নারী তাদের স্বামীদের প্রতি বিশ্বস্ত নয়।

বাংলাদেশে অফিস রোমান্স বিষয়টি তুলনামূলকভাবে নতুন। কিন্তু এর বিস্তার ঘটছে দ্রুত। বিশেষ করে করপোরেট কালচারে অভ্যস্তরা একে সহজভাবে নিচ্ছে। ভাবখানা এমন যে, এর মাধ্যমে তারা আধুনিক হতে পারছেন। এই প্রবণতা একসময় আমেরিকা ও ইওরোপের সমাজেও দেখা গিয়েছিল। একটি সমাজের মানুষ যখন নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ের পথে যেতে থাকে তখন সেই সমাজে কিছু নেতিবাচক মূল্যবোধেরও বিকাশ ঘটে। পরকীয়া তেমন একটি বিষয়।

কমপিউটার ও ইন্টারনেটের এই যুগে অনলাইনে পরকীয়া গড়ে উঠার ব্যাপক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের সম্পর্কগুলোতে আবেগীয় বিষয়টাই বেশি থাকে। তবে কেউ কেউ অনলাইন ছেড়ে অফলাইনে চলে গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে অনলাইন সম্পর্কগুলো মূলত নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে মানসিক যোগাযোগ গড়ে তোলা যায় বলেই বেশি জনপ্রিয়।

যেকারণে পরকীয়ার শুরুতে রোমান্টিক কথাবার্তা থাকলেও আবেগীয় সেই সম্পর্ক মূলত যৌন সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করার উছিলামাত্র। কিছু কিছু পরকীয়া সম্পর্কে বিচিত্র ঘটনা ঘটে। শুরুতেই আবেগ থেকে দ্রুতই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং তারপর এক ধরনের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। যেখানে আর শারীরিক মিলন থাকে না বরং এক ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি হয় যা অনেকক্ষেত্রে অনেক বছর ধরে চলতে থাকে।

গবেষণা থেকে জানা যায় সন্তানের ভবিষ্যৎ অনেক মানুষকে পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত রাখে। এবং অনেকে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালেও সন্তানের ভবিষ্যতকে গুরুত্ব দিয়ে পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে মানুষের মনের মধ্যে সবসময় ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের মনের আকর্ষণ স্বাভাবিক। সেই আকর্ষণকে মোকাবেলা করাটাই হলো একজন ভালো মানুষের কাজ। মানুষের মনের মন্দ চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে মানুষকে সাহায্য করে তার শিক্ষা, তার ধর্ম, তার পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আরো অনেক কিছু। সন্তানের প্রতি ভালোবাসাও এমনই একটা কারণ।

গবেষকগণ বলেন, পরকীয়া মূলত একধরনের স্বার্থবাদী চিন্তা। আর স্বার্থপর মানুষেরা বেশি বেশি মিথ্যা বলে। যারা পরকীয়া করেন তারা তাদের কাজের সমর্থনে হরহামেশাই মিথ্যা বলেন। বিশেষ করে বন্ধুবান্ধবদের কাছে। এভাবে তারা নৈতিক সমর্থন খোঁজেন। পরকীয়া যারা করেন তারা তাদের সঙ্গীর অতীত জীবন বিশেষ করে পুরনো প্রেমের ঘটনাগুলোকে বড় করে তুলে এনে তাদের বর্তমান আচরণকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে চান। পরকীয়া থেকেও বিয়ের ঘটনা ঘটে। তবে সেটার হার মাত্র ২০ ভাগ। তাইওয়ানের সমাজে প্রতি চারজন বিবাহিত নারীর মধ্যে একজন মনে করেন তার স্বামী পরকীয়ায় লিপ্ত। অন্যদিকে তাইওয়ানিজ পুরুষদের মধ্যে দেখা যায় ৮ বছরের বেশি সময় ধরে বিবাহিতরা পরকীয়ায় বেশি জড়িয়ে থাকেন।

পরকীয়ার ঘটনা যখন ধরা পড়ে তখন কি হয়? পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের ক্ষমা করতে পারেন না। যদিও নারীরা সে তুলনায় বেশি উদার। পুরুষরা কেন পরকীয়ায় জড়ায় তার হাজারো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং কারণ হলো জীবনের অসফলতা থেকে তারা পরকীয়ার প্রতি আসক্ত হয়। সেক্স নিয়ে ফ্যান্টাসি থেকেও অনেকে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। তারা নিজেদের বিবাহিত সঙ্গীকে সেক্স ফ্যান্টাসি পূরণের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। অথচ দেখা যায় এই ধরনের পরকীয়ার সম্পর্কগুলো সবচেয়ে কম সময় টেকে। কারণ সেক্স ফ্যান্টাসি পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়া মানুষগুলোর কাছে কখনো ধরা দেয় না। ফলে, তারা দ্রুতই মোহমুক্ত হয়ে ফিরে আসতে চায়। এখানে গোলমাল লেগে যায়। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেক্স ফ্যান্টাসি নিয়ে বিবাহিত সঙ্গীর সঙ্গে আলাপ করাই উত্তম।

চলবে………..

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s