সরকারি আমলাদের তু্ই, তুমি


ভূমিকা:

তুই, তুমি কাহিনী বলার আগে জানানো দরকার যে, এই ব্লগে চার পর্বের ভাবী কাহিনী (http://tinyurl.com/c3rrs88) পড়ার পর অনেকেই কাহিনী জানাতে চেয়েছেন। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত বলেননি। আমিও খুব একটা তাদের পেছনে লেগে থাকতে পারিনি। এমনিতেই বেসরকারি রেডিও-র অন্দরমহল এবং ক্যাডেট কলেজ সংক্রান্ত দু’টি লেখা শুরু করে আগানো হচ্ছে না। সেগুলো শেষ করা দরকার। ফলে, ভাবী কাহিনীর পর সরকারি আমলাদের নিয়ে আর লেখা প্রকাশিত হয়নি।

মাত্র গতকাল নীলাঞ্জনা (ছদ্মনাম) নামের একজন সরকারি কর্মকর্তা আমলাদের এক কাহিনী শোনালেন। গভীর রাতে শোনা সেই কাহিনী ভুলে যাওয়ার আগে লিখে ফেলা দরকার কি বলেন!

এক.

‘নিজের অধীনস্ত কর্মচারীদের বাপের বয়সী হলেও তুই, কিংবা তুমি করে বলাটা সরকারি আমলাদের কাছে আভিজাত্যের প্রকাশ। আপনি কি এটা জানেন?’ নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।

আমি একমত হতে পারলাম না। তবে আমার একমত হওয়া না হওয়াটা নিয়ে নীলাঞ্জনার মাথাব্যথা ছিলো না! আমি জানি, তিনি প্রশ্নটা এমনিতেই করেছেন। উত্তর পাওয়ার জন্য নয়।

“‘মুই কি হনু রে’ হলো আমলাদের একটা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।” নীলাঞ্জনা তখনো বলে যাচ্ছে। আমি আপত্তি জানালাম। কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আমলাকে চিনি। তারা কিন্তু এমন নন। নীলাঞ্জনা আমার এই বাধাকে পাত্তা দিলো না। বলল, ‘আমি সরকারি অফিসে কাজ করি, নাকি আপনি?’

‘সরকারি অফিসে আমি কাজ করি না। সেটা বলতে পারি। কিন্তু আপনি কাজ করেন কিনা সেটা নিশ্চিত নই!’

‘মানে?’

‘মানে হলো আমি আপনাকে চিনি না। ফেসবুকে আপনার সঙ্গে পরিচয়। এরপর ফোন। অতএব আপনি যা বলছেন সেটা সত্যি কিনা কি করে নিশ্চিত হবো।’

‘আমি কেন আপনাকে মিথ্যা বলতে যাব?’

‘আমি কিন্তু বলিনি যে, আপনি মিথ্যা বলছেন।’

‘একটা সিরিয়াস বিষয় জানাতে আপনাকে ফোন দিয়েছি। এতো রাতে ফান করার জন্য নয়। মিথ্যা বলার জন্যও নয়। আপনার ভাবী কাহিনী পড়ে মনে হলো আপনাকে তথ্য দিলে আপনি লিখতে পারবেন।’

‘সে, আমি লিখতে পারব।’

‘সেটা আমি জানি বলেই তো আপনাকে ফোন দিলাম। মানুষকে জানানো দরকার।’

‘মানুষ জেনে কি করবে?’

‘তারা তাদের পরিবারে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবে। বিশেষ করে বাবা-মা তাদের সন্তানদের আদব কায়দা শেখাবে।’

‘মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, যারা ইতোমধ্যে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হয়েছেন তাদেরকে আদব কায়দা শেখানোর সুযোগ এখনো আছে? হাহাহাহহাহা।’

‘এটা হাসির কথা না। শেখার সুযোগ সবসময় থাকে। আমার নিজের পরিবারে অনেক প্রবীণ আমলা আছেন। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি যে, আগে এমনটা ছিলো না। তারমানে এই সংস্কৃতি নবীন। এটা যখন নতুন তৈরি হয়েছে, তখন দূর করাও যাবে। আমি আশাবাদী।’

‘বেশ, আমিও আশাবাদী। বলুন ঘটনা শুনি।’

দুই.

