কিছু ‘পুওর’ এর মৃত্যুর দায় কার? রাষ্ট্রের নাকি যারা মারা গেলো তাদের নিজেদের?


সবাই ভেবেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতেও হত্যা ও গুম হয়েছিল। ১৯৭৪ সালেও আমরা মৃত্যুর মিছিল দেখেছি। দুর্ভিক্ষের কারণে সোনার বাংলাদেশের সোনার শরীর ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের আঘাতে ক্ষতি বিক্ষত হয়েছিল। মৃত্যুর মিছিল এই জনপথ ছেড়ে কখনো যায়নি। ১৯৭১ সালে লোভী জুলফিকার আলী ভূট্ট্রোর মদদে পাকিস্তানী হায়েনারা ঝাপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর। ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগে মৃত্যু ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গরিব মানুষের কুটিরে। গরিব মানুষের মৃত্যু হওয়া যেন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে সেই থেকে। সর্বশেষ বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে মারা গেল শতাধিক গরিব মানুষ। প্রশ্ন হলো এই মৃত্যুর দায় কার? রাষ্ট্রের নাকি যারা মারা গেলো তাদের?

গতকাল টেলিভিশনের কোন কোন টক শো’তে বলতে শুনলাম রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল। তারা মাইকিং করেছিল কিন্তু মানুষজন সেই মাইকিং শুনে সরে যায়নি। তারা মুখ ফুঁটে না বললেও আকারে ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন পাহাড় ধসে যারা মারা গেছেন তারা নিজ দায়িত্বে মারা গেছেন। কারণ তারা সরকারের কথা শোনেননি।

টক শো’র উপস্থাপকগণ জানতে চাননি, ওই মানুষগুলো সরকারের কথা শুনে কোথায় যেতে পারতেন? কিংবা তারা কেন যাননি?

বাস্তবতা হলো যে পাহাড়ের নিচে যে মানুষগুলো বাস করেন তারা কিন্তু অসচেতন নন। তারা সচেতনভাবেই সেখানে বাস করেন। তারা জানেন যে তারা মারা যেতে পারেন। তবুও তারা সেখানে থাকেন। প্রশ্ন হলো কেন? এর জবাব বোধহয় এটাই যে, ওই মানুষগুলোর যাওয়ার কোন জাগয়া নেই। ফলে, তারা সবসময় ভয় পান নিজের ওই আশ্রয়টুকু ছেড়ে কোথাও গেলে ফিরে এসে হয়তো আর পাবেনও না। এই দেশের সরকারি খাস জমি তো ভূমিহীনদের দখলে নেই। মন্ত্রী, এমপি আর আমলা এই দেশের সব সরকারি জমি দখল করে ফেলেছে। মুজিব সরকার থেকে শুরু করে সর্বশেষ হাসিনা সরকার পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের সরকারি জমি দখলের মিছিলে সত্যিকারের ভূমিহীন গরিব মানুষগুলো কোন সময় নিজেদের ঠাঁই খুঁজে পায়নি।

এই দেশের গরিব মানুষদের ঠাঁই হয়েছে তথাকথিত অবৈধ বস্তিতে কিংবা পাহাড়ের কোলে, জঙ্গলের ধারে, রেললাইনের পাড়ে, নদীর তীরে এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায়। স্বাধীনতার পর এই দেশে ধনী আর গরিব দুই ধরনের মানুষ ছিলো। এই দেশে হতদরিদ্র বলে একটি নতুন গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। আরেকদলকে বলা হচ্ছে চরম দরিদ্র। রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী চরম ধনী মানুষদের মালিকানাধীন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে এই দেশের অতি উচ্চ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুণে খাওয়া কিছু শিক্ষক ও পেশাজীবি দেশের গরিব মানুষদের নানান নামে ডাকেন- হার্ডকোর পুওর, পুওর অব দি পুওরেস্ট, এবসুল্যুট পুওর ইত্যাদি।

