শেখ সাহেব থেকে শেখের বেটি


‘কোন কোন দিন মনে হইত না খাইয়া মারা যামু।’ লোকটা একটু থামল। প্রশ্ন করতে গিয়েও করলাম না। অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছে। তাছাড়া রাস্তায় গাড়ির চাপও বেড়েছে। গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভারের সঙ্গে বেশি কথা না বলাই ভালো। সাতাশ নম্বরের সিগনাল পার হয়েই আবারো জ্যামে আটকাল গাড়ি। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, ‘জানেন, কচু শাক দিয়া ভাত খাইতাম। লবণও ছিলো না। বাড়ির কাছে আছিল সমুদ্র। সমুদ্রের পানি শুকিয়ে লবণ করতাম।’

‘আপনি কতোদিন আগের কথা বলছেন?’

‘চুয়াত্তর সালের কথা। শেখ সাহেব তখন ক্ষমতায়। দেশের মানুষের হাতে ট্যাকা পয়সা নাই। আমাগো জমি আছিল। কিন্তু জমি কেনার মতো লোক আছিল না। পেটের খিদায় বাড়ি ছাড়লাম। আমরা সবাই পটুয়াখালী গ্যালাম। ওইহানে গিয়া মাইনসের বাসায় কাম নিলাম। কোনরকমে খাওয়া দিতো। এমনেই দিন পার করছি। এরপর একদিন কামের খোজে নারায়ণগঞ্জ আইলাম। ট্রাকের হেলপারির কাম পাইলাম।’

‘কবের কথা?’

‘বিরাশি সাল হইব। এরশাদ সাহেব তখন ক্ষমতায়।’

‘তারপর?’

‘এরপর ট্রাকের ড্রাইভার হইলাম।’

‘ড্রাইভারি শিখলেন কোথায়?’

‘ওস্তাদের কাছে। ওস্তাদ যখন চালাইতো দেখতাম। গাড়ি ধুইয়া মুইছা রাহনের পর ওস্তাদ দূরে গেলে স্ট্যার্ট দিতাম। গাড়ি চালাইতে শেখার পরও ওস্তাদ দুইবছর চালাইতে দেয় নাই। গাড়ি পুরাপুরি চালাইতে শুরু করছি ৯৫ সালের দিকে।’

‘আপনার গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছিলো?’

‘লাইসেন্স করছি আরো অনেক বছর পর। ২০০১ সালে। হেই লাইসেন্স ২০১০ সালে আইয়া বাতিল হইয়া গেলো। সরকারি খাতায় নাকি নাম নাই। এরপর পরীক্ষা দিয়া আবারো লাইসেন্স লইছি। এহন হেইডা দিয়াই চালাই।’

‘ট্রাক চালানো ছাড়লেন কবে?’

‘ছয় বছর আগে।’

‘কেন?’

‘রাইত জাইগা গাড়ি চালাইতে হয়। পয়সাও কম। হের লাইগা ছাইড়া দিলাম।’

‘কতো পেতেন?’

‘ট্রাকের পয়সা তো ট্রিপের উপরে। ট্রাক যতো ট্যাকায় ভাড়া হইতো। আমি পাইতাম ২০ পারসেন্ট।’

‘কতো ভাড়া হইতো?’

‘তার কি কোন ঠিক ছিল? কোন রাইতে দুইডা ট্রিপ পাইতাম। কোন রাইতে একটা।’

‘কতো টাকার ট্রিপ?’

‘ঠিক নাই। এক দেড় হাজার টাকা। পোষাইতো না।’

‘আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?’

‘তিন মেয়ে এক ছেলে।’

‘কে কি করছে?’

‘দুই মেয়ের বিয়া দিয়েছি। এক মেয়ে ছোট।’

‘ছেলে?’

‘ছেলের পরে মেয়েটা।’

‘ট্রাক চালাইয়া তো পোষাইতো না। ট্যাক্সি ক্যাবে কি পোষায়?’

‘আগের চেয়ে বেশি পাই।’

‘জমা কতো?’

‘৮০০ টাকা।’

‘আপনার থাকে কতো?’

‘ঠিক নাই। ৬০০-৭০০।’

‘তাইলে তো মাসে ২০-২১ হাজার টাকা থাকে।’

‘তা থাকে না। একদিন পর একদিন গাড়ি পাই।’

‘তাইলে থাকে মাসে সাড়ে দশ এগারো হাজার টাকা।’

‘ওই রকমই।’

‘বাসা ভাড়া কতো দেন?’

‘বাসা ভাড়া ৪০০০ টাকা।’

‘দিনে তো প্রায় দুইশ টাকার কাঁচা বাজার লাগে।’

‘তা লাগে।’

‘তাইলে তো আপনার কিছুই জমে না।’

‘তা জমে না। তয় এহন মাছ-মাংস খাইতে পারি। শেখ সাহেবের চাইতে শেখের বেটির আমলে ভালো আছি।’

‘আপনাকে কি একটা ব্যক্তিগত গোপনীয় প্রশ্ন করতে পারি? আপনি প্রশ্নটা করার পর উত্তর দিতে না চাইলে দেবেন না।’

‘করেন।’

‘আপনি কি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন?’