‘আর্মি, পুলিশ, এডমিন এমন কিছু কিছু ক্যাডার আছে যারা তাদের অধীনস্তদের তুই, তুমি করে কথা বলে। মানে পাওয়ার দেখায়। তুই, তুমি তো অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ হতে পারে না। অফিসিয়ালি একজন আরেকজনকে আপনি বলবে তাই না? তবে অফিস কলিগদের মধ্যে বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে উঠলে তখন না হয় তারা নিজেদের মধ্যে তুমি বলতে পারে।’

একবার মনে হলো জিজ্ঞাসা করি কেমন সম্পর্ক? কিন্তু পরক্ষণে সেই চিন্তা বাদ দিলাম। অচেনা অজানা একটি নারীর সঙ্গে রাত বিরাতে এমন ফান করা ঠিক হবে না। বরং কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম।

নীলাঞ্জনা বলে যাচ্ছেন, ‘অধীনস্ত মানে যে দারোয়ান, পিয়ন তা কিন্তু নয়। সেটা যদি হয়ও, তখন কি তাদেরকে তুই, তুমি বলা যাবে? যাবে না। আপনি কি জানেন আমাদের দেশের অফিস অ্যাসিটেন্ট কিংবা হেড ক্লার্করাও কখনো কখনো মাস্টার্স ডিগ্রীধারী হয়। তারমানে অফিস অ্যাসিটেন্ট কিংবা হেড ক্লার্ক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সমান লেখাপড়া জানা। আচ্ছা লেখাপড়ার কথা বাদ দিন। একজন অফিস কলিগকে কি করে তুই তোকারি করা যায়?’

বুঝতে পারলাম, নীলাঞ্জনার মধ্যে এতোটাই রাগ ক্ষোভ তৈরি হয়েছে যে, কাহিনীতে আপস এন্ড ডাউন চলবে। আচ্ছা চলুক। যেভাবে বলবে আমিও না হয় সেভাবেই লিখে দেব।

‘না তুই তোকারি করা ভালো না।’ আমি বললাম।

‘সেটাই। কিন্তু আপনি জানেন সরকারি কর্মকর্তাদের যখন ট্রেনিং হয় তখন একটি বিশেষ ক্যাডারের লোকদের জানানো হয় যে, ওই ক্যাডারের কালচার হলো ব্যাচমেটদের তুমি করে বলা। আর নাম ধরে ডাকা। দু’জনের মধ্যে বয়সের পার্থক্যটা এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। একই ব্যাচে কিন্তু দু’জন কর্মকর্তার বয়সের পার্থক্য ১০ বছর পর্যন্তও হতে পারে। ফলে একই ব্যাচের কর্মকর্তারা সবাই সমবয়সী নয়। আপনি কি বুঝতে পারছেন আমার কথা?’ আমি কিছু বলার আগেই নীলাঞ্জনা বললেন, ‘আচ্ছা আরেকটু খুলে বলি।’ আমার মনে হলো বলুক না।

‘ধরা যাক আমি ২৪ বছরে বয়সে মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস দিয়ে প্রথমবারেই চাকরিতে ঢুকলাম। আরেকজন আমার আগে মাস্টার্স শেষ করেছে কিন্তু কয়েকবারের চেষ্টায় বিএসএস উত্তীর্ণ হলো ফলে তার বয়স ২৮ বছর হলেও সে কিন্তু আমার ব্যাচেরই কর্মকর্তা। এখন তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড় হলেও আমি তাকে তুমি বলব। নাম ধরে ডাকব। আবার পরেরজন যদি আমার পরের ব্যাচে উত্তীর্ণ হন তবে তিনি চাকরিতে আমার জুনিয়র হবেন কিন্তু বয়সে বড়। তখন তাকে আমি শুধু তুমি বলব তা নয়, তিনি আমাকে স্যার বলবেন। এভাবেই আমলারা জুনিয়রিটি ও সিনিয়রিটি করে। এবার বুঝেছেন?’