এই রকম কিছু পুওর সাম্প্রতিক পাহাড় ধসে মারা গিয়েছে। এটি কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এটি হলো মানব সৃষ্ট বিপর্যয়। পাহাড়ের মাটি কেটে, গাছ কেটে, জলাভূমি ভরাট করে, এবং যতোরকমভাবে পারা যায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের জায়গাজমি তারা দখল করেছেন। ফলে, নিরন্ন ও নিরূপায় মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে। যারা মারা গেছেন তাদের ভয়েস বা কণ্ঠস্বর শুধুমাত্র তাদের সেই টিনের চালা কিংবা কুড়ের ঘরের মধ্যেই সীমিত থাকে।

যাদের কথা বলার সামর্থ্য আছে তারা এই মানুষগুলোর মৃত্যুর জন্য দায়ী ক্ষমতাবানদের কেনা গোলাম। কিংবা আশ্রিতজন। ফলে, তাদের পকেটে আমেরিকা, কানাডা, জার্মানী কিংবা ফ্রান্সের ডিগ্রী থাকলেও তারা সেই উন্নত বিশ্বের জ্ঞান ব্যবহারে অক্ষম। তারা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ পেয়ে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কিংবা সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদ পেয়ে নিজেদের বিবেককে বিক্রি করে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা অর্জনের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ওই সব ক্ষমতাবানদের সমাজে শামিল করেছেন। ফলে তারা যা কিছু গরিব মানুষের জন্য বলেন সেটা হয় লোক দেখানো বিষয়। তারা তাদের মুখ ‍ও কলম দিয়ে যা বলেন সেটার পক্ষে তাদের বসার চেয়ারটাকে কাজে লাগান না। তারা এক ধরনের হাইপ তৈরি করেন। তাদের মূল কাজ হলো তাদেরকে চাকরি কিংবা সুবিধা দিচ্ছে যে মানুষেরা তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। তারা ওই সব ক্ষমতাবানদের মাউথপিস হিসেবে কাজ করেন। যারা এখনো মাউথপিস হতে পারেননি তারা তক্কে তক্কে থাকেন মাউথপিস হওয়ার জন্য। ফলে গরিব মানুষগুলোর পক্ষে কেউ থাকে না। এটাকে অবশ্য গত ৪১ বছরে গরিব মানুষেরা নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। তারা এখন আর প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর মানবসৃষ্ট বিপর্যয়কে আলাদা করে ভাবতে পারে না। তারা এই দেশের মন্ত্রীদের মতোই ভাবে আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। কিংবা দুর্ঘটনা তো হতেই পারে। কোনটা দুর্ঘটনা আর কোনটা দায়িত্বের অবহেলা সেটা যেন আজকে একাকার হয়ে গেছে।

আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে মানুষগুলো পাহাড় ধসে মারা গিয়েছে তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তাদের কর্তব্য অবহেলা করেছে। তাদের চোখের সামনে পাহাড়ের গাছ কাটা হয়েছে, মাটি কাটা হয়েছে, জলাভূমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের সহযোগিতায় সরকারি খাস জমি প্রকৃত নাগরিকদের পরিবর্তে ক্ষমতাশালীরা পেয়েছে। তাই আজকের এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা হত্যাকাণ্ড। মৃত্যুর এই মিছিল থামাতে হলে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। গোড়ার কারণ দূর না করে আগায় পানি দিলে কিছুই হবে না। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন এবং যারা জনগণের অর্থে তাদের বেতনভাতা পান তাদেরকে এই মৃত্যুর দায় নিতে হবে। এই মৃত্যুর দায় ওই সকল জনপ্রতিনিধিদের যাদের উপর আস্থা রেখেছিল মারা যাওয়া মানুষগুলো।

এই সুযোগে আমি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা যেন নিজেদের দায়িত্বের কথা ভুলে না যাই।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s