অসভ্যতা


একটা ভবিষ্যৎ বিষয় নিয়ে দেশে এখন খুব আলোচনা হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামীর ১৩ দফা আলোচনার কেন্দ্রে। সরকারিভাবে বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার সব বন্ধ করে দেওয়ার পরও হেফাজতে ইসলামীর ঢাকা অবরোধের গণজাগরণে রাজনীতিতে বিষ্ময় তৈরি হয়েছে। অতীতে এই ধরনের সমাবেশ করতে গিয়ে দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল হেফাজতে ইসলামীর গণমানুষের সম্পৃক্ততার বিচারে চরমভাবে ব্যর্থ কেন হয়েছিল আর কেন অরাজনৈতিক দল হেফাজত ইসলাম সাফল্য পেল সেটা নিয়ে অনেক ধরনের বিচার বিশ্লেষণ ফাঁকে বড় হয়ে উঠেছে হেফাজতে ইসলামীর দেওয়া ১৩ দফা দাবী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গণজাগরণের চেয়েও হেফাজতে ইসলামের গণজাগরণ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েক গুণ বড় কেন হচ্ছে সেনিয়ে আলাপ আলোচনা ও মিডিয়া কাভারেজের মাধ্যমে দেশে নতুন করে বিভক্তি রেখা টানা হচ্ছে। যা দরকার ছিলো না তা করাটাই যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। থমাস আলভা এডিসন বলেছিলেন, ‘I find out what the world needs then I proceed to invent it.’। আমাদের দেশের দায়িত্বশীল মানুষরা এর উল্টোটা করতেই বেশি আনন্দ পায়। যা অসভ্যতা।

খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের দেশে অতীত ও ভবিষ্যৎ আলোচনা সবসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সবসময় খুব উপেক্ষিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এমনটা চলে আসছে কিনা জানি না। তবে ১৯৯৩/৯৪ সাল থেকে তেমনটাই দেখে আসছি।  অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ করার জন্য বর্তমানে কাজ করার কোন সুস্থ লক্ষণ আমরা দেখতে পাই না। বরং অতীতের কচকচানি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা করে এক ধরনের শত্রু শত্রু খেলায় বর্তমানকে বিসর্জন দিতেই আমাদের যতো চেষ্টা। অতীত ও ভবিষ্যতের বর্তমানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বড় ধরনের অসভ্যতা মনে হয়। রাষ্ট্রীয় জীবনের এই ধরনের অসভ্যতার উদাহরণ অন্য কোথাও আছে কিনা জানি না।

আমাদের আরেকটি অসভ্যতা হলো কার্যকারণ অনুসন্ধান না করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা খালি চোখে যা দেখা যায় সেটাকে ধরে নিয়েই বিচার করতে বসে যাই। সেই ঘটনা নিয়েই আমরা তোলপাড় করে ফেলি সবকিছু। ঘটনাটি কেন ঘটল এবং ঘটনাটি যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে সেনিয়ে আমাদের তৎপরতা থাকে না।

আমাদের জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে গ্রামের রাজনীতিতে পর্যন্ত উস্কানি একটি নিত্য ব্যবহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যকে উত্তেজিত ও খোচাখুচি করার মধ্যে জাতীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত বিমল আনন্দ পায়। টেলিভিশনে মুখোমুখি বসে দু’জন মানুষ ঝগড়া করছে এমন অনুষ্ঠান এই দেশের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের টেলিভিশনের টক শো জাতীয় অনুষ্ঠানের অন্যতম পথিকৃত তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানটি দর্শক জরিপে দীর্ঘকাল ধরে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের দুই বক্তার মাঝে উপস্থাপক বসে থাকেন আর তারা দু’জন যতোটা সম্ভব বাকযুদ্ধ করেন, অবস্থা অনেকসময় এমনও হয় যে মাঝে উপস্থাপক না থাকলে তারা হয়তো হাতাহাতি করতেন। ঝগড়াঝাটি ও কলহ একটি দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়াটা অসভ্যতা নয় কি?

লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে যেভাবে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকগণ খায়েশ, খামোশ শব্দ ব্যবহার করেন এবং উপস্থিত সুধীজন হাততালি দেন তাতে বুঝতে বাকি থাকে না মনন ও মস্তিষ্কে আমরা কি ধারণ করছি। সম্প্রতি একজন প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচিত ও সমাদৃত সাহিত্যিক একটি গল্প লেখার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। যারা লেখাটি ছাপিয়েছেন তারাও ক্ষমা চেয়েছেন। তাদের মনন ও মস্তিষ্কের ব্যবহার দ্বারা যা বিশ্বাস করে লিখেছেন ও ছাপিয়েছেন সেটি ক্ষমা চাওয়ায় বদলে যায় না। কারণ তারা বলেননি যে, তাদের চিন্তা ও চেতনায় ভুল ছিল তারা সেটা শুদ্ধ করলেন। তারা যা করলেন তার পুরোটাই কি অসভ্যতা নয়? এই সাহিত্যিক অন্তত দু’টো রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত। তার লেখার জন্য পুরস্কার দেওয়া হলেও অসভ্য লেখার জন্য পুরস্কার কেড়ে নেওয়া হয়নি।

বাক স্বাধীনতার নামে অন্যের ধর্মকে আক্রমণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা প্রকাশ করাকে সভ্যতা বলা যাবে কি? মধ্যযুগে একে অন্যের ধর্মকে আক্রমণ করার ঘটনাগুলো খুব বেশি দেখা যেতো। তারপর অনেক যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে মানুষ তথাকথিত সভ্যতা অর্জনের দাবী জানাচ্ছে। মোটামুটিভাবে সবাই মিলে সভ্যতার কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে নিয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি হয়েছে। সেগুলোকে সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেমন, মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করা যায় যে, বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে প্রথম সারির দেশ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ আইন প্রণয়নে খুবই অগ্রগামী দেশ। কিন্তু আইনের বাস্তবায়নে নয়। আইনকে আইনের পথে চলতে না দেওয়াটাও কি অসভ্যতা নয়?

সভ্য সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে যারা মন্দের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সমাজে সত্যকে সমুন্নত রাখে। আমাদের দেশে এমন প্রতিষ্ঠান নব্বইয়ের দশকের আগে থাকলেও এখন আর আছে কিনা সেটা বড় ধরনের প্রশ্নসাপেক্ষ ও বিতর্কের বিষয়। ফলে বাংলাদেশের সভ্যতা যে ইতোমধ্যেই হুমকির সম্মুখীন সেটা বলাই বাহুল্য। এমন একটি দেশে সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খাবেন, ছাত্রনেতারা টেন্ডারবাজি করবেন, এলাকার সরকার দলীয় নেতারা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করবেন এবং অন্যরা এসব স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। ইতোমধ্যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সত্য-মিথ্যার বাক্সে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা বলতে বলতে একসময় মিথ্যাকেই মানুষ সত্য বলে ধরে নেয় যদি তাহলে অসভ্যতার ষোলকলা পূর্ণ হয় আর কি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s