তালকানা ১ কোটি তরুণ ভোটারের গণজাগরণ, অতঃপর দুর্নীতি এবং মিথ্যাচার


১.

১ কোটি তরুণ ভোটার বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা যেদিক ঝুঁকবে ক্ষমতার মসনদ তাদের দিকেই যাবে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দিকে ঝুঁকেছিল তারা। ফলাফল হিসেবে জিতেছিল মহাজোট। যা তা জেতা নয়। রীতিমতো দুই তৃতীয়াংশ সিট পেয়ে জিতেছিল তারা। এমনকি ১৯৯০ সালের তরুণদের আন্দোলনে পতিত স্বৈরাচার এরশাদ মহাজোটে থাকার পরও আওয়ামী লীগের এই বিজয়ে যারা বিষ্মিত হয়েছিল তারা পরবর্তীতে একমত হয়েছিল এটা ১ কোটি তরুণ ভোটের ফলাফল। ফলাফল হাতে পেয়ে আওয়ামী লীগের মনে হয়েছিল এরশাদের মতো পচা শামুকে তাদের পা না কাটলেও চলত। কারণ এরশাদের সিটগুলো ছাড়াই তারা সরকার গঠনে সক্ষম ছিলো। তারমানে আওয়ামী লীগ পর্যন্ত তরুণ ভোটারদের শক্তিকে চিনতে পারেনি। সেই তখন থেকে ১ কোটি তরুণ ভোটার আলোচনায় আছে। সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে তরুণ ভোটাররা আগামী নির্বাচনে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের এই ১ কোটি ভোটকে এখন ডিসাডিইং ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগে বস্তির ভোট, গরিবের ভোটকে ডিসাডিইং ফ্যাক্টর হিসেবে চিন্তা করে ভোটের আগের রাতে টাকা পয়সা বিতরণ করা হতো। কারণ তাদের ভোট ছিল ফ্লোটিং ভোট। ফ্লোটিং ভোট হলো এমন ধরনের ভোট যারা নির্বাচনের আগের রাতে কিংবা নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে কাকে ভোট দেবে সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে তরুণদের ভোটও ফ্লোটিং ভোটে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে এই ফ্লোটিং ভোটই হয়ে গেছে ডিসাডিইং ভোট। আগামী নির্বাচনে এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

২.

২০০৯ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন এরশাদ। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি বাংলাদেশের প্রাচীণতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাধার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি আসলে স্বৈরাচার নন। এরশাদের এতো বড় পুনর্বাসন থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ১৯৯০ সালের তরুণদের সঙ্গে এসময়কার তরুণদের একটা নীতিগত পার্থক্য আছে। এসময়কার তরুণরা অনেক বেশি বস্ত্তবাদী। তারা অবশ্য নিজেদেরকে প্রাকটিক্যাল বলতে বেশি পছন্দ করে।

৩.

তবে যে কথাটা ভুলে গেলে চলবে না তাহলো পশ্চিমা ভাবধারায় বেড়ে উঠা এই তরুণরা নিজের স্বার্থের হেরফের দেখতে পেলে দল বেধে পক্ষ ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। যেখানে লাভ সেদিকে তারা লাইন দেয়। আমরা দেখেছি শেয়ার বাজারের কাগজ বেচাকেনায় তারা কিভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত মহাজোট সরকারের ছত্রছায়ায় প্রবীণ খেলোয়াড়দের হাতে পর্যুদস্ত হয়েছে এই তরুণদল। ১ কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে অন্তত ৬০ লাখ ভোটার শেয়ার বাজারে পুঁজি হারিয়েছে। তারা যে লোভের বশবর্তী হয়ে শেয়ার বাজারে নির্বোধের মতো জড়িয়ে গিয়েছিল সেটাকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধুমাত্র শেয়ার বাজার লুণ্ঠনকারীদের দোষ দিচ্ছে।

৪.

এসময়কার তরুণরা হলো টিনের কড়াই। ফলে শেয়ার বাজারে পুঁজি হারিয়ে যে ৬০ লাখ তরুণ ক্ষুব্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের, তারা যে শেষ পর্যন্ত সেটা করবে না সেটাও মহাজোট সরকার জানে। সেকারণে শেয়ার বাজার কেলেংকারি নিয়ে তারা মোটেই চিন্তিত নয়। কারণ আগেই বলেছি এসময়কার তরুণরা হলো টিনের কড়াই। অল্পতেই রেগে যায়। আবার সেই রাগ পানি হতেও সময় লাগে না। সেকথা প্রাচীণ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অজানা থাকার কথা নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো একটা গরম কিছু নির্বাচনের আগে ধরিয়ে দিলেই আবারো তেতে উঠবে তরুণ দল। ১০০ জন জাদরেল ব্লগার, ১০০ জন টক শো বুদ্ধিজীবী, ডজনখানেক পত্রিকা সম্পাদক ও গোটা দশেক নিউজ এডিটর কাজ করলেই  ১ কোটি তালকানা তরুণকে ম্যানেজ করে ফেলা যাবে। অন্ততপক্ষে নীতি নির্ধারকগণ সেভাবেই ভাবছেন। তাদেরকে দোষ দেওয়া যাবে না। ২০০১ ও ২০০৯ সালে এমনটা ঘটেছে। এবার কেন ঘটবে না?