মনে হলো বলি, আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু সেটা না বলে বললাম- ‘জ্বি বুঝেছি।’

‘তাহলে আরো শোনেন।’ নীলাঞ্জনা বলে চলল, ‘তবে সবাই যে এমন তা কিন্তু নয়। ব্যতিক্রম আছে। এবার একটু অন্যভাবে বলি। আমি তো বড়দের কিংবা অপরিচিত কলিগদের কখনো তুমি করে বলতে পারি না। তো এমনও দেখা গেছে প্রথম পরিচয়ে আমি জুনিয়র কলিগদের আপনি বলায় ওখানে উপস্থিত সিনিয়ররা হাসাহাসি করছে। তারমানে কি আমরা পরিবার থেকে বড়দের আপনি বলা, তাদেরকে সম্মান করার  যে বিষয়টি শিখে এসেছি, আমাদের সেই শিক্ষা এখানে হাসির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমাদের যে কালচার সেখানে তাহলে কোনটা ঠিক?’

‘আরেকটি বিষয় হলো অর্ডার করা। আমলাদের শেখানো হয়, জুনিয়রদের সবসময় কাজের অর্ডার করতে হবে। তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হবে। এটাই নিয়ম। আমি অবাক হয়ে দেখি, আমার ব্যাচের অফিসাররা কি অবলীলায় এটা করছে। জুনিয়ররাও সেই আদেশ শুনছে। কারণ তারা জানে একসময় তারা যখন সিনিয়র হবে তখন তারাও এটা করতে পারবে।’

‘আমার কথা হলো সিনিয়রিটি আর হায়ারারকি তো এক জিনিস নয়। কিন্তু বেশিরভাগ অফিসার দু’টাকে মিলিয়ে ফেলে। যেমন ধরেন, একজন এডিসি বা ডিসি একজন অ্যাসিটেন্ট কমিশনারের চেয়ে সিনিয়রিটি ও হায়ারারকি উভয়ভাবে উপরে কিন্তু দুটি পৃথক বছরে অ্যাসিটেন্ট কমিশনার হিসেবে যোগ দেওয়া দুজনের মধ্যে আগে যোগ দেওয়া ব্যক্তিটি পরের জনের সিনিয়র কিন্তু হায়ারারকিতে সিনিয়র নন।’

তিন.

‘একবার ট্রেনিংয়ে গিয়ে মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওখানে অনেক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে ট্রেনিং হয়েছিল। দেখলাম ক্যাডার ক্যাডারে এক ধরনের দলবাজি!! সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, ‘প্রশাসন’ ক্যাডার অন্যদের চেয়ে আলাদা। ফলে অন্য ক্যাডারের সিনিয়র কাউকে স্যার বলার দরকার নেই। কিন্তু ওই ক্যাডারের মধ্যে একব্যাচ সিনিয়র হলেও স্যার বলতে হবে।’

‘আগে আমার ধারণা ছিলো এই ধরনের বিষয়গুলো শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীতে আছে।’

চার.

এই যে সিনিয়র জুনিয়রিটি এখানে একটা মজার ফাঁক আছে। যেমন ধরুন অবসরে যাওয়াটা কিন্তু সার্টিফিকেট বয়স অনুযায়ী। ব্যাচ অনুযায়ী নয়। মানে একই ব্যাচে দু’জনের একজনের বয়স ২২ বছর এবং আরেকজনের বয়স ৩২ বছর হতে পারে। ফলে, প্রথমজনের চেয়ে দ্বিতীয়জন একই ব্যাচের অফিসার হওয়া সত্বেও ১০ বছর আগে অবসরে যাবেন। তাহলে কি দাড়ালো?

