অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ঘটনা থেকে আমরা কি শিখলাম?


কি ঘটেছে সবাই জানেন। তবুও খুব সংক্ষেপে বলে দেই। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক অনুষ্ঠানে কিছু কথা বলেছিলেন। তার বলা সেই কথাগুলো কয়েকটি পত্রিকায় ভুলভাবে ছাপানো হয়। সেই খবর পড়ে ক্ষুব্ধ হন সংসদ সদস্যরা। কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে দাবী করেন অধ্যাপক আবদু্ল্লাহ আবু সায়ীদকে সংসদে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। ওই অধিবেশনে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী প্যানেল স্পিকারও এ্ই দাবীর প্রতি সমর্থন দেন। পরবর্তীতে জানা যায় পত্রিকায় ভুল তথ্য ছাপা হয়েছে। দেশের তরুণসমাজসহ আপামর জনসাধারণ এই ঘটনায় বিষ্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়। পরের দিনের অধিবেশনে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী ডেপুটি স্পিকার বিষয়টি সম্পর্কে তার বক্তব্য শেষ করেন এভাবে- অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিষয়টি নিয়ে প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারেন কিংবা আইনের আ্শ্রয় নিতে পারেন। সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ এই ঘটনার জন্য শেষ পর্যন্ত ১০ জুনের অধিবেশনে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং অধ্যাপক সায়ীদের উদ্দেশ্যে বলা অসংসদীয় বক্তব্য বাদ দিয়েছেন।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ঘটনা থেকে আমাদের শেখার আছে। আমি কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি। এব্যাপারে আপনাদের মতামত আশা করছি।

১. পত্রিকাগুলো মিথ্যাচার করে: এই ঘটনা এই দেশের জন্য এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পত্রিকায় ও গণমাধ্যমে ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় ভুল ও মিথ্যা প্রকাশ করাটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখনো সেই মিথ্যার কথা জানা যায়। হৈ চৈ হয়। বেশিরভাগ সময় হয় না। অধ্যাপক সায়ীদের বক্তব্য নিয়ে মিথ্যাচার যদি সংসদে আলোচিত না হতো সেটা কিন্তু জানা হতো না।

পত্রিকাগুলোর এমন আচরণের কারণ কি, চিন্তা করলে মনে হয় কারো কাছে জবাবদিহিতা না থাকাটাই কারণ। আমি মনে করি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকা উচিৎ। কিন্তু সেসঙ্গে দায়িত্বশীলতাও থাকা দরকার। পত্র-পত্রিকাগুলো এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কখনো কখনো তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে যা খুশি তাই করছে।  এই অবস্থায় পত্রিকাতে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নতুবা তথ্যের এই বিস্ফোরণের যুগে অনেক বেশি তথ্য সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী তৈরি হবে। যা দেশ ও সমাজের জন্য মোটেই সুখকর হতে পারে না।

২. মিথ্যাগুলো থেকে যাচ্ছে: মিথ্যাগুলো যে পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে সেগুলো কিন্তু থেকেই গেলো। ফলে, আজ থেকে ৫০ বছরের পাঠক ইতিহাস জানার জন্য ওই পত্রিকাগুলোর কোনটি যদি পড়ে তাহলে মিথ্যাই জানবে। গণমাধ্যমের যে বস্তুনিষ্ঠতা তার ক্ষুন্ন হওয়ার এই রেওয়াজ আগামীর দিনগুলোতে সঠিক তথ্য পাওয়ার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এর দায়ভার কোনমতেই আজকের দিনের মানুষগুলো এড়াতে পারে না।

পত্রিকার মিথ্যাগুলো নিয়মিত চিহ্নিত করে বছর শেষে একটি ইনডেক্স বের করার প্রস্তাব করছি। প্রেস কাউন্সিল এই দায়িত্ব নিতে পারে।

৩. মিথ্যাচার সত্য ও মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলছে: কখনো কখনো রাজনীতিবিদগণ পত্রিকার মিথ্যাচারের শিকার হন। তারা পত্রিকার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। এসময়গুলোতে পাঠক বিভ্রান্ত হয়। সাধারণভাবে পাঠক পত্রিকায় ছাপা হওয়া সংবাদকে রাজনীতিবিদদের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন। ফলে তারা ধরেই নেন যে রাজনীতিবিদগণ মিথ্যা বলছেন। কিন্তু যারা রাজনীতিবিদদের কাছাকাছি থাকেন এবং ঘটনার এলাকায় বসবাস করেন তারা বুঝতে পারেন যে আসলে মিথ্যা বলছে পত্রিকা। কিন্তু তাদের দিক থেকে করার কিছু থাকে না। এই পরিস্থিতিতে এক ধরনের অবিশ্বাস পত্রিকাগুলোর ব্যাপারে তৈরি হয়। যা এই ঘটনার বেলায়ও হয়েছে।

আজকে কিছু কিছু পত্রিকাকে মানুষ বিশ্বাস করে না। অনেকটা বাঘে খেলোর মতো ঘটনা। এটির ভয়াবহ দিক হলো দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র রাজনীতিতে ভাগ হওয়ার মতো পত্রিকাকে কেন্দ্র করেও দেশের মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি তৈরি হচ্ছে। ফলে, সব পত্রিকার পক্ষ ও বিপক্ষ গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

