সেক্সটিং বাড়ছে


sextmessageমোবাইল ফোন কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে যৌন উদ্দীপক মেসেজ বা ছবি পাঠানোকে সেক্সটিং বলে। সেক্সটিং শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেছে সানডে টেলিগ্রাফ সাময়িকী ২০০৫ সালে।  ১৪ আগস্ট সেক্সটিং শব্দটি ইংরেজি ডিকশনারীতে স্থান করে নিয়েছে।

কয়েকবছর আগে ঢাকার এক তরুণী গল্প করছিল যে, সে ইমেইলের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া এক ছেলেবন্ধুর অনুরোধে নিজের মুখবিহীন নগ্ন শরীরের ছবি পাঠিয়েছে। সেই ছবি দেখে ছেলেবন্ধুটি তাকে প্রোপোজ করেছে। তার ভাষ্যমতে, পুরো বিষয়টিই ফান। তার ব্যাখ্যা ছিলো, তথাকথিত ছেলেবন্ধুটি অন্য দেশে থাকে। তাছাড়া সে যেহেতু মুখের ছবি দেয়নি অতএব তাকে চেনার কোন উপায় নেই। তরুণীর গল্পের উদ্বেগের দিকটি হলো প্রথমত, তরুণীটি বিবাহিত। দ্বিতীয়ত, তরুণীটি এই ধরনের ছবি পাঠানো ফান ভাবছে। তৃতীয়ত, সে যে এই কাজটি করেছে সেটা বলতে মোটেই দ্বিধান্বিত হচ্ছে না। বরং এই ধরনের গল্প করাটা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। প্রায় ৭/৮ বছর আগের ওই ঘটনাকে আমার বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি আমার মাথায় থেকে গিয়েছিল। ফলে পরবর্তীতে গার্মেন্টেসের মেয়েদের মোবাইল ফোন বিনোদন নিয়ে আমি চিন্তিত হয়ে ব্লগে লিখেছি। কয়েকটি লেখাও এই ব্লগের সেক্স, পর্ণোগ্রাফি এন্ড লাইফ ক্যাটাগরিতে আছে। আজকে ইন্টারনেটে একটি রিপোর্ট পড়ে মনে হলো গঙ্গা, যমুনা, নীল, মিসিসিপির পানি অনেক দূর চলে গিয়েছে।

এখনই জানা দরকার বাংলাদেশে কি পরিমাণে সেক্সটিং হচ্ছে। কারণ বিশ্বের দেশে দেশে সেক্সটিং এখন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। জরিপের ভিত্তিতে টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রতিবেশী দেশ ভারতে শতকরা প্রায় ৫৪ ভাগেরও বেশি মানুষ সেক্সটিং করছে। অস্ট্রেলিয়া সেক্সটিং আইন কঠোর করেছে। আমেরিকা ও ইওরোপেও সেক্সটিং নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল সেক্সটিং নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিখ্যাত টাইমস সাময়িকী সম্প্রতি সেক্সটিং নিয়ে আটটি দেশের প্রায় ৫ হাজার মানুষের উপর পরিচালিত জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। সেখান থেকে দেখা যায় যে, ৬৪ ভাগ ব্রাজিলিয়ান সেক্সটিং করে।

উদ্বেগের বিষয় হলো সেক্সটিং কিশোর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আমেরিকায় এক জরিপ থেকে জানা যায় ৩০ ভাগ কিশোর বয়সী নিজেদের নগ্ন ছবি ইমেইল বা মোবাইল ফোনে অন্যদের পাঠিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে গবেষণায় আরো দেখা গেছে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা সেক্সটিং বেশি করে।

কিশোর বয়সীরা কেন সেক্সটিং করে, সেব্যাপারে ভারতীয় মনোরোগ ও আচরণগত বিজ্ঞান বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, আবেগপ্রবণ, অরক্ষিত, একাকী ও স্নেহবিহীন সন্তানেরা এই ধরনের কাজে জড়িয়ে যেতে পারে। তারা আরো মনে করেন, ভারতে সেক্সটিং বাড়ার কারণ যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া; পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, গভীর রাত করে পার্টি, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে বেশি সময় ধরে থাকা ইত্যাদি।

