যুবদের সুস্থ যৌনজীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন অটোমেটিক নিশ্চিত করা সম্ভব


কৈফিয়ত: নতুন ধরনের এই লেখাগুলো আমার চেয়ে কম বয়সীদের উদ্দেশ্যে, সেকারণে আপনি নয় তুমি বলা হয়েছে। তাই বলে বড়দের পড়তে মানা নেই।

বাংলাদেশের যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশী নাগরিক ‘যুব’।

দেশের সকল যুব বয়সী আমার ছোট। এই লেখা তাদের জন্য। আশা করি তাদেরকে সঙ্গে পাব।

যৌন শব্দটা আমাদের দেশে একসময় খুবই গোপন একটা শব্দ ছিল। এখনকার প্রজন্মের কথাবার্তায় ‘সেক্স’, ‘সেক্সি’ খুব কমন একটা শব্দ। দু’টি ধারাই আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগে। যদিও আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হলো প্রান্তিকতার। সেই বিচারে গোপনীয়তা নিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা খোলামেলা হওয়া নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের খোলামেলা হওয়াটাই স্বাভাবিক মনে হতে পারত। কেউ কেউ আমাকে বলেন, এই দেশে যৌন জীবনের চর্চা কতো মধুর সেটা নাকি বোঝা যায় ১৬ কোটি মানুষের সংখ্যা থেকে। আমি তাদের সেই কৌতুকে যোগ দিতে পারি না।

আমাদের দেশে যে ধর্ষণ কিংবা ঈভ টিজিং সেটাও কিছুটা অবদমিত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বাকিটা ‘সেক্স’ আর ‘সেক্সি’ মানসিকতার প্রকাশ। দুটোই অসুস্থতা। মানসিক অসুস্থতা। এর চিকিৎসা দরকার। যেহেতু যৌন জীবনের অনেক কিছুই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাবিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিয়ন্ত্রিত সেকারণে যুববয়সীদের জন্য একটি ‍সুস্থ যৌন জীবনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে সরকারের দিক থেকে ভূমিকা পালনের দরকার রয়েছে। আমার এই মতামতের সঙ্গে সরকার যে খুব দ্বিমত পোষণ করে তা নয়। যেকারণে আমি লক্ষ্য করি যে সরকারের একটি মন্ত্রণালয় হলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। আমি এই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (http://www.moysports.gov.bd/) ঘুরে দেখলাম যুববয়সীদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের দিক থেকে কিছু কর্মকান্ড হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সরকারের কর্মকান্ডের গতি আমাদের দেশের যুব বয়সীদের চিন্তাচেতনা বিকাশের গতির তুলনায় নেহায়েত কচ্ছপ গতি বলা যায়। এর একটি কারণ হতে পারে অচল চিন্তার মানুষদের দিয়ে যুব মন্ত্রণালয় পরিচালনা করা। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখলাম যে, জাতীয় যুবনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে ২০০৩ সালে।

নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত যুব নীতিতে স্বীকার করা হয়েছে- ‘যুবসমাজ সব সময়ই যে কোন দেশের সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল ও উৎপাদনক্ষম চালিকাশক্তি। জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন প্রকৃতপক্ষে যুবদের মাধ্যমেই দেখানো সম্ভব।’ কিন্তু একটি বলিষ্ঠ, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল ও উৎপাদনক্ষম যুব সমাজ তৈরিতে করণীয় সম্পর্কে এই নীতি সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়নি। মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, নৈতিকতার মতো ভারী ভারী শব্দ দিয়ে পাতা ভরা হয়েছে। যুবসমাজ নিশ্চয়ই নীতির পাতা চিবিয়ে খেয়ে বলিষ্ঠ, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল ও উৎপাদনক্ষম হবে না।

নীতিতে ৩য় অধ্যায়ে যুব সমস্যা শিরোণামে লেখা হয়েছে- ‘যুব সমস্যা চিহ্নিতকরণের জন্য বর্তমানে বিরাজমান নৈতিক শিক্ষা ও শৃঙ্খলার অভাব, দেশে বাস্তবমুখী শিক্ষার অপ্রতুলতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ না করা (ড্রপআউট), শ্রম বিমুখতা, বিভিন্নমুখী বেকারত্ব, এইডস ও মাদকাসক্তিসহ অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যকলাপে যুবদের সংশ্লিষ্টতা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-তথ্য সম্পর্কিত অজ্ঞতা, আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও ঋণ সাহায্যের অপ্রতুলতা, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব, তথ্য প্রযুক্তিতে অদক্ষতা, খেলাধুলা, সুস্থ বিনোদনের অনুকূল পরিবেশের অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাব, মূল্যবোবেধর অবক্ষয় ইত্যাদির প্রতি সমধিক গুরুত্বারোপ করা দরকার। যুবদের জন্য উন্নয়নমূলক যে কোন উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে যুব সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান সমস্যাদি চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ জন্য যুবদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।’