আবার একই ব্যাচের সবাই একে অপরকে ‘তুমি’ বললে কি হতে পারে সেটার একটা উদাহরণ দেই। এক কলিগ ৪/৫ বছরের ছোট হওয়া সত্বেও আমার সামনে অনুমতি ছাড়াই সিগারেট ধরালো তারপর আমার নাকে মুখে ধোয়া ছেড়ে বলল, ‘তুমি আমার চেয়ে বড় সেটা মনে রাখো কেন? এক ব্যাচ মানে তুমি আমি সমান। এরপর সে জানতে চাইল, সিগারেট খাবো নাকি?’

এবার সিনিয়র জুনিয়রের জটিলতার দিকটা বলি। ধরুন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র আর সিনিয়র দু’জন একই ব্যাচের কর্মকর্তা। ফলে, দু’জন দু’জনকে নাম ধরে ডাকবে আর তুমি করে বলবে। কিন্তু সেটা এখানে হয় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই হওয়ায় ওখানে সিনিয়রিটি মেনে চলেছিল সেটা এখানেও মেনে চলবে। কিন্তু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের তুমি করে বলবে। নাম ধরে ডাকবে। কি আশ্চর্য তাই না। আমরা পরিবারের, সমাজের শিক্ষাটাকে কতো সহজে বদলে দেই। সেটা যদি ইতিবাচক হলে আপত্তি করার ছিল না।

শেষ করব একটা ঘটনা বলে।

‘একবার কি হলো আমি গাড়িতে বসে গাড়ির বয়স্ক ড্রাইভারকে বরকত সাহেব বলায় আমার কলিগরা বলে বসল, বরকত আবার সাহেব হলো কবে? তারপর সেকি হাসি তাদের।’

আমার অফিসে একজন বস ছিল যে কিনা কর্মচারীদের মাঝে মাঝে কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে গালাগাল করত।

পাঁচ.

নীলাঞ্জনাকে আমি ধন্যবাদ জানালাম ফোন করার জন্য। নীলাঞ্জনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। কালচার। আমাদের পরিবার ও সমাজে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, বড়দের সম্মান করে কখা বলার। আপনি বলার। সেটা নিছক সম্বোধন নয়। এর সঙ্গে এক ধরনের বন্ধন ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। আমি তার সঙ্গে একমত। নীলাঞ্জনা আমাকে কথা দিয়েছেন আবারো ফোন করবেন। কিংবা ফেসবুকে চ্যাট করবেন। তখন তিনি আমলাতন্ত্রের অন্য কিছু জানাবেন। আপাতদৃষ্টিতে ছোটখাটো এই বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে দেখলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি নীলাঞ্জনার জানানোর অপেক্ষায় থাকব, তবে অন্য কেউ আমাকে কিছু জানালে আমি সেগুলো নিয়েও আপনাদের সমীপে হাজির হব। সেই পর্যন্ত খোদা হাফেজ।

পল্লবী, ঢাকা।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১২

Advertisements

11 thoughts on “সরকারি আমলাদের তু্ই, তুমি

  1. আমার মনে হচ্ছে এই মহিলার সমস্যা আছে, কমপ্লেক্সে ভুগেন। ইনি কেমন কাজ করেন সে সম্পর্কেও জানা হলো না, যতদুর বুঝতে পারছি ইনি নিজের কর্মক্ষেত্রে কাজ নিয়ে সুবিধা করতে পারছেন না, ফোনে এত বকর বকর করলো, সিনিয়রিটি/জুনিয়রিটি/হায়ারারকি ইত্যাদী নিয়ে প্যাচাল পাড়লো, কিন্তু কাজ নিয়ে কিছু বললো না। সরকারী চাকুরী বলেই খুব সম্ভবত টিঁকে গেছেন, প্রাইভেট বা কর্পোরেট হলে অনেক আগেই ইতি টানতে হতো।

