বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের রোল মডেল কে হবেন জহুরুল ইসলাম, আজাদ নাকি অন্য কেউ?


বাংলাদেশে হাউজিং ব্যবসার কল্পনাও যখন কেউ করেনি প্রয়াত জহুরুল ইসলাম সেসময়ে হাউজিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ফুটপাথের হকার আজাদের সহকর্মীরা ভাবতে পারেনি আজাদ একদিন আজাদ প্রোডাক্টের মালিক হবেন। আজাদ কিন্তু ভাবতে পেরেছিলেন। জহুরুল ইসলাম এবং আজাদ দু’জনেই সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ। দু’জনই সফল উদ্যোক্তা। যারা উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছুক তাদের জন্য এমন আরো অনেক উদাহরণ বাংলাদেশে আছে। উদাহরণ খুঁজতে যারা বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং ওই রকম পরিবেশ নাই বলে হা-হুতাশ করেন তাদের জন্য আমাদের দেশের উদাহরণগুলো বেশি বেশি প্রচার হওয়া দরকার। কারণ তারা দু’জনেই দেখিয়ে দিয়েছেন অনেক কিছু যেমন, কোম্পানি বানানোই শেষ কথা নয়। তারা এমন আরো অনেক সমস্যার মোকাবেলা করেছেন, যা এখনো বাংলাদেশের সমাজে বিদ্যমান। নিচে কিছু বিষয় আলোচনা করা হলো। যা তারা পেরেছেন সেটা আজকের যুবদের না পারার কোন কারণ থাকতে পারে না।

অনেকের ধারণা থাকে কোম্পানি বানালেই বোধহয় উদ্যোক্তা হওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে এভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কোম্পানি বানানোর চেয়েও বেশি দরকার কোম্পানিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা। আমাদের দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পুঁজি। নিশ্চিত লাভের নিশ্চয়তা ছাড়া পুঁজি পাওয়া বেশ কঠিন। আর নিশ্চিত লাভের নিশ্চয়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া বেশিরভাগ সময় সম্ভব নয়। প্রতিটি নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে তথাকথিত ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটা মেনে নিতে না পারলে আর যাই হোক উদ্যোক্তা হওয়া যায় না।

তারপর কেউ যখন উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে তখন পরিবারের ভেতর থেকে বাধা আসে। পরিবারের গুরুজনেরা চাকরি করাকে বেশি প্রাধান্য দেন। এই চিন্তাটা ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। ফলে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেওয়া দরকার সেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না। মধ্যবিত্তদের মধ্যে এই ভাবনার প্রাবল্য বেশি। তারা মনে করে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে চাকরি করবে। চাকরি করার ক্ষেত্রে তারা আবার সরকারি চাকরিকে বেশি গুরুত্ব দেন। অনেকে উচ্চ বেতনের জন্য করপোরেট সেক্টরের চাকরিতে আগ্রহ দেখান। এর ফলে, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। তারপরও ইদানীংকালে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে না গিয়ে নিজে থেকে একটা কিছু করার চেষ্টা করছে। মানে উদ্যোক্তা হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষাট সত্তরের দশকে উদ্যোক্তা হওয়াটাকে মধ্যবিত্ত সমাজ নেতিবাচক হিসেবে দেখত। এখন যেমন মধ্যবিত্ত সমাজ রাজনীতি করাকে খারাপ চোখে দেখে। এখন উদ্যোক্তা হওয়াকে মধ্যবিত্ত সমাজ আগের মতো নেতিবাচক হিসেবে দেখে না। তারপরও আমাদের সমাজে একজন উদ্যোক্তাকে কতগুলো সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। যেমন, বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নির্ভরতা অনেক সময় একজন উদ্যোক্তার পথ চলাকে ধীর করে দেয়। কখনো কখনো বাধাগ্রস্ত করে। পরিবারের সদস্যদের নির্ভরতার কারণে উদ্যোক্তার দুই ধরনের সম্পৃক্ততা তৈরি হতে পারে। আর্থিক ও সময়। একটা হতে পারে। দুটোও হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সামাজিক চাপও তৈরি হয়। উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে একটা ভালো চাকরি জোগাড় করাটা তখন সামনে চলে আসতে পারে। এমনিতে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্যোক্তা তৈরির উপযোগী নয়। বরং চাকরির বাজারে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর উপযোগী।

আগেই বলেছি সামাজিকভাবেও উদ্যোক্তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কম। কেউ কেউ মনে করেন উদ্যোক্তা হবেন ‘সম্মানজনক’ চাকরি জীবনের শেষে। বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা সেকারণে সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদে চাকরি করার পর উদ্যোক্তা হয়েছেন কিংবা সচিব হিসেবে কাজ করার শেষে উদ্যোক্তা হয়েছেন। আবার অনেক যুব উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে তার কোম্পানিতে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা কিংবা সরকারি কর্মকর্তাকে উচ্চ বেতনে চাকরি দিচ্ছেন। এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা। আমাদের বোধহয় সময় হয়েছে এই ধরনের মাইন্ডসেট বা পূর্বচিন্তা থেকে বের হয়ে আসার।

সবশেষে বলব, হে যুব! তোমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর বাংলাদেশ। তুমিই পারবে।

Advertisements

One thought on “বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের রোল মডেল কে হবেন জহুরুল ইসলাম, আজাদ নাকি অন্য কেউ?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s