‘আমি নারায়ণগঞ্জের ভোটার। কবরীরে ভোট দিয়েছি। তয় আমি এরশাদের জাতীয় পার্টিরে পছন্দ করি। ২০০১ সালে এরশাদরে ভোট দিয়েছি। হেয় জিততে পারেনি। এইবার কবরীরে ভোট দিয়েছি।’

‘আপনার মেয়ের জামাইরা কে কি করেন?’

‘বড় মাইয়ার বিয়া দিছি ড্রাইভারের সঙ্গে। উনি দশ চাকার গাড়ি চালান। ছোড মাইয়ারে বাড়িতে বিয়া দিছি।’

‘গ্রামের বাড়িতে?’

‘হ।’

‘সেখানে কে আছে?’

‘আমার মা আছে।’

‘বাবা নেই?’

‘না। মারা গেছেন।’

‘জমি জমা আছে?’

‘আড়াই বিঘার মতো জমি আছে।’

‘বসত বাড়ি?’

‘আছে।’

‘ওখানে আপনার মা থাকে?’

‘হ।’

‘মাকে কে দেখাশোনা করে?’

‘আশপাশে আত্মীয় স্বজনরা থাহে। আমি দুয়েকমাস পর পর যাইয়া বাজার সদাই কইরা দিয়া আই।’

‘আপনার জমিতে তো ধান হয়।’

‘হ। জমির ধানে খোরাকি হয়।’

‘জমি চাষ করে কে? বর্গা দিছেন?’

‘না। লোক লাগাইয়া চাষ করাই।’

‘এই বছর কতো ধান পাইছেন?’

‘আটত্রিশ মন।’

‘ধানের মন কতো এখন?’

‘ধানের দাম এইবছর কম। ৫৬০ টাকা।’

‘জমি চাষ করতে কতো খরচ হইলো?’

‘চাষ করা। ধান কাটা পর্যন্ত প্রায় পনর হাজার টাকার মতো খরচ হইয়া গ্যাছে।’

‘তাইলে তো আপনার হাতে তেমন টাকা রইলো না।’

‘ধান চাষের খরচ বাড়ছে। শেখের বেটি কৃষকের দিকে তাকায় না।’

‘কিভাবে তাকাবে?’

‘ধানের দাম না পাইলে মানুষ তো আর ধান চাষ করবো না। তখন আপনেরা খাইবেন কি?’

‘তা তো বুঝলাম। ধান চাষ করা না হলে আমরা বিপদে পড়মু। কিন্তু সরকার কি করবো?’

‘সরকার ভর্তুকি দিব।’

‘আপনি ভর্তুকি বুঝেন?’

‘বুঝমু না ক্যান? কৃষকের ধান সরকারকে বেশি দাম দিয়া কিনতে হইবো। তারপর কমদামে সরকার জনগণের কাছে বেচব। তাতে কৃষকও বাচব জনগণও বাচব।’

‘এই কথা কি আপনার কথা? নাকি কারো কাছে শুনছেন?’

‘কারো কাছে শুনতে হইবো ক্যান। আমি বুঝি না?’

‘বুঝবেন না ক্যান। অবশ্যই বুঝবেন। আপনি খুব ভালো সমাধান দিয়েছেন। কিন্তু সরকার কৃষকের কাছ থেকে বেশি দাম দিয়া কিনতে চাইলেই কি কৃষক টাকা পাবে?’

‘হেইডাও বুঝি। এমপি মন্ত্রীরা হেই টাকা মাইরা খাইবো। দেশের তো এইডাই বড় সমস্যা।’

পল্লবীতে আসতে আসতে আরো বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কথা হলো। নামার সময় বলল, ‘আপনি আমারে ছোট বেলার কথা মনে কইরা দিলেন। আমনের লগে আলাপ কইরা খুব আরাম পাইছি। ভালো লাগছে আমনেরে আমার।’

‘আমারও ভালো লেগেছে আপনার কথা শুনে। ভালো থাকবেন।’

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে বাড়লে ভালো হতো!

Advertisements

6 thoughts on “শেখ সাহেব থেকে শেখের বেটি

    • দিলরুবা আপা, মানুষের জীবন সম্পর্কে, ভাবনা সম্পর্কে জানার ইচ্ছে থেকেই আলাপ। ড্রাইভার সাহেবকে আমার বেশ বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ মনে হয়েছে। তার সঙ্গে আমার আরো অনেক কথা হয়েছিল। এই যেমন, তার মা মারা যাওয়ার পর তাকে জমি রক্ষা করতে বাড়ি যেতে হবে। ছোট মেয়েটার একটা ভালো বিয়ে দিতে হবে। ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s