    উনার স্বামীর নিশ্চয়ই অবস্থা দফারফা, বেচারা! 😦

    রাতের বেলায় ফোন নিয়ে কিছু বলার নেই! 🙂

    • এটা লেখকের দুর্বলতা। নীলাঞ্জনার কাজের প্রতি যে দরদ সেটি ঠিকমতো ফুঁটিয়ে না তুলতে পারাটা লেখকের দুর্বলতা। তবে কাজ নিয়ে তার কি কিছু বলার ছিলো। হয়তো পরে বলবেন। অন্য কোন দিন। সেটা যদি রুটিন কাজের বর্ণনা হয় তবে কি আমি শুনব?

      • লেখকের দূর্বলতা কিনা নিশ্চিত নই; আমার মনে হয়েছে কথোপকথনটা লেখক লিপিবদ্ধ করেছেন। অবশ্য সেখানে যদি তিনি কিছু বাদ দিয়ে থাকেন, তবে অন্যকথা।

        কাজ নিয়ে অবশ্যই কিছু বলবার আছে। দেখুন ‘আমলাতান্ত্রিক মনোভাব’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। দেখুন ১৫ বছর হলো দেশে এবং বিদেশে বড়-ছোট কিছু কাজ করে দিন গুজরান করছি। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যেটা হলো যিনি যে কাজ করছেন, দিনশেষে সেখানে কিছু একোমপ্লিশমেন্টের (বাংলা কি হবে মাথায় আসছে না) অনুভুতি। বাংলাদেশে কাজ করবার সময় নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি, সরকারী চাকুরী যারা করেন, তাদের ভেতরে এই জিনিষটি কম। কিছু একটা করলেই হলো ধরনের ব্যাপার। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যই এমন হয় বলে ধারনা করি… যেমন পূর্তমন্ত্রণালয়ের কাউকে কাল ধর্মমন্ত্রণালয়ে বদলি করলে তার কাজের বিশেষ কোন পরিবর্তন হবে না, বরং তার চিন্তা হলো তিনি সমান পদ অথবা পদোন্নতি পাচ্ছেন কিনা, অথবা ওএসডি করা হচ্ছে কিনা, ইত্যাদী। আগে তিনি কি করছিলেন, যা যা কাজ তিনি অসমাপ্ত রেখে এসেছেন, সেসবের কি হবে, অথবা চেইন অফ কমান্ডে যিনি ছিলেন তার পরেই তিনি যথেষ্ঠ প্রশিক্ষন পেয়েছেন কিনা, ইত্যাদীর কোন খবর নেই… এমন হয়তো আসলে হবার নয় লাল ফিতার দৌরাত্ত্বে… কাজ তো কিছু হয় না! ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে এর পেছনে দায়ী, তাও বলা মুস্কিল… তাহলে ব্রিটেনে আমলাতন্ত্র কিভাবে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে?

        এসব আসলে বেকার কথা… কাজ কে কতখানি নিষ্ঠার সাথে করে আরাম পায় আর পয়সা হালাল করে, সেই বুঝ মানুষের নিজের কাছে… আমার আগের অফিসের এমডির এক ড্রাইভার ছিলো, তার কাজ ছিলো এমডির যাতায়াত নিশ্চিত করা, সেইটি সে জান লাগিয়ে করতো, এবং সেটি নিয়ে তার গর্বও ছিলো। এই লোকটি দেখুন আমরা সচরাচর যেসব আমলাদের দেখি, তাদের চাইতে অনেক বেশী মানুষ… নিজের রোজগার হালাল করে নিয়েছে। এই দায়টুকু যার যার তার তার… আমাদের আমলারা আছেন কিসের জন্য? আমলাতন্ত্র হলো সরকারকের শোষণের হাতিয়ার (অথবা মতান্তরে বিপরীত), জনগণের কাজে আসার পরিবর্তে এদের কাজ হলো পদে পদে হয়রানী করা। আমার কথা বিশ্বাস নয় হয় রাস্তায় গিয়ে যেকোন সাবালককে জিজ্ঞাসা করে দেখেন! এই ব্যবস্থাটা ছিনে জোঁক, আর এদের লোকগুলোও একেকজন একেকটা জোঁক (এবং জোকও বটে)। অন্যথা যে হয় না, তা নয়, অবশ্যই হয়, তবে তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়। রোকনুদ্দৌলা বলে এক ম্যাজিষ্ট্রেট কিছুদিন ভেজাল ধরলেন, তো তার হাঁড়ির হাল করে দিলে সবাই মিলে। অবস্থা এমন হয়েছে যে হয় একজন এই শোষনযন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে একীভূত হয়ে যাবেন, নইলে বের হয়ে হারিয়ে যাবেন। এর বাইরে আর কিছু নেই।

