হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র


দু’দিন খুঁজেও পুতুল পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার ছেড়ে যাবার আগে শেষ মুহুর্তে পুতুল খোঁজা চলছে সাগরপাড়ের দোকানগুলোতে। সজল তার মেয়ের জন্য পুতুল খুঁজছে। সঙ্গে ছেলের জন্যও যুতসই কিছু একটা যদি পাওয়া যায়। সজলের ছেলে অবশ্য বাবাকে বলে দিয়েছে ভিডিও গেম নিয়ে যেতে। কিন্তু কক্সবাজার থেকে তো ভিডিও গেম কেনার কোন মানে হয় না। সজল তাই অন্য কিছু খুঁজছে। আমিও দোকানগুলোতে চোখ বুলাতে লাগলাম। পছন্দসই কিছু যদি পাওয়া যায়। হাতে অবশ্য বেশি সময় নেই। আর বড়জোর এক ঘণ্টা কেনাকাটায় দেওয়া যাবে। কিছু্ই যখন পাচ্ছি না। ভাবছি ফিরে যাব। তখনই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। এমনিতেই বৃষ্টি আমার প্রিয়। আর সাগরপাড়ের বৃষ্টিতে ভেজা তো আরো মজার। কিন্তু ইচ্ছেকে মনের মাঝে চেপে রাখতে হলো। ভেজার উপায় নেই। ঘণ্টাখানেক পরেই চলে যাব। সবকিছু প্যাক করে বের হয়েছি। পরনে যা আছে সেটা পড়েই যাব। এই অবস্থায় কাপড় চোপড় ভেজানোর কোন মানে নেই। বৃষ্টি দেখে সজল আবার খুঁজতে শুরু করল। আমার আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। আমি এক জায়গায় বসে বৃষ্টি দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এক দোকানের টুলে বসে পড়লাম। এমনিতেই অফ সিজন। তার উপর বৃষ্টি রাস্তায় কিংবা দোকানগুলোতে মানুষজন নেই। দোকানের কাঁচের ভিতরে তাকিয়ে দেখি নেল কাটার। হাতের নখগুলো বড় হয়েছে। একটা নেল কাটার কিনে নখ কাটতে লাগলাম। বৃষ্টি দেখছি আর নখ কাটছি। ফোন বেজে উঠল। আমার না। দোকানদারের। আমি তখন নখ ফাইল করছি। আর বৃষ্টি দেখছি। দোকানদার ফোন রেখে বলল, ভাই এই দেশে আর থাকা যাবে না।

আমি ঘুরে দোকানির দিকে তাকালাম। নেল কাটারটা নেওয়ার সময়ই দোকানিকে দেখেছি। ২০/২২ বছর বয়স হবে। এই বয়সীরা আমাকে চাচা ডাকে। এমনিতে মাথায় চুল কম। মাথায় কয়েক গুচ্ছ চুল পাকার পর কলপ দেওয়ার কুফল হিসেবে বাকি চুলগুলোও পেকে গেছে। ইদানীং কলপ দেওয়া বন্ধ করেছি। ফলে টাক আর পাকা চুল মিলিয়ে আমার চাচা হওয়াটা পূর্ণ হয়েছে। তাই দোকানীর মুখে ভাই শুনে আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকালাম। আমার তাকানো দেখে সে আবার বলল, ভাই এবার বোধহয় দেশ ছাড়তে হবে।

‘কেন কি হয়েছে?’

‘ভাই গ্রাম থেকে খবর পেলাম ৩০ জন ফিরেনি।’

এতোক্ষণে বুঝলাম ভাই বলাটা তার মুদ্রাদোষ। সব বাক্যেই ভাই বলছে। ৩০ জন ফিরেনি কথাটা আমার কানে খচ্ করে বিধল। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’

‘পটিয়া।’

নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম, ‘৩০ জন ফিরেনি মানেটা কি?’

‘ভাই আপনি ঢাকার ঘটনা জানেন না?’

