মর্যাদায় কে বড়? গার্মেন্টস শ্রমিক নাকি পুলিশ


আজকের পত্র-পত্রিকায় একটি ছবি বড় করে ছাপা হযেছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে একজন পুলিশ পেটাচ্ছে।  ছবিটি দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে- মর্যাদায় কে বড়? গার্মেন্টস শ্রমিক নাকি পুলিশ? আমাকে জিজ্ঞেস করুন- কেন আমার মনে এই প্রশ্ন জেগেছে? ঠিক আছে বলছি শুনুন।

ব্রিটিশ আমলে ভিনদেশের সাদা চামড়ার লোকেরা আমাদের দেশের কালো ও বাদামী বর্ণের মানুষদের পেটাতো। নির্যাতন করতো। জোর করে কর আদায় করত। সমাজে তারা ছিলো শাসক শ্রেণী তথা মর্যাদাবান। ব্রিটিশদের দেখাদেখি আরো যারা জনগণকে পেটাতো কিংবা নানানভাবে নির্যাতন করত তারা ছিলেন জমিদার, তালুকদার, চৌধুরী, খান, সাহা কিংবা এমন কোন বংশের লোকজন। তাদেরকেও সমাজে মর্যাদাবান হিসেবে গণ্য করা হতো। শ্রমজীবি মানুষ তাদের কিল গুতা লাত্থি থাপ্পড় মুখ বুঝে হজম করত।

এরপর ব্রিটিশরা চলে গেলো। এলো পাকিস্তানী শাসন। হাজার মাইলের ব্যবধানে একটি দেশের দু’টি অংশ। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান। বাংলাদেশীদের কপাল আর খুললো না। কিংবা বলা যায় বাংলাদেশের শ্রমজীবি মানুষের কপাল আর খুললো না। বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। ব্রিটিশদের ভূমিকা নিলো পশ্চিম পাকিস্তানীরা। আর পূর্ব পাকিস্তানে আগের মতোই তালুকদার, চৌধুরী, খান কিংবা এজাতীয় লোকজন পশ্চিম পাকিস্তানীদের হয়ে জনগণকে পেটানোর কাজটা অব্যাহত রাখল। এসকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য আমরা একজন নেতাকে পেলাম। তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করে পাকিস্তানের শাসক বানালাম। কিন্তু জুলফিকার আলী ভূট্টো প্যাচ লাগিয়ে দিয়ে পাকিস্তানকে দুই ভাগ করা নিশ্চিত করল। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিবর্তে ভূট্টোর গোয়ার্তুমি আর ক্ষমতার লিপ্সার শিকার হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করলেন। ভূ্ট্টো হলো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, যা সে চেয়েছিল।

পাকিস্তানীদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান হলো বাংলাদেশ। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করলেন। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এইবার দেশের খেটে খাওয়া মানুষের মার খাওয়ার দিন শেষ হলো। সমাজে বিত্তবানদের ছড়ি ঘোরানোর দিন শেষ হলো। সমাজ থেকে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলো। শুধুমাত্র অর্থ নয় সমাজে মানুষ পরিচিত হবে তার কর্মের দ্বারা। সমাজ থেকে সকল ধরনের অপ দূর হবে।

আজকে আমাদের জাতির পিতা নেই। কিন্তু তার প্রাণপ্রিয় দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। আওয়ামী লীগ কখনো বলেনি যে, তারা  শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথ থেকে সরে গেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা শুধু সরে যায়নি। তারা বরং ফিরে গিয়েছে সেই ব্রিটিশ আমলে। তারা সরে গিয়েছে সেই পাকিস্তান আমলে। যখন ভিনদেশী কুত্তা ও তাদের দোসররা এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের কুত্তা বিড়ালের মতো দেখতো। যাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। অথচ আজকে তার দলের আচরণ সেই সব বিদেশীদের মতোই।

এখন প্রশ্ন হলো এই আলোচনার শিরোণাম কেন মর্যাদা নিয়ে? কারণ, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। তাদেরকে ক্ষমতায় থাকার কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই চিত্র এতোটুকু বদলায়নি। বরং আরো খারাপ হয়েছে। ১৯৬৯ সালে শ্রমিকদের ন্যূানতম মজুরি ঠিক করা হয়েছিল ১৫০ টাকা। একথা আমি ১ মে জানলাম টিভিতে এক টক শোতে। যেখানে আওয়ামী লীগের এক মন্ত্রী ছিলেন আর ছিলেন সিপিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের নেতার নামটা ভুলে গেছি। তবে শ্রম মন্ত্রী নন।

সমাজে যাদের কোন মর্যাদা নেই তারাই সবসময় নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। কারা সেই নির্যাতন করেন? এখানেই মর্যাদার প্রশ্ন! যুগে যুগে অন্য অনেকের সঙ্গে পুলিশরা নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু সমাজে পুলিশের কনস্টেবলের মর্যাদা একজন গার্মেন্টস কর্মীর চেয়ে বেশি কিছু নয়। সরাসরি পিটানোর সঙ্গে পুলিশের এই পদমর্যাদার লোকেরাই বেশি জড়িত থাকে। বেতনের দিক থেকেও এরা প্রায় একই অবস্থানে। তাহলে প্রশ্ন হলো একজন পুলিশের কনস্টেবল কেন একজন গার্মেন্টস কর্মীকে পেটায়?

আমরা যদি একটা সৎ সমাজের কথা চিন্তা করি তাহলে কিন্তু দেখব যে, একজন গার্মেন্টস কর্মী একজন পুলিশের কনস্টেবলের চেয়ে বেশি সৎ। একজন পুলিশ কনস্টেবল বরং অসততার দিক থেকে তার সুযোগ মতো একজন আইনপ্রণেতার প্রায় সমকক্ষ। এই বিচারে অবশ্যই একজন পুলিশ মর্যাদার দিক থেকে অবশ্যই গার্মেন্টস কর্মীর চেয়ে অনেক উপরে।

প্রশ্ন হলো, সমাজে সৎ মানুষের মর্যাদা বেশি হবে নাকি অসৎ মানুষের?

তবে শেষ কথাটি বলি। গ্রামে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ করে যারা কিছুটা হলেও সততা দেখেছেন সেই সব প্রবীণ মানুষদের কাছে সৎ গার্মেন্টস কর্মীর কদর অসৎ পুলিশের চেয়ে বেশি হওয়ায় পুলিশরা যে মনোকষ্টে ভোগে, তারই প্রতিফলন হলো সাধারণ মানুষকে মারধোর করা। এবং পুলিশের নিজ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল না হওয়া। তবে একথাও বলতে হবে, সব পুলিশ খারাপ নয়। যেমন সব আইন প্রণেতাও খারাপ নয়। ঠিক তেমনি সব গার্মেন্টস কর্মীও সৎ নয়।

Advertisements

2 thoughts on “মর্যাদায় কে বড়? গার্মেন্টস শ্রমিক নাকি পুলিশ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s