        কাজ নিয়েই আপনার এই মহিলার বলবার ছিলো। যদি তিনি কাজ করে থাকেন, তবেই এইসব সিনিয়রিটি/জুনিয়রিটি/হায়ারারকি নিয়ে বলতে পারতেন… বলতে পারতেন কোথায় জটিলতা, জুনিয়রদের কোন কাজে সিনিয়ররা বাঁধা দেন। যেমন যিনি রাজস্বতে কাজ করছেন, তার বলবার কথা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া বন্ধ করাতে যদি কেউ প্রচেষ্টা করেন, তবে তিনি বাঁধা পান কোথা থেকে? তা না করে তিনি বলছেন তুই-তুমি-আপনির কথা… আজকে আমলাদের চেয়ার কেড়ে নেয়া হোক, কলিগরা নয়, রাস্তার লোকেই তুই-তোকারী করবে। তখন তিনি বলবেন, দেখেছেন কি অসভ্য, তুই করে বলছে!!!

        গাটস থাকলে সিনিয়র অফিসার পর্যন্ত আপনি করে কথা বলেন; সে আপনি যেই হোন না কেন। এইসব সম্মোধন পদের জন্য থেমে থাকে না। ম্যান্দামারা পুতু পুতু স্বামী হলে বউ পর্যন্ত লাথি মারে, তো কলিগ কোন ছাড়!

        আমার পরিবারে খুব কাছ থেকে পাঁচজন আমলা দেখেছি, এছাড়া দেখেছি অজস্র পরিচিত জনদের, সচিব থেকে শুরু করে ইউএনও পর্যন্ত… সব অকাজের, সব ফালতু।

        আমাদের ট্যাক্সের টাকায় চলা এইসব ফালতুদের নাকী কান্না শুনবার কোন প্রয়োজন আছে কি?

        আমি একজন সক্ষম কর্মজীবি বাংলাদেশী-কানাডিয়ান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণী পেয়ে পড়াশোনা শেষ করেছি। প্রিলিমিনারী পরীক্ষায় ভালো করা স্বত্তেও সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেইনি, কারণ ওই ফালতুদের দলে নিজেকে দেখতে চাইনি। হালাল রোজগার করে খাই, বাংলাদেশে ট্যাক্স দিয়েছি, সে টাকা যাকাত দেয়া উচিত ছিলো। এখন কানাডায় ট্যাক্স দেই, এবং আমি মনে করে এই ট্যাক্স তাদের ন্যায্য পাওনা।

  2. রণ: অনেক সুন্দর করে লিখেছো। দরকারি কথা লিখেছো। ক্ষোভের কথা লিখেছো। সবার ক্ষোভ সমান হয় না। ফলে সেই অংশ নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আলোচ্য কর্মকর্তা নীলাঞ্জনা একটি বিশেষ দিক তুলে ধরার জন্য ফোন দিয়েছিলেন। যে দিকটি তার কাছে খারাপ লাগে। এখানে লক্ষ্য করতে হবে তিনি কেন ফোন দিয়েছিলেন? প্রথমত, তিনি আমার আমলা সংক্রান্ত ভাবী কাহিনী পড়ে ফোন করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি একটি বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছেন।