এখানে উল্লেখ করা দরকার আমাদের দেশে বিশেষ করে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে বুয়া কালচারে বেড়ে উঠা শিশুরা আবেগপ্রবণ, অরক্ষিত, একাকী এবং মা-বাবার স্নেহবিহীনভাবে বেড়ে উঠছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন যে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা কিশোরবয়সীদের মধ্যে সেক্সটিং বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

বিশ্ব জুড়ে সেক্সটিং বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়াতে ৩২টি কিশোর-কিশোরীর সেক্সটিং বিষয়ে বিচার হয়েছিল। ২০০৯ সালে আমেরিকার পেনসিলভানিয়াতে ছয়জন কিশোরীর বিরুদ্ধে শিশু পর্ণোগ্রাফির অভিযোগ আনা হয়েছিল। তারা তাদের সহপাঠী তিনজন কিশোরের ফোনে যৌন উত্তেজক ছবি পাঠিয়েছিল।

শুরুতে সেক্সটিং মূলত যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও কানাডার মতো দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিলো। ২০০৮ সালের আমেরিকার এক জরিপ থেকে জানা যায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ১৩-২০ বয়সী ২০ ভাগ ছেলেমেয়ে তাদের সম্পূর্ণ নগ্ন কিংবা অর্ধনগ্ন ছবি অন্যকে পাঠিয়েছে। ২০-২৬ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সংখ্যাটি ৩৩ ভাগ। সেসময়ে আরো জানা যায় যে, ১৩-২০ বছর বয়সী ৩৯ ভাগ এবং ২০-২৬ বছর বয়সী ৫৯ ভাগ যৌন উত্তেজক টেক্সট মেসেজ অন্যকে পাঠিয়েছে। ১,২৮০ জনের উপর পরিচালিত জরিপের এই ফলাফল প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কলোরাডো কলেজের এক সমাজবিজ্ঞানী সেসময়ে ৮০ জন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনের শেষ ১০টি মেসেজ চেক করে দাবী করেন যে, তিনি তাদের ফোনে আপত্তিকর কিছু পাননি। কিন্তু তাতে মোবাইল ফোনে নগ্ন ও অর্ধনগ্ন ছবি বিনিময় থেমে থাকেনি। থেমে থাকেনি গবেষণা ও জরিপ। পক্ষে বিপক্ষে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নানান ধরনের জরিপ ও গবেষণা চলছে। সংখ্যাগত মতভেদ ও তারতম্য থাকলেও ঘটনা যে ঘটছে সেনিয়ে কারো দ্বিমত নেই। ২০১১ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেলো ২.৫ শতাংশ তাদের মোবাইল ফোনে বিগত একবছরে যৌন উত্তেজক ছবি পেয়েছে কিংবা পাঠিয়েছে। ২০১২ সালের আমেরিকার ১৪-১৮ বছর বয়সীদের উপর পরিচালিত আরেক জরিপে দাবী করা হয়েছে ২০ ভাগ তাদের নিজেদের যৌন উত্তেজক ছবি অন্যকে পাঠিয়েছে এবং ২৫ ভাগ সেই ছবি আবার অন্যকে ফরোয়ার্ড করেছে।

কেউ কিন্তু বলছেন না সেক্সটিং নেই। প্রশ্ন হলো সেক্সটিং বাংলাদেশে কতোটা বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের দেশে তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন। গবেষণা হয়ও কম। কিন্তু আমাদের দেশে মোবাইল ফোনের বিস্তার ঘটেছে অন্য যেকোন উন্নত দেশের মতোই। মোবাইল ফোন এখন হাতে হাতে। দেশের ৮ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। টাইম সাময়িকীর ডেপুটি ম্যানেজিং এডিটর ন্যান্সি গিবসের মতে, ‘বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে মানুষ কলের পানি পায় না কিন্তু তাদেরও মোবাইল ফোন আছে।’

