রাজনীতিতে ত্রিভুজ সঙ্কট


জিততে হবে। বাণী একটাই। দলগুলো নমিনেশন দেওয়ার সময় একটি বিষয়ই বিবেচনা করে। জিততে হবে। ভোটের রাজনীতিতে জেতার সূত্র মোটামুটি স্থির। বাক্সে নিজের পক্ষে ভোট আদায়। সেটা যে ভালো পারবে দলের নমিনেশন সেই পাবে।

এই দেশের মানুষের কাছ থেকে ভোট আদায়ে মূলত দু’টো বিষয় কার্যকর বলে ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এক. পেশী শক্তি। দুই. টাকা।

সাভারের রানা প্লাজার মালিকের উত্থান পেশী শক্তির কারণেই। ফেনীতে হাজারী। কিংবা নারায়নগঞ্জে ওসমান পরিবারের উত্থানের পেছনেও একই কাহিনী। ওসমান পরিবার ও হাজারীর মতো রানা বিখ্যাত ছিল না। এখন হলো। তাকে নিয়ে এখন মানুষ কথা বলবে। মিডিয়া কথা বলবে।

দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক মাস্তান আছে। আছে বিত্তশালী মানুষ। আবার অনেক বিত্তশালী নিজেই মাস্তান। তাদের আরেকটি পরিচয় থাকে। সেটি রাজনৈতিক পরিচয়। নির্বাচনে মূলত এদের মধ্য থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো নমিনেশন দেয়। নমিনেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে মাস্তানীর ক্ষমতা, বিত্তের দৌড় ছাড়াও রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রের সঙ্গে কানেকশনের দরকার হয়। তারমানে পেশী শক্তি কিংবা টাকা কিংবা দু’টো থাকলেই হয় না সেসঙ্গে উপর মহলে যোগাযোগও লাগবে। এই অবস্থাকে আমরা একটি ত্রিভুজ হিসেবে চিন্তা করতে পারি। যে ত্রিভুজের এক বাহু হলো মাস্তান। অন্য বাহু বিত্ত। আর তৃতীয় বাহুটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কিংবা সভাপতি।

ত্রিভুজের তিন বাহু অন্য রকমও হতে পারত। যেমন, প্রতিটি এলাকার সাহসী মানুষটি মাস্তান না হয়ে তার এলাকার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারত। বিত্তশালী মানুষটি দুর্নীতিতে বিনিয়োগ না করে এলাকার উন্নয়নে কল কারখানা স্থাপন করতে পারত। মানুষের কর্মসংস্থানে নিবেদিত হতে পারত। কিন্তু আমরা দেখতে পাই ত্রিভুজের এই দুই বাহু যৌথভাবে প্রথমত কাজ করে না। দ্বিতীয়ত তারা যৌথভাবে কল্যাণের পথে কাজ করুক সেটা ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু রাজনৈতিক দলের উপর মহল চায় না। তারা কখনোই সৎ ও সাহসী মানুষকে নমিনেশন দিতে চায় না। একইভাবে তারা টাকাওয়ালা সৎ মানুষকে নমিনেশন দিতে চায় না। তাদের কাছে সবসময় সাহসী মানুষের কদর আছে তবে সেটা সাহসী অসৎ মানুষ। কিংবা টাকাওয়ালা অসৎ মানুষ। প্রশ্ন হলো এটি কেন হচ্ছে?

সহজ উত্তর হলো রাজনীতির উপর মহলের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট নেই। বলা যায় কমিটমেন্ট তৈরি হতেও পারেনি। কারণ তারা দীর্ঘকাল ধরে এমন একটি সমাজে বাস করছেন যেখানে সাধারণ মানুষের ছায়া পড়ে না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনের কোন রূপই তাদের মনে কোন ধরনের রেখাপাত করে না। তাদের কাছে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। ফলে তারা তাদের যে নিজস্ব ছোট সমাজ সেখানেই তারা পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ক্ষমতা ও অর্থবিত্ত তৈরিতে ব্যস্ত। দেশের উপজেলা ও ইউনিয়ন কিংবা পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা হলো তাদের এজেন্টমাত্র। কিংবা বলতে পারেন ছাকনি। যাদের কাজ হলো জনগণকে ছেকে পয়সা নিয়ে আসা। তারা হলো ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার। জনগণের ভোট আদায়ের যন্ত্র। যে যেভাবেই দেখুক না কেন তাতে শীর্ষ নেতাদের আপত্তি নেই। শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া চাই। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জনগণের ভোট তাদের জন্য আদায় হচ্ছে কিনা।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমরা কি রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করব নাকি রাজনীতিকে আলিঙ্গন করব? আমরা কি আগামী নির্বাচনে ভোট দানে বিরত থাকব নাকি নিজেরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব?  একটি সমাধান হতে পারে দেশের রাজনৈতিক পরিবারগুলোতে ঘুণে ধরা মানুষগুলোর বিরুদ্ধে পরিবারের মধ্য থেকে প্রতিরোধ গড়া তোলা। কিন্তু সেটা বোধহয় শুধুমাত্র সিনেমাতেই দেখা যায়। অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে তার সন্তান লড়াই করছে। বাস্তবে কি সেটা সম্ভব? এমনসব বিষয়গুলোর মধ্য থেকে কোনটি যুতসই সেটা খুঁজে বের করতে হবে। কাজটি কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s