    বিষয়টি হলো পরিবার থেকে তিনি যা শিখে আসছেন, যা আবার আমাদের এই দেশের সমাজের কালচার, বড়দের আপনি বলা; মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করা সেটার অনুপস্থিতি কিংবা সেটা থেকে ভিন্নতর কিছু দেখতে পেয়ে তার খারাপ লাগাটা তিনি জানাতে চেয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হয়েছেন কারণ দেশের মেধাবী মানুষ যারা সরকারি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা তাদের চর্চাগুলো কেমন সেটার কিন্তু প্রভাব সমাজে ও পরিবারে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি এই ধরনের বিষয়গুলো যে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক চর্চা সেকথাও উল্লেখ করেছেন।

    তিনি হয়তো আরো অনেক কথা বলতে পারতেন। কিন্তু সেটা না বলে তিনি আলোচনাটাকে ফোকাসড রেখেছেন। আমি তো মনে করি সেটা ঠিকই আছে।

  3. বুঝলাম। আমার ক্ষোভের প্রকাশটি যথাযথ হয়নি বলে লজ্জিত বোধ করছি।
    মানুষকে সম্মান করবার বিষয়টি আমাদের দেশে সবক্ষেত্রেই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং এর পেছনের কারণটি হলো পারিবারিক প্রভাব। একজন মানুষের টেম্পারমেন্ট/স্বভাব কেমন হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায় তার ৫-৮ বছর বয়েসের মধ্যেই। এরপর আর তা পরিবর্তন করা যায় না! কোমলমতি শিশু বলে বোধহয় এই কারণেই! এই শিশু অবস্থায়ই এই শিক্ষাগুলো দরকার… তবে কিভাবে সেটা হবে, তার কোন আশার আলো দেখছি না। বাবা-মা এর কাছ থেকেই শিশুরা ভন্ডামি, মিথ্যা বলা, লুকানো, মানুষকে অবজ্ঞা করা, ইত্যাদী শেখে। 😦

    • যেভাবেই হোক, তোমার কাছ থেকে কিছু ভালো কমেন্ট পাওয়া গিয়েছে। শিশুরা তো পরিবার থেকেই শিখবে। সেসঙ্গে শিখবে তাদের স্কুল আর বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। আর শিশুদের দায়িত্ব আমাদের সকলকে নিতে হবে।

  4. রণ ভাই, বিষয়টি কি আপনার কাছে সিরিয়াস মনে হয় না?

    কর্মক্ষেত্রে না হলেও বাস্তব জীবনে এই কমপ্লেক্সের ভুক্তভোগী আমি। জুনিয়র কেউ আমাকে সামাজিক অনুষ্ঠান বা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাকে “তুমি” সম্ভোধন করবে, এটা যেমন আমি মেনে নিতে পারি না তেমনি আমার বয়সী/ব্যাচের কেউ সিনিয়র কাউকে ”তুমি” সম্ভোধন করবে এটাও মেনে নেওয়ার মতো নয়।

    সজ্ঞানে আমার সিনিয়র কাউকে আমি কখনো তুমি সম্ভোধন করিনি। কিন্তু মিডল-ইস্ট বা ইউরোপের কোন এক গলি ঘুরে এসে খেয়ে দেয়ে গায়ে-পায়ে আমার আকৃতির চেয়ে বড় হয়ে গিয়ে আমার বয়সে/পড়াশুনায় জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আমার জুনিয়র কয়েকজনের কাছ থেকে আমি সময়ের ব্যবধানে আপনি থেকে ”তুমি” সম্ভোধন পেয়েছি! আমার কাছে এটা অপমানজনক।