৪. ভবিষ্যতের গবেষণাকে নাজুক করা হচ্ছে: আজকে স্বাধীনতার ইতিহাস জানার জন্য আমরা পত্র-পত্রিকার শরনাপন্ন হচ্ছি। আগামীতে বর্তমান বাংলাদেশকে জানার জন্য আমাদের সন্তানেরা পত্রিকার তথ্য নেবে। এভাবেই পত্র-পত্রিকার রিপোর্টকে ইতিহাস গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আজকে আমরা যারা জানি পত্রিকাগুলো কিভাবে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে মিথ্যাচার করে থাকে তারা কি মেসেজ দিয়ে যাব আমাদের সন্তানদের? বাংলাদেশে এমন কোন একটি পত্রিকা আছে যে সত্য লুকাচ্ছে না কিংবা কমবেশি মিথ্যাচার করছে না।

৫. সংসদে চরিত্র হরণ: আমাদেরকে বুঝতে হবে সংসদে যারা যান তারা এই দেশেরই সন্তান। এই সমাজেই তারা বাস করেন। বাংলাদেশের সমাজে ব্যক্তি হিংসা ও চরিত্র হরণ একটা মামুলি ঘটনা। সংসদে ব্যক্তি চরিত্র হরণও তাই মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যারা টেলিভিশনে সংসদ অধিবেশনের সরাসরি সম্প্রচার দেখেন তারা এই কথা জানেন।

৬. ভালোর পলায়ন, মন্দের নেতৃত্ব: বাংলাদেশের সমাজে সৎ ও চরিত্রবান মানুষেরা একটু ভীতু ও পলায়নপর মনোভাবের হয়ে থাকেন। তারা মূলত কোন ধরনের ঝুঁকি নিতেও চান না। ফলে, তারা নিরীহ টাইপের চাকরি করা, সংসার চালানোতেই বেশি আগ্রহী। যেকারণে গত ৪০ বছরে ধীরে ধীরে সমাজ ও দেশের নেতৃত্বে নৈতিকতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা কিন্তু বলিউডি সিনেমা স্টাইলে সাহসী মানুষেরা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। ইন্টারেস্টিংলি সৎ ও চরিত্রবান নাগরিকগণ এই ধরনের নেতৃত্বের অধীনে চাকরি করা মেনে নিয়েছে। ফলে, তাদের মেধা ও চিন্তা ব্যয় হচ্ছে নীতিহীন মানুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে। অধ্যাপক সায়ীদের আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর কর্মসূচিও এভাবেই হোচট খেয়েছে। শুনেছি তার ছাত্ররাও সেদিন তাকে মন্দ কথা বলেছেন।

৭. মিথ্যার স্বর্গ: বাংলাদেশের একদল মানুষ সবসময় শিক্ষা জীবন শেষ করে ভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বিদেশে বসে তারা বাংলাদেশের সমাজের নোংরামির প্রতিবাদ করে থাকেন। এবং তারা মনে করেন তারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং এভাবেই দেশ উদ্ধার করছেন। তারা আরো মনে করেন যে, তারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের লিঙ্ক হিসেবে কাজ করছেন। তারা একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। মাঝে মাঝে দেশে এসে সভা সেমিনার করে তরুণ সমাজের চোখে রঙ্গিন স্বপ্ন ধরিয়ে দেন। এক-দুইজন তরুণ সেই স্বপ্ন অনুযায়ী কিছু করতে পারলে সকলে মিলে সেটাকে ব্যাপক প্রচারণায় নিয়ে আসেন। এভাবে তারা এক ধরনের মিথ্যার স্বর্গ রচনা করে বেশিরভাগ মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন। তাদের হয়ে বাংলাদেশে কিছু এজেন্ট কাজ করেন। প্রশ্ন হলো এমন একটা মিথ্যার স্বর্গ তারা কি করে রচনা করতে পারছেন? কারণ এই দেশের মিডিয়া ও ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু কতিপয় লোকের হাতে জিম্মি। এই কতিপয় লোকের বন্ধুবান্ধবরাই হলেন সেই তথাকথিত প্রকৃত দেশপ্রেমিক, যাদের কেতাবী নাম এনআরবি-নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশী।

৮. জনপ্রতিনিধিদের এলাকার জনগণ চেনে: বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের এলাকার মানুষ চেনেন। তারা কিভাবে বড় হয়েছেন। কি খেয়ে বড় হয়েছেন। কি পরে বড় হয়েছেন। কি করে বড় হয়েছেন। সব জানে। গত ২০ বছরের গণতন্ত্র মানুষকে অনেক সহনশীল হতে শিখিয়েছে। এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে ক্লান্ত হয়ে পড়া মানুষজন এখন আর নতুন করে কোন কিছু করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বরং সবাই মিলে মিশে একটা নতুন সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সেটি হলো তোমার আমলে তুমি করো। আমার সময় আমাকে করতে দাও। একদল লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যারা বলবে সবকিছু ভাগাভাগি করা যায় না। করা ঠিক নয়।

আমি বড় লেখা লিখতে চাই না। কারণ বড় লেখা পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটায়। আমি চাই এই লেখার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হোক। এই দেশ যে ভুল সমাজ কাঠামো ও মিথ্যা সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠছে সেখানে আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ হতে পারবে না। যদি না আমরা তাদেরকে একটি সত্য সমাজ উপহার দিতে না পারি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s