আমি চুপ করে আছি। এরপর সে যা বলল তার মানে হলো, তাদের গ্রাম থেকে অনেকে ঢাকা অবরোধে গিয়েছিল। অনেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু এখনো ৩০ জন ফেরত আসেনি। গ্রামে তাদের আত্মীয় স্বজনরা খুব কান্নাকাটি করছে।

বিষয়টা আমাকে আ্গ্রহী করে তুলল। বৃষ্টি দেখা বাদ দিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। আলাপ থেকে যা জানা গেলো তা হলো, তার বাড়ির কাছেই একটা মাদ্রাসা আছে। সেই মাদ্রাসার ছাত্ররা অবরোধের জন্য ঢাকা গেছে। গ্রামের মুরব্বিরাও গেছে। ৫ তারিখের রাতে পুলিশের আক্রমণে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এরপর অনেকে বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিন্তু এখনো ৩০ জন ফিরেনি। তারা কোথায় আছে, কেমন আছে সেটাও কেউ জানে না। তাদের কারো সঙ্গে মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তারা নিজেরাও কেউ গত তিনদিনে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে কিছু জানায়নি। এই অবস্থায় গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তারা আর বেঁচে নেই। এদিকে তারা শুনেছে পুলিশের গুলিতে ৫ তারিখে শাপলা চত্বরে অনেক লোক মারা গিয়েছে। তারা প্রথমে গুজব ভেবেছিল। তারা বিশ্বাস করতে পারেনি যে, পুলিশ কোন আলেমকে গুলি করে মারতে পারে। মাদ্রাসার শিশুদের গুলি করে মারতে পারে। কিন্তু তিনদিনেও কোন খবর না পাওয়ায় তারা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তারা মনে করছে, গুলি করে মানুষ মারার ঘটনা সত্যি।

ছেলেটি আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ঘটনা কি সত্যি? সত্যি কি পুলিশ গুলি করে হাজার হাজার মানুষ মেরেছে?

এটি আমার জন্য খুব কঠিন প্রশ্ন ছিল। আমি একটু ভেবে তাকে বললাম। দেখো, ৫ তারিখে আমি ঢাকায় ছিলাম না।আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে দোয়া করি তোমার গ্রামের মানুষগুলো যেন ফিরে আসে।

ছেলেটি আমার দিকে অবিশ্বাস চোখে তাকালো। আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমাদের মাদ্রাসার ছেলেরা কেন ঢাকায় গেছে? কতো টাকা করে তারা পেয়েছে জানো কিছু?

ছেলেটির মুখ শক্ত হয়ে গেলো। আত্মীয় স্বজন হারানোর সম্ভাব্য বেদনায় কাতর ছেলেটি আমার এই প্রশ্নে সুস্পষ্টভাবে বিরক্ত হয়েছে বোঝা গেলো। বলল, হুজুরের কথায় ঢাকা গেছে। কোনো টাকা পয়সার লোভে না।

‘তারা তো ঢাকায় গিয়ে দোকান পাট পুড়িয়েছে। কোরআন শরীফে আগুন দিয়েছে।’

‘আমার গ্রামের মানুষ এই কাজ করতে পারে না।’ ছেলেটির গলায় স্পষ্ট দৃঢ়তা। তারপর সে উল্টো প্রশ্ন করল, মাদ্রাসায় যারা পড়ে তারা তো কোরআন শরীফ পড়ে। সেই কোরআন শরীফ তারা কেন পুড়াইব?

আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা নেই। সরকার নিশ্চয়ই জানেন। সরকারের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নামী দামী বিশারদরা পত্র পত্রিকা ও টেলিভিশনে বলেছে। তারা কি না জেনে বলেছে। নিশ্চয়ই নয়। এই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারকে বিশ্বাস করাটাই আমার কর্তব্য। সরকার কেন মিথ্যা বলবে? তার মোটিভেশনটা কি?

কক্সবাজারের একজন সাধারণ দোকানী কেন সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করছে না? তার মোটিভেশনটা কি?

কক্সবাজারের দোকানির প্রশ্নটা নিয়ে আমি ভাবছি। মাদ্রাসার ছাত্রদের কোরআন শরীফ পুড়িয়ে দেওয়ার মোটিভেশন কি হতে পারে?

চলবে……………

Advertisements

One thought on “হেফাজতের ঢাকা অভিযান এবং মোটিভেশন সমগ্র

  1. Very evil things happened that night…
    It is too much.
    They did order blackout of power, blackout on tv, and they did keep the Gopibag side open, struck from Notredame college side and Dainik Bangla side… for sure it was not all blanks or sound grandes.
    And there is no official press release, because that could be an affidavit in future.
    Purely evil, not political!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s