    প্রাইমারী স্কুল ছেড়ে এসেছি ১৬/১৭ বছর আগে। সেই প্রাইমারী স্কুলের আমার খুব কাছের এক স্যার দেখা হলে এখনো আমাকে ”তুই” সম্ভোধন করে ডাকেন। এতে আমার কোন কষ্টতো লাগেই না, বরং ভালোলাগে। কারণ স্যার আমাকে “তুই” সম্ভোধন করেন স্নেহ করে। স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা শ্রদ্ধা-স্নেহের। কিন্তু স্যারের বষয়সী যদি কেউ আমাকে শুধু বয়সের সিনিয়রিটির কারণে আমাকে প্রথম সাক্ষাতে ”তুই” সম্ভোধন করেন তাহলে নিশ্চয়ই আমি সেটা মেনে নেব না। আর এটা সবার বেলায়-ই স্বাভাবিক ব্যাপার।

    কর্মক্ষেত্রে কলিগদের সাথে কথোপকথনে ”আপনি” সম্ভোধনই এতোদিন সিদ্ধ বলে জানতাম। এখন অন্যকথাও শুনছি।

    • সুমন… ছোটভাই হিসেবে একটা কথা কই, কিছু মনে নিও না, তুমি করেই বলি… এই আপনি-তুমি-তুই বলে কে কি ডাকলো সেটা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কোন প্রয়োজন দেখি না। তোমাকে যা ডাকার কথা, আপনি/তুমি/তুই, সেটি হিসেব কইরা ডাকার দায়িত্ব যে ডাকে, তার। তোমার না। অন্যের সীমাবদ্ধতা নিয়ে মাথা গরম করলে সেটা তোমার নিজের সীমাবদ্ধতাই হয়ে যাবে। ঐ শালাদের সমস্যা ওদের কান্ধেই থাকুক… যদি অপমান করার জন্য ইচ্ছা করে বলে, তাহলে মনে রাখবা কারা… দিন আল্লাহ সবাইরে দ্যান, তোমারেও দিবেন, সেই দিন চান্সমতো পাইলে খাড়ার উপ্রে বাড়ি দিয়া ফালায়া দিবা, সেই আওকাত তৈরিতে মন দাও।

      (আর স্যারের বয়েসী কেউ যদি তুই করে ডাকে কোন পরিচয় ছাড়াই, তাহলে বুড়া মানুষের বুদ্ধিলোপ পাইছে মনে কইরা মাফ কইরা দাও, স্বয়ং আল্লাহর নাম রহমানুর রাহীম। আর যদি মাফ না করতে চাও, তাইলে বিদ্যাসাগর ডোজ দিয়া দাও, বুড়া শিক্ষিত হইয়া যাইবো)

  5. অফটপিক একটি বিষয় নিয়ে বলতে চাচ্ছি-
    এক পর্যায়ে লেখাটিতে এসেছে, আমলাদের বদলীর কথা। আমার কিছু কথা আছে এই বিষয়ে। ধরা যাক আজকে একজনকে ধর্ম মন্ত্রনালয়ে আমলা করা হলো, সে এই বিষয়ে কিছু নীতিমালা ঠিক করছে এই সময়ে তাকে বদলী করা হলো আইসিটি মন্ত্রনালয়ে। তাহলে ঐ ধর্ম বিষয়ক নীতিমালার কি হবে, আবার একজন ব্যক্তির সব বিষয়ে জ্ঞান থাকবে এমন কথা নেই। ধরা যাক কারও ধর্ম বিষয়ক জ্ঞান আছে তাই সে ধর্ম বিষয়ক নীতিমালা তৈরি করছে। এখন তাকে যদি আইসিটি মন্ত্রনালয়ে আনা হয় তখন কি সে আইসিটি বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করবে? আমলারা এই বিষয়গুলো কিভাবে দেখেন? আসলে আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের সচিবালয়ে কি বিষয় ভিত্তিক বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পান? অর্থাৎ যিনি চারবছর মৎস নিয়ে অনার্স মাস্টার্স করে বিসিএস দিয়ে আমলা হলো সেই কি মৎস বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পায় বা দায়িত্ব দেওয়া হয়, নাকি সেখানে দায়িত্ব পায় পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করা কেউ?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s