মোবাইল ফোন এখন শুধু কথা বলার যন্ত্র না। ছবি দেখা, ছবি তোলা, গান শোনা ইত্যাদি সব কিছুতেই এখন মোবাইল ফোন। বাংলাদেশের ৩৩ লাখ গার্মেন্টস কর্মীর মোবাইল ফোন তাদের বিনোদনের সবচেয়ে বড় বাহন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ফোনে গান ও ভিডিও লোড করার দোকানগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা স্বল্প আয়ের মানুষেরা। এই ধরনের দোকানগুলোর আয়ের বড় অংশ আসে পর্ণো ছবি লোড করার মাধ্যমে। এরপর রয়েছে হিন্দি ছবির উত্তেজক গান। বাংলাদেশে এই নিয়ে তেমন কোন গবেষণা নেই। মফস্বলের চিত্র এর ব্যতিক্রম নয়। ব্যক্তিগতভাবে ফোনের লোড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এবং পত্রিকার রিপোর্ট থেকে বললাম।

সেক্সটিং কোন দেশেই কিংবা সমাজেই ভালো কাজ হিসেবে গন্য হচ্ছে না। বরং অনেক দেশেই এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তাহলে, এর বিস্তার বন্ধ করা আবশ্যক কি বলেন? প্রশ্ন হলো কিভাবে?

মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট দুটোই জীবনের প্রয়োজনে দরকারি উপাদান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এগুলোর ব্যবহার তো বন্ধ করা যাবে না। তাহলে উপায়গুলো কি? একটি বড় উপায় বোধহয় পরিবারের মধ্যে প্রকৃত পারিবারিক আবহ ফিরিয়ে আনা। এছাড়াও আরো যা করা যেতে পারে:

  • সামাজিক বন্ধনগুলো মজবুত করা।
  • মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। যেমন, দিনে রাতে কম টাকায় কথা বলুন। কিংবা সংযোগ কিনলেই বিনামূল্যে ১০০ এমএমএস ইত্যাদি।
  • কিশোর কিশোরীদের ফোন ব্যবহারের উপর নজর রাখা।
  • পরিবার ও বিদ্যালয়ে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া।
  • শিশু কিশোরদের জন্য বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করা।
  • মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করার কর্মসূচি গ্রহণ।
  • সমাজ থেকে দুর্নীতি কমানো।
  • টেলিভিশন ও সংবাদ মাধ্যমের উপযুক্ত ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসা।
  • রাষ্ট্র থেকে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে এগিয়ে আসা।

আরো অনেক কিছুই হয়তো করার আছে। আমি ভাবছি। আপনিও ভাবুন। পরিবারে ও পরিচিত মহলে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করুন। সেক্সটিং ব্যাধিতে পরিণত হওয়ার আগেই রুখে দিন। দেশটা কিন্তু থাকবে। আমাদের সন্তানেরা কিন্তু থাকবে। থাকব না আমি আপনি। কিন্তু আমরা কি করে গেলাম সেগুলো নিয়ে কিন্তু আালাপ হবে। গালি হবে। প্রশংসা হবে। যেমনটা আমরা করে থাকি আমাদের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে। তাহলে কি করবেন বলে ঠিক করেছেন? শুধু অর্থের পেছনে দৌড়াবেন নাকি একটি সুস্থ সমাজ তৈরিতে নিজের সীমিত সাধ্যকে কাজে লাগাবেন? কি উদাহরণ রেখে যাচ্ছেন, ভেবেছেন কি? আপনার পদচিহ্ন কি বলে? আয়নায় দেখুন। সমাজটা যদি আপনার হয়, সন্তান যদি আপনার হয় দায়িত্ব কিন্তু আপনারই।

One comment

  1. কয়েকমাস আগে নীলক্ষেতের আশে পাশের কয়েকটি স্কুলের কিশোর বষসী ছাত্র-ছাত্রীদের মোবাইল ফোনে পর্ণো ছবি, ভিডিও খুজে পাওয়ার ওপর পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছিল। সেক্সটিং আমাদের সমাজে হচ্ছেনা, তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। আমাদের সমাজে বিদ্যমান সমস্যা এতো বেশী আর এতো বিচিত্র যে এসব নিয়ে কাজ করার মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ আর মানসিকতাই আমাদের এখনো গড়ে ওঠেনি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s