‘নেতারা সরকারি জমি নিজেদের মনে করে’, গাবতলীতে ২ ঘণ্টা


কয়েকদিন আগে গাবতলীতে গিয়েছিলাম। যাকে আনতে গিয়েছিলাম তার বাস আসতে দেরী হওয়ায় আমাকে দুই ঘণ্টা বসতে হয়েছিল। গাবতলীতে গিয়ে অপেক্ষা করাটা আমার জন্য নতুন কিছু নয়। একবার তো প্রায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত রাত একটায় যাত্রী এসে পৌঁছেছিলেন। সে তুলনায় ২ ঘন্টা অনেক কম সময়। পাবলিক প্লেসে অপেক্ষার সময় আমি সাধারণত লোকজনকে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। আর সুযোগ পেলে আলাপ জুড়ে দেই।

সেদিন ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। কাউন্টারের মধ্যে ভীড়। বাইরে বৃষ্টিতেও লোকজন কোনমতে দাঁড়ানো। আমি যাত্রীকে ফোন করে জানলাম গাড়ি তখনো সাভার বাজার। আমি রাস্তায় বের হয়ে এলাম। খানিকটা হেটে বসার মতো একটা ঘর পেয়ে গেলাম। পুরনো চাকা বিক্রি, মেরামত আর হাওয়া দেওয়ার একটা ছোট্ট ঘর। দেখি ভেতরে একজন মাত্র বসে আছেন একটি লম্বা বেঞ্চিতে। আমি তার কাছে অনুমতি চাইলাম বসার জন্য। তিনি কিছুটা অবাক হয়ে আমাকে দেখলেন, মুখে বললেন বসেন। আমি গিয়ে বসলাম। বসতে বসতে বললাম, আসলে সাকুরার গাড়িটা আসতে দেরি হবে আমাকে বোধহয় বেশ অনেকটা সময়ই আপনার এখানে বসতে হবে। তিনি বললেন, অসুবিধা নেই বসেন। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আমিই নীরবতা ভাঙ্গলাম। বললাম, সাকুরার কাউন্টার তো আগে অন্য জায়গায় ছিলো…..

ওই জায়গা এমপি আসলাম দখল করে নিয়েছে। তিনি বললেন।

সাকুরা এই জায়গা পাইলো কিভাবে?

এটা ওদের আগেই ছিলো।

ওহ, তাই বলেন।

এখানে ওদের আরো কিছু জায়গা ছিল। আসলাম সাহেব অবশ্য সেগুলাও নিয়ে নিয়েছেন।

কিভাবে নিয়েছেন?

কিভাবে আবার। দখল করেছেন।

অন্যরা কেউ কিছু বলল না?

আসলাম সাহেবের সঙ্গে নিশ্চয়ই আরো উপরের লোকজন জড়িত আছে। একা তো আর এতো দখল করার সাহস দেখাতে পারতেন না। দারুস সালামের অতো বড় জায়গা দখল করার সাহস একা দেখাতে পারতেন না।………………… (তিনি আরো কয়েকটি জমির কথা বললেন, যার বেশিরভাগই আমি চিনি না)

কারা আছে তার সঙ্গে?

তাতো জানি না।

এসময় একটা বাদামওয়ালা যাচ্ছিলো সামনের রাস্তা দিয়ে। আমি তাকে ডেকে বাদাম দিতে বললাম। এটাও আমার পুরনো অভ্যাস। চা বিস্কুট কিংবা বাদাম কিংবা অন্য কিছু খেতে খেতে গল্প করা।

তার সঙ্গে কি খালেক সাহেবও আছেন নাকি?

তার সঙ্গে খালেক সাহেব থাকবেন কেন? তিনি তো আর আওয়ামী লীগ করেন না।

কিন্তু আমরা দেখি অনেকসময় এই ধরনের বাণিজ্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা একসঙ্গে করেন।

আমি সেটা জানি না। তবে খালেক সাহেব এই ধরনের জমি জমা দখলের মধ্যে নেই। এই এলাকায় তো ৩০ বছর ধরে আছি। এর মধ্যে খালেক সাহেব তিনবার এমপি ছিলো। এরশাদের আমলে একবার বিএনপির আমলে দুইবার। তারে কখনো এইভাবে জমিজমা দখল করতে দেখিনি। দারুস সালামের জমি দখল করার সাহস এর আগে কেউ দেখায়নি।

তাইলে তো এই এমপি সাহেব অনেক সাহসী মানুষ।

ওনার একলার সাহস না। সাথে আরো লোকজন আছে।

তারা কারা?

