পাই টু পাই বনাম রাষ্ট্র এবং শেয়ালের ভূমিকায় সরকার


জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের সাধারণ দায়িত্বগুলো বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার হয় না। সচেতন নাগরিক হলেই হয়। একটু কষ্ট করে সংবিধান পড়ে নিলে হয়। তখন দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের ও সরকারের দিক থেকে সংবিধান রক্ষায় তাদের অঙ্গীকার ও সাফল্য বোঝা সহজ হয়। একজন নাগরিক হিসেবে কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই বলা যায়- রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ব্যর্থ। আবার যেহেতু রাষ্ট্র নিজে কিছু করে না। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে, ফলে বর্তমান সরকার ব্যর্থ। আমজনতা হিসেবে সরকার বলতে আমরা কি বুঝি? সরকার হলো জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কিছু মানুষ, যাদের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সাধারণভাবে এদেরকে আমরা এমপি হিসেবে চিনি। বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপির সংখ্যা ৩০০ জন। এই ৩০০ জন মানুষই দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি। দেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার দায়িত্ব এদের সবার। এই ৩০০ জন এমপি দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেন বিধায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান। আর বাকিরা বিরোধী দলে অবস্থান নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভকারী দলের কর্মকান্ডকে সঠিক পথে পরিচালনা করার কাজে সহায়তা করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের এমপিরা যে সকল আসন থেকে নির্বাচিত হন সেই সকল আসনে বিরোধী দলের এমপিরাও ভোট পান। অর্থাৎ সেখানেও তাদের জনসমর্থন থাকে। এমন কোন স্থান নেই যেখানে এককভাবে একটি দল সব ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ সরকার ও বিরোধী দল মিলেই কিন্তু দেশ পরিচালনা করা উচিৎ। কিন্তু গণতন্ত্রের এই স্বাভাবিক চিত্রটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে সফল না হওয়ার এটাও কারণ। সরকার ও বিরোধী দল মিলে দেশটাকে রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিভক্ত করে রেখেছে। মারামারি হানাহানি নিত্য দিনের ঘটনা।

সাধারণ মানুষ এমপিদের উপর আস্থা রেখে তাদেরকে রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার দায়িত্ব দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশে ভোট ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন একটি রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। এখানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়াটা সবচেয়ে বড় বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে না থেকে এখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে চলে গিয়েছে। যা হওয়ার কথা নয়।

দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা জানি রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণ মানুষের। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র। অর্থাৎ তারা হলেন জিম্মাদার। তাদের জিম্মায় দেশকে রাখা হয়েছে। জনগণের দেশ তাদের কাছে আমানত। এমপি ও মন্ত্রীরা সেই আমানত রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

স্বাভাবিকভাবে একজন নীতিবান মানুষের কাছে আমানত মানে অন্যের ধন বুকে আগলে রাখা। আর একজন নীতিহীন মানুষের কাছে আমানত রাখা মানে শেয়ালের কাছে মুরগী রাখার মতো। প্রতিদিন এতো বেশি আমানত খেয়ানতের ঘটনা শুনতে হচ্ছে যে, বলতে বাধ্য হচ্ছি এখন যারা সরকারে আছেন তারা শেয়ালের ভূমিকায় অবর্তীন হয়েছেন।

সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য রাষ্ট্রের একটি নির্বাহী বিভাগ থাকে। যারা জনপ্রতিনিধিদের হুকুম তামিল করে। এরা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী মেধাবী লোকজন। একটি সাধারণ ধারণা হলো, জনপ্রতিনিধিগণ সবসময় উচ্চশিক্ষিত নাও হতে পারেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিগণ অবশ্যই জ্ঞানী হবেন। অর্থাৎ তাদের মধ্যে সকল ধরনের মানবিক গুণাবলী থাকবে। প্রত্যুৎপন্নমতিতা থাকবে। শিক্ষিত লোকজনকে পরিচালনা করার দক্ষতা থাকবে। অন্যদিকে, নির্বাহী বিভাগের লোকজন যতোটা সম্ভব মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হবেন। তারা সবসময় জ্ঞানী নাও হতে পারেন। কিন্তু তাদের শিক্ষা যাতে অশিক্ষা-কুশিক্ষায় পরিণত না হয় অর্থাৎ তারা যাতে বেলাইনে চলে যেতে না পারেন সেটা জনগণের প্রতিনিধিরা দেখবেন। এই দেশের জনগণের দুর্ভাগ্য হলো তারা জ্ঞান ও মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন জনপ্রতিনিধি না পাওয়াতে নির্বাহী বিভাগ জনগণবিরোধী একটি স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। যারা জনগণের কল্যাণে নয় বরং জনপ্রতিনিধিদের তোষামোদকারীতে পরিণত হয়েছে।

সাধারণভাবে আমরা বুঝি সরকার ও নির্বাহী বিভাগ যখন স্বেচ্ছাচারী হবে তখন জনগণের মর্যাদা রক্ষায় বিচার বিভাগ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু কোন কারণে যদি সেটা কাজ করতে না পারে তাহলে কি হবে? এই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর আমার জানা নেই।

