প্রতিদিন ধর্ষণ ৯টি এবং নারী নির্যাতন ৩৭টি


আর মাত্র এক ঘণ্টা তারপর ফুরিয়ে যাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আবার অপেক্ষায় থাকবে নারীবাদীরা পরের বছরের জন্য। বক্তৃতা রেডি করবে। শাড়ি পোশাক তৈরি করবে। পারফিউম বাছাই করবে। তারপর এবছরের মতো পত্রিকার গোল টেবিলে যোগ দেবে কিংবা কোন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো’তে অংশ নেবে। কেউবা পদযাত্রায় অংশ নেবে। তবে আগামী বছর বোধকরি শাহবাগ আন্দোলন থাকবে না। ফলে আগামী বছর নারীবাদীরা শাহবাগ মিস করবে।

দুই.

নারীবাদীরা আমার কাছে বেশ রহস্যময়। তারা কোনটাকে নারীর অগ্রগতি বলেন আর কোনটাকে অধোগতি মাঝে মাঝে সেটা বোঝা বেশ দুস্কর হয়ে পড়ে। এমনও দেখা যায় যে, নারীবাদী নেতারা যে যেই মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ পান কিংবা যে মিডিয়া তাদের সভা সেমিনারের খবর প্রচার করে সেই মিডিয়ার ব্যাপারে তারা বেশ ছাড় দেন। ফলে ওই মিডিয়াগুলো যখন তাদের নারীবাদী চিন্তাচেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় তারা দেখেও না দেখার ভান করেন। করপোরেটদের কারো কারো বেলায়ও তারা ছাড় দেন। এজন্য অবশ্য তাদেরকে দোষ দেওয়া যাবে না। তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয় আর সেই সব আয়োজনের জন্য খরচাপাতি লাগে। ফলে যে করপোরেট হাউজগুলো তাদেরকে স্পন্সর করে সেই করপোরেট হাউজগুলোতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কিংবা অবমাননার ঘটনা ঘটলেও তারা চুপ করে থাকেন। ফলে নারীবাদীদের সোচ্চার হওয়া না হওয়াটা অনেকসময় নীতি নৈতিকতা নয় বরং লোকদেখানো বিষয়ে পরিণত হয়।

তিন.

নারী রাজনীতিকদের অবস্থান নারীদের পক্ষে না বিপক্ষে সেটা বোঝাও আমার কাছে মাঝে মাঝে বেশ কঠিন মনে হয়। কারণ ১৯৯১ সাল থেকে মোটামুটিভাবে দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব নারীদের হাতে ছিল। হয় হাসিনা নতুবা খালেদা। এবার তো হাসিনার মন্ত্রীসভায় শুরুতে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, শ্রম সবকিছুতেই নারীরা ছিল। কিন্তু তাতে দেশের নারী সমাজের বিড়ম্বনা কমেছে সেকথা বলা যাবে না। বরং সম্প্রতি সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নারী ধর্ষণ বেড়েছে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৫০ হাজার ৬৯৯টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে ১২ হাজার ৭৫০ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এটি আগের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। অভিযোগ আছে যে, সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও এই ধরনের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিল। উভয়ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে অপরাধপ্রবণ সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অপরাধে জড়াতে উৎসাহিত হয়েছে।

চার.

আজকে সারাদেশে মহা সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে। টেলিভিশনে দেখলাম দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক সভা সেমিনার হয়েছে। পত্রিকাতে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন পত্রিকায় গোল টেবিল বৈঠকের পৃষ্ঠাজুড়ে আলাপ আলোচনা ছাপা হয়েছে। প্রজন্ম চত্বরও বাদ যায়নি। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্টদের অনেকে দাবী করেন প্রজন্ম চত্বরের পালস যারা বুঝতে পারবে না তারা আগামী দিনের নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়বে। কিন্তু প্রজন্ম চত্বরের বক্তৃতায় নারী নির্যাতনের বর্তমান চিত্র উঠে আসেনি। সেখানে ছিলো না ভবিষ্যতের কথা।  সংসদের তথ্য থেকে জানা যায় নারী নির্যাতনের ঘটনায়  গত বছর মাত্র ৯০০ জনের সাজা হয়েছে। আমরা সারাবছর ধরে দেখেছি কতো নারী অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। আজকে নারীবাদীরা টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে বক্তৃতায় সেইসব নারীদের পক্ষে কথা বলেননি। কথা বলেননি সেই সব নারীদের বিচার না পাওয়া নিয়ে। এতো বড় নারী সমাবেশ কিন্তু সেই সমাবেশ থেকে ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের জন্য কোন প্রতিকারের কথা শোনা যায়নি। যে দেশে সরকারি হিসেবে প্রতিদিন ৯টি নারী ধর্ষিত হয়, নির্যাতনের শিকার হয় ৩৭ জন সেই চিত্র যারা তুলে ধরতে পারেন না তাদের পালস বুঝে কি উপকার হবে দেশের প্রায় সাড়ে আট কোটি নারীর? মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে কাজ করে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। এই সাধারণ কথাটি যারা বুঝতে পারে না তারা আর যাই হোক দেশ ও দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কোন কাজ করছে সেটি ভাবার কোন সুযোগ আছে কি?

পাঁচ.

জাতীয় সংসদের পরিসংখ্যান বলে দেয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিছকই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। একদিকে দিবস পালন। অন্যদিকে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিচার ব্যবস্থার নিস্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করে চলেছে। যে দেশ সমাজ ও সরকার তাদের দেশের নারীদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ তাদের কোন সাফল্য থাকতে পারে না। কারণ নারী হলো মায়ের জাতি। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে কিনা নারী ছাড়া দুনিয়াতে আসতে পেরেছেন।

ছয়.

এভাবেই শেষ হলো আরেকটি গতানুগতিক আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s