বুঝতে অসুবিধা হয় না ১৯৭২ সাল থেকে এই নীতি প্রণয়ন পর্যন্ত যারা দেশ চালিয়েছেন তারা যুবসমাজের জন্য হাজারো সমস্যার বীজ রোপন করেছেন ফলে সেইসব সমস্যা বটগাছ হয়েছে। সরকার স্বীকার করছেন যে, দেশে ভালো কিছু হয়নি। নতুবা কেন সরকার নীতিতে ভালো কথা লিখতে পারেনি। নীতি প্রণয়নের পর প্রায় ১০ বছর পার হতে চলল, সরকার নীতি আপগ্রেড করেছে কিনা সেটা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় না। কাগজপত্র আপগ্রেড করলেও কোন লাভ নেই। আমরা যারা এই সমাজে বাস করি আমরা তো দেখতে পাই দিনে দিনে অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে।

যুববয়সীদের হাতে নানান অস্ত্র। চিন্তায় দুর্নীতি। মুখে মাদক। উচ্ছৃঙ্খলতা তাদের যেন পরিচ্ছদ। সামগ্রিকভাবে তারা ক্রমশ যেন পিছিয়ে যাচ্ছে। হানাহানি আর মারামারি নিত্য নৈমত্তিক বিষয় হয়ে যাচ্ছে। অন্যের মতের প্রতি অশ্র্রদ্ধা দেখানো তাদের কাছে এখন প্রার্থনাসম। অন্যকে হেয় করাতেই তাদের আনন্দ। এমন এক ধরনের অস্থিরতায় জীবন যাপন করলে তো সুস্থ যৌন জীবন হতে পারে না। বেকারত্ব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। যুব বয়সীরা বিয়ে করে সংসার করতে সাহস পাচ্ছে না। আর বিয়ে ছাড়া সুস্থ যৌন জীবনের দ্বিতীয় কোন পথ সমাজ স্বীকৃত নয়।

কিন্তু যুব বয়সীদের যৌন চাহিদা তো বন্ধ নেই। সেটা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। বিজ্ঞান বলে, প্রাপ্ত বয়সীদের যৌন আকাঙ্ক্ষা খিদের মতোই স্বাভাবিক বিষয়। খিদে যেমন ধনী-গরিব বাছবিচার করে না। যৌন আকাঙ্ক্ষাও তাই। খিদের মতোই একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মনে যৌন চাহিদা তৈরি হয়। এটা তিনবেলা খাওয়ার বিষয় নয় কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অভুক্ত থাকার মতো বিষয়ও নয়। তাছাড়া, মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্যও যৌন জীবনের গুরুত্ব রয়েছে। এবং সেটি অবশ্যই স্বাভাবিক ও সুস্থ যৌন জীবন হতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো যুব বয়সীরা কিভাবে স্বাভাবিক ও সুস্থ যৌন জীবন পেতে পারে? উপযুক্ত বয়সে একটি ছেলে ও মেয়ে বিয়ে করতে পারবে, নিজেদের সংসার শুরু করতে পারবে এমন একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমেই কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার প্রাথমিক দায়িত্ব কার?

নিশ্চিতভাবে সেটি রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের। স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামাত, আওয়ামী লীগ-চৌদ্দ দল মিলে যেভাবে দেশ চালালো সেখানে যুব বয়সীদের জন্য একটি ‍সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গঠনের চিন্তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং যুবসমাজকে ধ্বংস করার সকল ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ছিলো সেটা বোঝা যায় সরকারি ডকুমেন্টে দেশের যুববয়সীদের চিত্র থেকে।

আমরা যদি যুব বয়সীদের আগামী বাংলাদেশের প্রাণ ও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মেনে নিতে পারি তাহলে কেন তাদের জন্য এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবতে পারছি না যেখানে তারা সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করবে। তারা কারো বোন কারো মা-কে ধর্ষণে লিপ্ত হবে না। তারা প্রেমের প্রতারণার জাল বিস্তার করে নিজেদের যৌনকামনা চরিতার্থ করবে না। তারা দলবেধে নারী ধর্ষণ করবে না। যৌনতা উপভোগ আর হাত খরচ জোগাড় করতে তৎপর হবে না। তারা রাস্তাঘাটে মেয়েদেরকে উত্যক্ত করবে না। যৌন পল্লীতে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের আসর বসাবে না। বরং তারা পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব, পাঠাগার গড়ে তুলবে। দেশের সব চাষযোগ্য পুকুরে মাছ চাষ করবে। আধুনিক বীজ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াবে। পর্যটন শিল্পে যোগ দেবে। বিদেশে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। এমন আরো অনেক কিছু তারা করবে। ফলে তারা নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে করে সংসার করবে। তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে। দেশ এগিয়ে যাবে।

কোন এক জায়গা থেকে শুরু করতে হবে। সুস্থ যৌন জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা থেকেও কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়া যায়। আর সেখানে যুব বয়সীদেরই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নষ্ট পচা নেতৃত্ব দিয়ে সুন্দর সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে সম্ভব নয়। তাদের নেতৃত্বে যে সম্ভব নয় নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে করে একটি সুস্থ যৌনজীবন যাপনের, তা কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে?

আমি যুব সমাজকে বলব তোমরা প্রস্তুত হও। নিজেদের ভবিষ্যৎ তোমাদেরকে নিজেদেরকেই গড়তে হবে। এগিয়ে আসো। যা করার তোমাদেরকেই করতে হবে। তোমাদের সুস্থ যৌনজীবন যাপনের অধিকার তোমাদেরকেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

Advertisements

3 thoughts on “যুবদের সুস্থ যৌনজীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন অটোমেটিক নিশ্চিত করা সম্ভব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s