এই মুহুর্তে প্রতিদিনকার পত্রিকায় ও গণমাধ্যমের অন্যান্য শাখায় অর্থাৎ রেডিও এবং টেলিভিশন এবং ফেসবুকসহ ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কখনো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনো সরকারি লোকজনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে, কখনো সরকারের অসচেতনতায় বিভিন্ন ধরনের জনগণবিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনার কথা জানা যায়।

বুয়েটে মেধাবী শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন নাজেহাল হচ্ছে। তাদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত শেষ মুহুর্তের অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত ঘোষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করা ও পরবর্তীতে তাদেরকে দমনের নামে পুলিশ দিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। ভেজাল ও খাদ্যে বিষ মেশানোর মতো প্রাণঘাতি কর্মকান্ড রোধে বিষের উৎস ধ্বংস না করে বরং লোক দেখানো কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে জনগণকে ধোকা দেওয়া হচ্ছে। জনগণকে ভীতি প্রদর্শন করার মাধ্যমে তাদেরকে সেলফ সেন্সরশিপ আরোপে বাধ্য করা হচ্ছে। মুহু মুহু মিথ্যা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হচ্ছে আর্থিক খাতে। ইতোমধ্যে শেয়ার বাজারে কারসাজি করে অন্তত ৩০ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অর্থ লোপাট করে তাদের জীবনকে কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবারের পুষ্টিমান কমিয়ে দিয়ে জীবনযাপন কঠিন করে দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তাদেরকে এক ধরনের চাপের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই সুযোগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ লোপাটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো চোখের আড়ালে থেকে যায়। মাঝে মাঝে দুয়েকটা প্রকাশ পায়। এমনই একটি ঘটনা সম্প্রতি বেশ আলোচিত হয়েছে। সেটা হলো হলমার্ক গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ঋণ গ্রহণ করা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা এই গ্রুপ ঋণ নিয়েছে। আর্থিক খাতের এই অনিয়ম ধরা পড়ার পর হলমার্কের এমডি মি. তানভীর মাহমুদ অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলছে যে, পাই টু পাই তারা শোধ করে দেবে।

এই দেশে অন্তত ১ কোটি তরুণ বেকার জীবন যাপন করে। যারা মাত্র ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পুঁজি পেলে আত্মকর্মসংস্থান করে নিতে পারে। অর্থাৎ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ কোটি টাকায় দেশের ১ কোটি তরুণের বেকার জীবনের অবসান হতে পারে। এই হিসেবে শুধুমাত্র হলমার্ক গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারির অর্থে দেশের অন্তত ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিলো। আর শেয়ার বাজার থেকে যে পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে তা দিয়ে দেশের ৩০ থেকে ৪৫ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান সম্ভব ছিলো। জাপানের হোন্ডা কোম্পানি বাংলাদেশে মাত্র ৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ৭০ ভাগ শেয়ারের মালিকানা নিয়ে মোটরসাইকেল সংযোজন ও বাজারজাত করবে। মাত্র ২ বিলিয়ন বা ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বলে টাটা কোম্পানির পিছনে আমাদের দেশের আমলা ও মন্ত্রীরা একসময় হন্য হয়ে ছুটেছে ও তাদেরকে কি কি ছাড় দেওয়া যায় সেনিয়ে ভেবেছে। অথচ শুধুমাত্র এই সরকারের আমলে দেশের মানুষের অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। আমরা ২১ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের শর্ত মানতে মানতে হাপিয়ে যাচ্ছি। তবুও দৌড়াচ্ছি। অথচ শুধুমাত্র জনপ্রতিনিধিরা যদি জনগণের অর্থ লুটপাট বন্ধ করে ২১ হাজার কোটি টাকা এমনিতেই পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশ। এই দেশে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের মতো নেতা জন্ম নিয়েছেন। এই দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা জন্ম নিয়েছেন। এখন এই দেশের দায়িত্ব নিতে হবে তরুণদের। যারা দেশ গঠনে নিজের উপর জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। পাই টু পাই শোধ করার নামে হাজার কোটি টাকা লোপাট করবে না। টক শো গুলোতে বড় বড় কথা বলবে আর হলমার্কের মতো গ্রুপগুলোর অবৈধ অর্থ লুটপাটে সহায়তা করবে না, যেমনটা করেছেন আওয়ামী লীগের নেতা ও বিশিষ্ট টক শো বক্তা সুভাষ সিংহ রায় কিংবা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত, সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে থাকার মাধ্যমে।

তরুণরা বরং জনগণের প্রতিনিধি হয়ে দেশ পরিচালনা করবে। তারা এমপি হবে। নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব নেবে। বিচার বিভাগের দায়িত্ব নেবে। এভাবেই তারা পাই টু পাই করে জনগণের দেশ বাংলাদেশকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেবে। দেশ থেকে শিয়ালরা বিদায় নেবে। দেশ সোনার বাংলাদেশ হবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s