৫.

২০০১ সালের নির্বাচনের পর আমরা তরুণদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা নিয়ে ক্রিটিকাল প্রশ্ন করতে দেখিনি। সেই ধারা ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী মহাজোট সরকারের বেলায়ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১ কোটি তালকানা তরুণ ভোটার যাদের মধ্যে অন্তত ২০ লাখ ফেসবুকে সক্রিয়। ১০ লাখ ব্লগগুলোতে সক্রিয়। তারা কোন প্রশ্ন করছে না। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম ৫টি অগ্রাধিকার অঙ্গীকারের একটিও পূরণ করেনি, উপরন্তু দাবী করছে যে সবগুলো পূরণ করেছে। এনিয়ে তালকানা তরুণ ভোটাররা প্রশ্ন করছে না। জানতে চাচ্ছে না কিভাবে এতোবড় মিথ্যাচার করা হচ্ছে। কিংবা যদি সত্যিই পূরণ করে থাকে তা কেন দৃশ্যমান নয়।

৬.

মহাজোটের এক মন্ত্রী মি. ওবায়দুল কাদের দাবী করছেন যে দেশের সড়ক ব্যবস্থা বেহাল নয়। গণমাধ্যমে মিথ্যা বলা হচ্ছে। এরচেয়ে বড় মিথ্যা দাবী আর কি হতে পারে? কিন্তু ১ কোটি তরুণ ভোটার এনিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না। আরেক মন্ত্রী মি. শাহজাহান বলছেন লঞ্চের ছাদে না উঠলে যাত্রী ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী হলেও লঞ্চ ডুববে না। এতোবড় প্রতারণামূলক কথা বলার পরও ১ কোটি তরুণ ভোটার নিশ্চুপ। মাননীয় অর্থমন্ত্রী শেয়ার বাজারে ধ্বস নামার জন্য বিনিয়োগকারীদের গালাগাল করেছেন, ফটকা কারবারি বলেছেন যেখানে ৬০ লাখ তরুণ ভোটারও আছে। এর কিছুদিন পরে তিনি বলেছেন যে, তিনি শেয়ার বাজার বোঝেন না। এরপরও এই মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করেনি দেশের ১ কোটি তরুণ ভোটার। ফলে, যারা এই লেখায় তরুণ ভোটারদের তালকানা বলায় মনক্ষুন্ন হচ্ছেন তাদের সেই রাগ ও ক্ষোভ নিশ্চয়ই এতোক্ষণে চলে গেছে।

৭.

১ কোটি তরুণ ভোটারই যদি ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হবে তবে তাদের এখনই গর্জে উঠা দরকার। কারণ ভোটের সময় দেখিয়ে দেব কোন সমাধান হতে পারে না। কারণ ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে দিয়ে বিএনপি-কে এনে কি লাভ হয়েছে? পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনে কি লাভ হয়েছে? প্রতিটি দলকে একেক স্পেলে ৫ বছর করে ক্রিজে থাকার ম্যান্ডেট দিয়ে তো লাভ নেই।

৮.

সমাধান কি? সমাধান হলো তালকানাদের ক্ষমতায় অংশগ্রহণ। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের কথা যদি সত্যিই হয়। সত্যি সত্যি যদি দেশের ১ কোটি তরুণ ভোটার ক্ষমতার ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হয় তাহলে দেশের ৩০০ আসনে তাদের নিজেদের বণ্টন করে দেখা দরকার সংসদে মেজরিটি পেতে হলে তাদেরকে এলাকাভিত্তিক কতো ভোটার দরকার। তাদের নিজেদের শক্তির উপর আস্থাশীল হওয়া উচিৎ। সত্যিকারের গণজাগরণ যদি ঘটে তাদের মধ্যে তাহলে আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনের এক তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে তারা কেন ভাবতে পারবে না।

৯.

দেশে কি ১০০ তরুণ নেই, আত্মবিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। ১ কোটি তালকানা তরুণ কিন্তু আছে তাদেরকে জিতিয়ে আনার জন্য।

Advertisements

2 thoughts on “তালকানা ১ কোটি তরুণ ভোটারের গণজাগরণ, অতঃপর দুর্নীতি এবং মিথ্যাচার

  1. তালকানা আর হুজুগে যদি একই হয় তা হলে অবস্থার এই দুরবস্থাই থাকবে, আমরা হুজুগে জাতি হিসাবে পরিচয় দিতে বেশী গর্ভ বোধ করি। তাই নয় কি নবী ভাই? বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কি চায় – আমার ধারণা তাদের কাছেই স্পষ্ট নয়। আমি ভুলও হতে পাড়ি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s