আমি জানি না।

উনি এতো জমি কি করবেন?

প্লট কইরা বেচবেন।

পরে উনি যখন ক্ষমতায় থাকবেন না তখন ঝামেলা হইব না?

কি ঝামেলা হইব। দেখেন একটা কথা বলি। আমি অতো লেখাপড়া করিনি। গ্যারেজে কাম করি। কিছু মনে করবেন না।- লোকটা আমার দিকে তাকাল।

আমি বললাম, বলেন শুনি।

দেখেন এই দেশের ৬০ ভাগ লোক আওয়ামী লীগের। বাকি ৪০ ভাগ বিএনপির। আওয়ামী লীগ না থাকলে বিএনপি আইব। তাতে কি হইব। কিচ্ছু না। এরা কেউ তো জনগণের কথা ভাবে না। সবাই নিজেরটা বোঝে। তা নাহইলে ১২০০ কোটি টাকা দিয়ে কেউ নাম বদলায়। এই টাকা কি এমপি সাহেবের পকেট থেকে গেছে নাকি আমাগো পকেট থেকে গেছে?

কোন ১২০০ কোটি টাকা? কিসের কথা বলছেন?

ওই যে এয়ারপোর্টের নাম বদলাইলো। একটা নাম বদলানোর জন্য অতগুলো টাকা যে খরচ করল একবারও কি জনগণের কথা ভাবছে? ভাবেনি। এই দেশের নেতারা জনগণের টাকা এদের নিজেদের টাকা মনে করে। সরকারি জমি নিজেদের মনে করে। যা খুশি তাই করে।

তার গলার স্বরে এমন কিছু ছিল আমি চুপ করে শুধু তাকে দেখতে লাগলাম। একটা ফোর হুইল  এসইউভি গাড়ির ভেতর থেকে গলা বাড়িয়ে একজন জানতে চাইল হাওয়া দেওয়া যাবে?

যাবে, বলে তিনি উঠে গেলেন। আমি বসে আছি আরো কথা শোনার জন্য। গাড়িটা বিদায় নিতে একটা মটর সাইকেল থামল লিক সারাতে হবে। অল্প বয়সী একটা ছেলেকে ডেকে তিনি লিক সারানোর কথা বললেন আর নিজে একটা টুলস বক্স বের করে গোছানো সারলেন। আমি বসে আছি তার কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। টুলস বক্সটা হাতে নিয়ে বললেন, অনেক দূরে একটা কাজে যেতে হবে। আসি। আসসালামু আলাইকুম।

ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনি ভালো থাকবেন। ভালো লেগেছে আপনার সঙ্গে কথা বলে। আমার শেষ কথাগুলো উনি যেতে যেতে শুনলেন কিনা বুঝলাম না। ততক্ষণে তিনি নিজের পথে হাটা ধরেছেন। আমিও বের হয়ে এলাম।

খুঁজতে লাগলাম অন্য কাউকে। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। তবে আগের চেয়ে কম।

Advertisements

2 thoughts on “‘নেতারা সরকারি জমি নিজেদের মনে করে’, গাবতলীতে ২ ঘণ্টা

  1. ভুমি দখল এখন নেতাদের চালু second profession হয়ে গেছে । আমার জন্মস্থান গাজিপুর জেলার স্রীপুর থানায় । আমাদের বরতমান সাংসদ Advocate Rahmat Ali সাহেবের আশিরবাদে চলসে এই দখল্বাজি।
    সরেজমিনে আছেন উনার সুযুগ্য উত্তরাধিকার দুরজয় যিনি স্থানিয় মানুশদের কাছে দুরজুগ নামে পরিচিত এর রাজনইতিক সহকরমিরা । কিন্তু আপনি চারপাশে তাকালে দেখতে পাবেন এই চিত্র এখন শুধু শহরেই নয় শহরতলি পর্যন্ত ছরিয়ে পরেছে । আর যাদের কাছে জাতি
    কিছু আশা করার দাবি রাখে এবং যারা হয়ত চেশ্তা করলে জাতির জন্য ভাল কিছু করতে পারতেন তারা দেশ ছেরে উন্নত দেশে চলে যাইতাছেন । জাতির ত নেতা প্রয়োজন । উনারা আমেরিকা, অস্ত্রেলিয়া চলে যাওয়ার পর দুরযুগ আর আসলামরা ই দেশ চালাবে…। দখল্বাজি তাই তাদের অধিকার হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s